Islamic Article Archive - http://articles.ourislam.org
রহমাতুল্লীল আলামীন মোহাম্মদ (সঃ)
http://articles.ourislam.org/articles/106/1/aaaaaaaaaaa-aaaaaa-aaaaaaaaa-aa/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 03/21/2008
 
সেকালে পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য সভ্যতার ব্যাপক বিস্মৃতির মাঝে রহমাতুল্লীল আলামীন মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর শুভ মহান আবির্ভাব। তখন পাশ্চাত্যে গ্রীক-রোমক-সভ্যতা, মধ্যপ্রাচ্যে মিসরীয়-ব্যাবিলন, ফনেসী ও ইরানী সভ্যতা এবং এই উপমহাদেশে ভারতীয় ও চৈনিক সভ্যতার কথা কারোরই অজানা ছিলো না। কিন্তু মধ্যেপ্রাচ্যের ধূলি-ধূসর আরব অঞ্চলটি ছিলো পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং মানবিক গুণ তথা সামাজিক, রাজনৈতিক এক কথায় সর্বক্ষেত্রে কুসংস্কার ও পংকিলতায় নিমজ্জিত। এমনি এক পরিবেশে ইতিহাসের বিশাল এক সুচিভেদ্য অন্ধকারাচ্ছন্ন মরু প্রান্তরে আলোকবর্তিকা হিসাবে আবির্ভূত হলেন মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সঃ)।

রহমাতুল্লীল আলামীন মোহাম্মদ (সঃ)

সেকালে পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য সভ্যতার ব্যাপক বিস্মৃতির মাঝে রহমাতুল্লীল আলামীন মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর শুভ মহান আবির্ভাব। তখন পাশ্চাত্যে গ্রীক-রোমক-সভ্যতা, মধ্যপ্রাচ্যে মিসরীয়-ব্যাবিলন, ফনেসী ও ইরানী সভ্যতা এবং এই উপমহাদেশে ভারতীয় ও চৈনিক সভ্যতার কথা কারোরই অজানা ছিলো না। কিন্তু মধ্যেপ্রাচ্যের ধূলি-ধূসর আরব অঞ্চলটি ছিলো পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং মানবিক গুণ তথা সামাজিক, রাজনৈতিক এক কথায় সর্বক্ষেত্রে কুসংস্কার ও পংকিলতায় নিমজ্জিত। এমনি এক পরিবেশে ইতিহাসের বিশাল এক সুচিভেদ্য অন্ধকারাচ্ছন্ন মরু প্রান্তরে আলোকবর্তিকা হিসাবে আবির্ভূত হলেন মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সঃ)। পরবর্তীকালে তারই উপর নাজিল হয় বিশ্ব মানবতার মুক্তি সনদ একমাত্র গ্রন্থ পবিত্র আল কোরআন। এ কারণে কোরআনুল করীমে মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর এ ধরা বিশ্বে আবির্ভাবকে বলা হয়েছে প্রদীপ্ত প্রদীপ অর্থাৎ মানবজাতির জন্যে বিশেষ রহমতস্বরূপ।

মহান রাব্বুল আলামীনের প্রেরিত কোরআনুল করীম অঞ্চল, গোত্র, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটি আদম সন্তানের জন্যে চিরন্তন ও শাশ্বত বিধান। এই মহাগ্রন্থের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্যেই প্রেরিত হয়েছিলেন আমাদের প্রিয় রাসূল হজরত মোহাম্মদ (সঃ)। এবং পবিত্র কোরআনুল করীমের অনুসৃত, নিদের্শিত, প্রদর্শিত নীতিমালাই ছিলো তার জীবন দর্শনের মূল উৎস। এ কারণেই মানবজাতি যাতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে নিজেদেরকে ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন তথা আন্তর্জাতিক জীবন এই মহাগ্রন্থের আলোকে ইহকাল ও পরোকালের সাফল্য অর্জন করতে পারে। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই মহা পবিত্র গ্রন্থের চিরন্তন বাণীকে বাস্তবায়িত করেছিলেন নিজের জীবন দর্শনে-মহানবী (সঃ)-এর জীবনটাই ছিলো আল কোরআনের হুবহু রূপায়ণ। আল্লাহর পেয়ারা নবী মোহাম্মদ (সঃ)-এর জীবন দর্শনের মূলমন্ত্র ছিলো হক্কুল্লাহ ও হক্কুল এবাদ। হক্কুল্লাহ অর্থ আল্লাহর হক আদায় করা আর হক্কুল এবাদ হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্ট জীবের প্রতি কর্তব্য পালন করা।

একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আমাদের প্রিয় নবী করীম (সঃ)-এর সমুদয় কার্য সুসম্পন্ন করার ঘটনার মধ্যে নিহিত রয়েছে অন্যান্য কালের বিভিন্ন দেশের নবী-রাসূল, জ্ঞানী ও দার্শনিকদের উপর তাঁর বিশেষ শ্রেষ্ঠত্ব। অন্যান্য ধর্ম প্রবর্তকেরা পতিত মানবতাকে নতুন জীবনে উন্নীত করতে পারেননি। সকলেই তাদের আকাঙক্ষা অপূর্ণ রেখে তাদের উজ্জ্বল দিব্য দৃষ্টি অসমাপ্ত রেখে কিংবা তাদের শিষ্যদের হাতে উত্তরণের দায়িত্ব পালনের ভার অর্পণ করে বিদায় নিয়েছেন। একমাত্র মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সঃ) তাঁর মহান কর্মের দায়িত্ব সম্পূর্ণ করতে পেরেছিলেন। একাধারে ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং সামরিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক বিপ্লবের মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক পরওয়ার দেগারের অর্পিত দায়িত্ব সুস্পষ্ট, পরিচ্ছন্নভাবে সুসম্পন্ন করেছিলেন। এসব দায়িত্ব ও কর্তব্যের মূলে ছিলেন মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি আত্মসমর্পণ ও ইসলামী জীবন বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করা। ইতিপূর্বে বিভিন্ন নবী-পয়গম্বরদের মহান দায়িত্ব অর্পণ করে রাব্বুল আলামীন এ ধরা বিশ্বে পাঠিয়েছিলেন, আমাদের মহানবী (সঃ)-এর উপর একই দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়। নবুয়ত প্রাপ্তির পরেই তিনি সবাইকে আল্লাহর দীন-ধর্মের প্রতি আহ্বান জানান এবং সবাইকে সঠিক কর্মনীতি ও সঠিক পথে চলার দাওয়াত দেন। রহমাতুল্লীল আলামীনের সকল কর্মের ও সকল কাজের এই ছিলো দার্শনিক ভিত্তি।

আমাদের জীবন প্রকৃতি যতোই স্বেচ্ছা প্রণোদিত হোক না কেন আমরা মূলতঃ সৃষ্টির অনুগ্রহকামী। আমাদের আয়ষ্কাল ক্ষণস্থায়ী। আমাদের যোগ্যতা ও চিন্তাশক্তি সীমাবদ্ধ। সুতরাং মহান আল্লাহ পাকের করুণা ও সাহায্য ব্যতীত আমাদের ইহজীবন কোনভাবেই সুস্পষ্টভাবে সম্পন্ন হতে পারে না। জীবনের ক্ষণিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের পাশাপাশি মৌলিক চাহিদা মেটাতে আমরা যতোই তৎপর হই না কেন আমাদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। হজরত রাসূলে মকবুল (সঃ)-এর বৈপ্লবিক জীবনে আমরা দেখতে পাচ্ছি তিনি বনে-জংগলে আল্লাহর অম্বেষণ ও আরাধনা করেন নাই। মানুষের সংসার ও মানব জীবনের বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়েই মহান রাব্বুল আলামীনের সত্যের সাধনা করেছিলেন। এই যে, মানুষের জীবন, সুখ, দুঃখ স্বার্থ কামনার সংঘাত আমরা প্রতিনিয়ত লক্ষ্য করেছি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর পেয়ারা হাবীব মোহাম্মদ (সঃ) এসব জয় করেছিলেন নিজের কর্মসাধনা ও সত্যের মহিমায়। তাঁর চিন্তা-চেতনা কর্ম ও দর্শন ছিলো সত্যের দ্বারা লালিত। পবিত্র ইসলামের অনুশাসন, সরা-শরিয়ত সুন্নাহ দ্বারা সংগঠিত। আদর্শের মূর্ত প্রতীক মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর দার্শনিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাঁর সংগ্রামী জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে।

শুধু একটি জাতির মধ্যে তিনি প্রাণের চাঞ্চল্য সঞ্চার করেছিলেন অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংগ্রাম করে। বিবদমান গোত্রসমূহকে তিনি একটি সুসংহত জাতিতে রূপান্তরিত করেছিলেন পবিত্র কোরআনের নির্দেশনায় এবং চিরস্থায়ী কল্যাণময়ী জীবনের আশায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন জগৎ বিশ্বকে। ধর্মীয় বিধি-নিষেধের জগতে যখন মানুষ গুরুতরভাবে পিষ্ট হয়েছিলো এবং মানুষের দেহ কায়েমী স্বার্থের অত্যাচারে পদদলিত হয়েছিলো, সেই সময়ে তিনি মহান বাণী প্রচার করে ভ্রান্ত প্রাচীর ধূলিস্মাৎ করে দিয়েছিলেন।

মানব সংসারকে পরিহার করে স্রষ্টার সাধনায় কোন স্বার্থকতা নেই। বরং মানুষের নিখিল জীবনধারাকে আলিঙ্গন করে পরিষ্কার সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের মধ্যে দিয়ে মহত্ত্বম কল্যাণ সাধনার সঙ্গে তিনি আল্লাহ পাকের পূর্ণতার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। তাঁর জীবন দর্শনের মূল উৎস ছিলো-মহান স্রষ্টা আল্লাহ পাক পরওয়ার দেগার পবিত্র কোরআনুল করীম ও মানব জাতির সেবা ও কল্যাণ বিশেষ করে ইসলামী জীবন বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করা। শান্তি, সাম্য, সুবিচার এবং শ্রমের মর্যাদা, বর্ণ বৈষম্য, সম্পদ পুঞ্জীভূতকরণ এবং দাসত্ব বিলোপের জন্যে যে পরিপূর্ণ জীবন বিধান আমাদের কাছে রেখে গেছেন তাঁর মহান শিক্ষার আলোকে আমরা পবিত্র কোরআনের বাস্তব রূপ আল্লাহর পেয়ারা নবী মোহাম্মদ (সঃ)-এর জীবনকে যদি সঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারি তা হলে তাঁর জীবন দর্শনের সঠিক মূল্যায়ন করা হবে।

মহত্ত্বম আদর্শের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলো আল্লাহর পেয়ারা হাবীব হজরত রাসূলে করীম (সঃ)। শ্রেষ্ঠ নবী হজরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর ব্যক্তিগত চরিত্রে ছিলো সকল নবী এবং সংস্কারকদের চাইতে সর্বশ্রেষ্ঠ। বিশেষ করে মহানবী (সঃ)-এর সকল চিন্তা-কর্মে মহৎ মানুষের রূপ বিদ্যমান। তিনি যা কিছু নৈতিক শিক্ষা দিতেন, নিজেই তার বাস্তব-নমুনা ছিলেন। সমাবেশে মানুষের মধ্যে তিনি যা বলতেন তিনি নিজের গৃহের গোপনতম পরিবেশেও তিনি সেই অনুসারে চলতেন। হজরত আয়শা সিদ্দিকা (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো, রহমাতুল্লীল আলামীনের স্বভাব কেমন ছিলো? উত্তরে বলেছিলেন- তাঁর স্বভাব ছিলো কোরআনুল করীমের হুবহু দৃষ্টান্ত। হজরত আয়শা (রাঃ) আরো বলেছেন, মহানবী (সঃ) কাউকে তিরস্কার করতেন না। মন্দ ব্যবহারের জবাবে মন্দ ব্যবহার করতেন না। বরং ক্ষমা করে দিতেন। নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপারে কারো নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না।

এমন কি, কোন দাস, খাদেম, নারী বা পশুকে তিনি প্রহার করেন নাই। তিনি কারো আবেদন বা অনুরোধ উপক্ষো করেন নাই। তিনি বাড়ী বা ঘরে যখন প্রবেশ করতেন, তখন তিনি হাসি মুখে প্রবেশ করতেন। কথা ধীরে ধীরে বলতেন এবং সদা প্রফুল্ল, বিনয়ী ও স্নেহ পরায়ণ ছিলেন। শুধু তাই নয়, জীবনে কোন দিন সংকীর্ণতা ও নিষ্ঠুরতার ধারে-কাছেও ঘেঁষেন নাই। নিষ্প্রয়োজেন উচ্চৈস্বরে কথা বলতেন না। কিংবা মুখ দিয়ে কোন দিন কটু কথা, অশস্নীল বাক্য বা মনো কষ্টদায়ক ব্যবহার করেন নাই। মানবিক চরিত্র বা জীবন বলতে যা কিছু বোঝায়। তার সব কিছুই সর্বোৎকৃষ্টভাবে তাঁর মধ্যে উজ্জ্বল রূপে বিদ্যমান ছিলো। মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর কোরআনুল করীমে পরিষ্কার বলে দিয়েছেন- “লাক্কাদ কানা লাকুম ফি রাসূলিল্লাহে উস্‌ওয়অতুন হাসানা অর্থাৎ: নিঃসন্দেহে তোমাদের রাসূল মোহাম্মদ (সঃ)-এর মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।

অতএব, আমরা রহমাতুল্লীল আলামীন মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর জীবন দর্শন থেকে এ শিক্ষাই পেয়ে থাকি। তাই হযরত রাসূলে পাকের আদর্শ, শিক্ষা এবং নীতিমালা যথাযথ সঠিক রূপে যদি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিকভাবে অনুসরণ করে চলি। আসুন-মহান স্রষ্টা পাক পরোওয়ার দেগারের কাছে কায়োমনে ফরিয়াদ করি- পবিত্র মিলাদুন্নবীর এই শুভ লগ্নে তাঁর প্রিয় হাবীব, আমাদের মহানবী (সঃ)-এর পূর্ণাঙ্গ জীবন আদর্শ অনুসরণ করার মন মানসিকতা তৈরী করে দেন এবং রাসূলে পাকের আদর্শে আদর্শবান করে খাঁটি মানুষ রূপে গড়ে তুলুন।


মওলানা শাহ আব্দুস সাত্তার
দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ মার্চ ২০০৮