মানুষের অন্তরের সহজাত সৌন্দর্যকে ইসলাম বিকশিত করার পক্ষে। ইসলাম মানুষের স্বভাব ধর্ম। এজন্য সুকুমারবৃত্তি, সদাচার ও সুঅনুভুতিকে লালন, পোষণ ও বিকাশে ইসলামী আদর্শ ও প্রেরণার কোনো বিকল্প নেই। মা, মায়ের ভুমি ও মায়ের ভাষার প্রতি মানুষের সহজাত যে আকুতি ও শ্রদ্ধা ইসলাম তাকে উৎসাহিত করে। এ কারণেই মাতৃভুমি কিংবা স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা ইসলামী প্রেরণার অন্যতম বিষয়।
পবিত্র হাদিসের বাণী-হুব্বুল ওয়াতান মিনাল ঈমান। ‘স্বদেশকে ভালোবাসা ঈমানের অঙ্গ’। এই বাণী থেকেই অনুধাবন করা যায় সব দেশের প্রতি কিংবা সহজ ভাষায়, দেশের প্রতি আত্মিক প্রেরণা ও ভালোবাসাকে ইসলাম কতটা ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। দেশপ্রেম একটি বহুমাত্রিক অনুভুতির দর্পণ। দেশের প্রতি যার অন্তরে ভালোবাসা বিদ্যমান দেশের মঙ্গল কামনা ও মঙ্গল সাধন তার করণীয় হতে বাধ্য। একটি গাছ লাগিয়ে, একটি টাকা খরচ করেও দেশের মঙ্গল সাধন করা যায়। নিজের ও পাশের জনের জীবন এবং পরিবেশে ইতিবাচক কিছুর সমৃদ্ধি ঘটিয়েও দেশের কল্যাণ করা যায়। শত্রু দেশের শত্রু সেনাদের প্রতিরোধ করেও দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা যায়। দেশের প্রতি নিজের প্রেমটাকে এভাবেই বাঙময় করে তোলা দেশের যে কোনো নাগরিকের পক্ষে সম্ভব। দেশ তার একজন সন্তান ও নাগরিকের কাছে এই মঙ্গল কামনা, এই কল্যাণ সাধন ও ত্যাগের মহিমা প্রত্যাশা করে।
অনুকুল প্রতিকুল সব অবস্হাতেই দেশপ্রেমের চেতনা সমুজ্জ্বল রাখাই নাগরিকের কর্তব্য। চরম প্রতিকুল পরিবেশে হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদিনায় হিজরত করে যাচ্ছিলেন তখন তিনি বার বার ঘুরে মক্কার প্রান্তর পাহাড়, বৃক্ষের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন-ইয়া মক্কাতু আনা উহিব্বুকি। ‘হে মক্কা! আমি তোমাকে ভালোবাসি’। এই আবেগময় বেদনাকাতর অভিব্যক্তি ছিল আমাদের প্রিয় নবীর। দশ বছর পর যখন প্রায় বিনা যুদ্ধে তিনি বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন তখনো তার মহানুভব হৃদয়ে ছিল স্বদেশে ফিরে আসার কোমল ও পবিত্রতাপুর্ণ এক আকুতি। নিজের দেশের মাটিতে বিজয়ীর বেশে ফিরে এসে প্রতিশোধহীনতার এক আকাশ উঁচু চেতনার ফরমান তিনি উচ্চারণ করেন। হযরত ইউসুফ (আঃ) তার ভাইদের যেমন বলেছিলেন তেমনি তিনিও বলেছেন-লা তাছরীবা আলাইকুমুল ইয়াত্তম। ‘তোমাদের প্রতি আজ কোনো প্রতিশোধ নেই।’ দীর্ঘ তের বছর শত জুলুমে, উৎপীড়নে বিদ্ধ হওয়ার পরও দেশটি ফিরে পাওয়ার পর স্বদেশবাসীর প্রতি এই অভিব্যক্তি ও সর্বোচ্চ সদাচার ছিল একজন মহান দেশপ্রেমিক মহামানবের দেশপ্রেমময় সুঅভিব্যক্তি ও সদাচরণ। নিঃসন্দেহে এই অভিব্যক্তি ও আচরণে সর্বোচ্চ ঔদার্য ছিল, ছিল বিজয়ী বীরের মহান আদর্শ। একই সঙ্গে এতে ছিল দেশপ্রেম, ছিল দেশপ্রেমেরও উচ্চতাময় আদর্শ।
দেশপ্রেমের চুড়ান্ত পর্যায়টি হচ্ছে দেশকে রক্ষা করা। দেশের শত্রুদের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা। দেশের সীমানা পাহারা দেয়া এবং প্রয়োজন সর্বোচ্চ ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্হাপন করা। পবিত্র হাদিসের একটি বাণী রিবাতু ইয়াওমিন ফী সাবীলিল্লাহি খাইরুম মিনাদ্দুনয়া ওয়া মা আলাইহা। ‘আল্লাহর রাস্তায় একদিন সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত থাকা দুনিয়া এবং দুনিয়ার উপরস্হ সবকিছুর চেয়ে উত্তম।’ (মিশকাত) কাছাকাছি আরেকটি বাণী হচ্ছে-এক দিন ও এক রাতের সীমান্ত পাহারা ধারাবাহিক এক মাসের রোজা যাপন ও রাতব্যাপী নফল ইবাদতে কাটানোর চেয়ে উত্তম। (মুসলিম) কোনো মুসলিম দেশের সীমান্ত পাহারা দেয়াকে ‘বিরাত’ বলা হয়। এই ‘বিরাত’ দিয়ে ফজিলত সম্পর্কিত একাধিক হাদিস বিদ্যমান। সুরায়ে আলে ইমরানের ২০০ নম্বর আয়াতেও ‘বিরাত’ শব্দের উল্লেখ করে দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে সর্বতোভাবে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সীমান্তে পাহারাদারির পর আসে সর্বোচ্চ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার পর্যায়। পবিত্র কোরআনের সুরায়ে আনফালের ৬০ নম্বর আয়াতে সে সম্পর্কে এরশাদ হয়েছে, তোমরা তাদের মোকাবেলার জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখবে। এর দ্বারা তোমরা শায়েস্তা করবে আল্লাহর শত্রুকে এবং তোমাদের শত্রুকে ও এতদ্ব্যতীত অন্যদের, যাদের তোমরা জান না, আল্লাহ জানেন।
দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ চেতনাই হচ্ছে দেশ রক্ষা। যিনি দেশপ্রেমিক দেশ রক্ষাতে তার ভুমিকা অবশ্যই থাকবে। আজকের বাস্তবতায় দেশ রক্ষার সর্বোচ্চ পর্যায়ে ইচ্ছা করলেই যে কোনো নাগরিক অবতরণ করতে পারেন না। এর জন্য রয়েছেন দেশের নিয়মিত দেশ রক্ষাকারী দেশপ্রেমিক ভাইয়েরা। কিন্তু প্রথম পর্যায়ে নানাভাবে নানা মাধ্যমে তাদের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা দিয়ে যাওয়া নাগরিক সাধারণের প্রধান কর্তব্য। পরবর্তী সময়ে দেশের ডাকটি যেভাবে যে আঙ্গিকে আসে, দেশপ্রেমের চেতনায় তাতে সাড়া দেয়া একজন মুমিন মাত্রের কর্তব্য। এটা তার ঈমানের দাবি। দেশপ্রেমের ছোট-বড় সব আহ্বানে সাড়া দিতে তাই আমাদের প্রত্যেকের প্রস্তুত থাকতে হবে। আমার অমুল্য ঈমান ও আমার উজ্জ্বল স্বদেশ প্রেম তাহলেই এদেশে অগণিত সুনাগরিক উপহার দিতে পারবে।
**************************
শ রী ফ মু হা ম্ম দ
আমার দেশ, ২১ মার্চ ২০০৮