হজের আরকান ও আহকাম
- By Article Poster
- Published 11/30/2007
- হজ্জ্ব
- Unrated
হজ শব্দের আভিধানিক অর্থ সংকল্প করা, ইচ্ছা করা। ইসলামী পরিভাষায় হজ অর্থ নির্দিষ্ট দিনসমূহে পবিত্র কাবাঘর ও কয়েকটি নির্ধারিত স্থানে আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশিত অনুষ্ঠান পালনই হজ। হজ ইসলামের পঞ্চম -ম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ। যেসব প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নর-নারীর হজে যাওয়ার মতো শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে তাদের ওপর কেবল জীবনে একবার হজ আদায় করা ফরজ। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশে ওই ঘরের হজ করা তার অবশ্য কর্তব্য। [সূরা আল ইমরানঃ ৯৭]
হজের তাৎপর্য
হজ বিশ্ব মুসলিমের মহামিলন ও ঐক্যের প্রতীক। হজের মাধ্যমে বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের স্বরূপ প্রকাশ পায়। এ মিলন কেন্দ্রে পৃথিবীর সব দেশের মুসলমান মিলিত হন। হজ মুসলমানদের বিশ্ব মহাসম্মেলন। বিশ্বের বিভিন্ন এলাকার নানা ভাষা, আকৃতি ও বর্ণের লাখ লাখ মুসলমান ইহরামের একই পোশাক পরে একই তালবিয়াহ সমোচ্চারিত কণ্ঠে পাঠরত অবস্থায় হজব্রত উদযাপনে শরিক হন। এসব কিছু মহান আল্লাহতায়ালার মহব্বতে মাতোয়ারা হয়ে করে থাকেন সেই ঘরকে কেন্দ্র করে, যে ঘরকে আল্লাহতায়ালা নিজের ঘর বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ ঘর সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা তো বাক্কায় (মক্কা), তা বরকতময় ও বিশ্বজগতের দিশারী। এতে অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে যেমন মাকামে ইব্রাহিম, আর যে ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ। [সূরা আল ইমরানঃ ৯৬]
হজের প্রকারভেদ
কার্যপদ্ধতি অনুসারে হজ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। যথাঃ
১· হজে ইফরাদ
২· হজে তামাত্তু ও
৩· হজে ক্বিরান।
১· হজে ইফরাদঃ হজ পালনেচ্ছুক ব্যক্তি শুধু হজের নিয়ত করে ইহরাম বেঁধে হজের কার্যাদি যথারীতি সম্পাদন করবে এবং উমরাহর জন্য ইহরাম বাঁধবে না। এরূপ হজ পালনকারীকে মুফরাদ বলে।
২· হজে তামাত্তুঃ হজে তামাত্তু সে হজকে বলা হয় যাতে হজ পালনেচ্ছুক ব্যক্তি প্রথমে ওমরাহ কার্যাদি যথারীতি সম্পাদন করে ইহরামমুক্ত হয়ে যাবে। অতঃপর ৮ জিলহজ আবার হজের কার্যাদি সম্পাদন করবে।
৩· হজে ক্বিরানঃ হজে ক্বিরান সে হজকে বলা হয়, যাতে হজ পালনেচ্ছুক ব্যক্তি প্রথমে ওমরাহর কার্যাদি সম্পাদন করে ইহরামমুক্ত না হয়ে একই ইহরামে পুনঃহজের কার্যাদি সম্পাদন শেষে ইহরামমুক্ত হবে। হজের উত্তমতা প্রসঙ্গে হযরত নবী করিম (সা·) কোন প্রকার হজ করেছিলেন এ সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম থেকে বিভিন্ন রকম বর্ণনা উদ্ধৃত থাকায় কোন প্রকার হজ উত্তম সে বিষয়ে বিভিন্ন মতপার্থক্য রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (র·)-এর মতে ক্বিরান হজ সবচেয়ে উত্তম। অতঃপর তামাত্তু, অতঃপর ইফরাদ। এটাই হচ্ছে অধিকাংশ সাহাবা ও হাবেঈনের অভিমত। তবে আমাদের দেশের হাজীরা সাধারণত হজে তামাত্তু করে থাকেন। যেহেতু হজে তামাত্তু করা আমাদের দেশের হাজীদের জন্য সহজ।
হজের ফরজসমূহ
হজের ফরজ বা রোকন ৩টি। যথাঃ
১· মিকাত থেকে ইহরাম বেঁধে তালবিয়াহ পাঠ করা।
২· ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা।
৩· তাওয়াফে জিয়ারত আদায় করা।
হজের ওয়াজিবসমূহ
হজের ওয়াজিব কাজ ৫টি। যথাঃ
১· আরাফাতের ময়দান থেকে প্রত্যাবর্তনকালে মুযদালিফায় অবস্থান করা।
২· সাফা ও মারওয়া নামক পাহাড় দুটোর মধ্যে সায়ি করা।
৩· মিনা প্রান্তরে অবস্থিত জামরাওয়ে কংকর নিক্ষেপ করা।
৪· বহিরাগতদের জন্য তাওয়াফে সদর বা বিদায়ী তাওয়াফ করা।
৫· ইহরাম ভঙ্গ করার জন্য মাথা মুড়ানো বা চুল খাটো করা।
হজ ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ
যেসব শর্তাবলী বর্তমান থাকলে কারও ওপর হজ ফরজ হিসেবে স্বীকৃত হয় তা নিম্নরূপ। যথাঃ
১· মুসলমান হওয়া
২· স্বাধীন হওয়া
৩· জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া
৪· প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া
৫· হজের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও যাতায়াতের খরচাদি জোগাতে সামর্থ্যবান হওয়া
৬· দৈহিকভাবে সুস্থ হওয়া
৭· যাতায়াতের পথ নিরাপদ হওয়া
৮· নারীদের জন্য স্বামী বা মাহরিম ব্যক্তি সাথী হওয়া।
পুরুষ ও নারীর হজ পালনের বিধানগত পার্থক্য
হজের আহকামসমূহে পুরুষ ও স্ত্রীলোকের দায়িত্ব সাধারণত একইরকম। তবে পার্থক্য শুধু এতটুকু, স্ত্রীলোকেরা ইহরাম অবস্থায় মাথা খোলা রাখবে না, শুধু চেহারা খোলা রাখবে। স্ত্রীলোকেরা পুরুষের মতো জোরে তালবিয়াহ পাঠ করবে না। বরং ছোট আওয়াজে তালবিয়াহ পাঠ করবে এবং সাফা ও মারওয়া সায়ি করার সময় পুরুষের মতো সবুজ মাইলদ্বয়ের মাঝখানে দৌড়াবে না। বরং স্বাভাবিকভাবে চলবে। ইহরাম পরিহার করার সময় সামান্য পরিমাণে চুল কেটে নেবে। স্ত্রীলোকেরা ভিড়ের মধ্যে হাজরে আসওয়াদের নিকটস্থ হবে না, যথাসম্ভব ভিড় এড়িয়ে তাওয়াফের কাজ সমাধা করবে। যদি স্ত্রীলোকের মাসিক ঋতু দেখা দেয়, তাহলে সে বাইতুল্লাহ শরিফের তাওয়াফ ব্যতীত অন্যান্য কার্যাবলি যথারীতি সম্পন্ন করবে।
হজের উপকারিতা
হজ হচ্ছে গোটা মুসলিম মিল্লাতের মহাসম্মেলন। হজের মাধ্যমে সমগ্র পৃথিবীর মুসলমানরা রক্ত, বর্ণ, ভাষা ও ভৌগোলিক সীমারেখার বিভিন্নতা ভুলে গিয়ে এককেন্দ্রিকমুখী পথ চলার অনুপ্রেরণা পায়।
হজের মাধ্যমে ইমানি জজবা ও ইসলামী চেতনা বৃদ্ধি পায়। কোরআন-হাদিসের মাধ্যমে হজের বহুবিধ কল্যাণ ও উপকারিতার বর্ণনা রয়েছে।
সুতরাং যাদের ওপর হজ ফরজ হয়েছে তারা প্রায় দুই লক্ষাধিক টাকা খরচ করে হজে যান অথচ যারা হজ সম্পর্কীয় মাসআলা মাসায়েল জানেন তাদের কাছে গিয়ে হজের মাসআলা মাসায়েল ও দোয়া কালামগুলো শিখে হজে যাওয়ায় উপকার বেশি। কাজেই আমরা হজে যাওয়ার আগে আলেমদের কাছে গিয়ে হজ সম্পর্কিত মাসআলা মাসায়েল শিখে হজব্রত পালন করব, তাহলে আমাদের হজ সুন্দর সঠিকভাবে আদায় হবে।
**************************
লেখকঃ মাওলানা মোহাম্মদ ওমর ফারুক
উৎসঃ দৈনিক যুগান্তর, ৩০শে নভেম্বর ২০০৭