আরবি জিলহজ মাসের দশ, এগার, বার তারিখে প্রভুর সন্তষ্টি লাভের আশায় যে পশু জবাই করা হয় তাকেই কোরবানি বলে। সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানই এ কোরবানি করে থাকেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, কোরবানির মূল কথা কি? এর কি আছে কোন ইতিহাস বা অত্যুজ্জ্বল কাহিনী, যা হৃদয় মাঝে কোন শিহরণ জাগায়? সাড়া জাগায় তনুমনে কিংবা আন্দোলিত করে? নাকি শুধু আনন্দ-ফুর্তি, কেনাকাটার ভিড়, ডিপ ফ্রিজ কেনার প্রতিযোগিতা বা কোরবানি উপলক্ষে বিভিন্ন সামগ্রীর মূল্যহ্রাসকেই বোঝায়? এসব প্রশ্নের জবাবে বলতে হয়, অবশ্যই এ কোরবানির পেছনে রয়েছে একটি গৌরবের ইতিহাস। একটি হৃদয়স্পর্শী কাহিনী। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহিম (আ·) জীবনের সবুজ প্রান্তর পেরিয়ে গেছেন। শত এর কাছাকাছি বয়স। জীবনটা পেরিয়ে গেল একাকিত্বের দুর্বিষহ কষ্ট নিয়ে। এই নিঃসন্তান একাকিত্বের কষ্ট লাঘব করতে আশায় বুক বাঁধলেন। প্রবল আত্মবিশ্বাসী তিনি। অবশ্যই প্রভু তার দোয়া কবুল করবেন। জীবন সায়াহ্নে একটি সন্তান লাভের জন্য দোয়া করতে লাগলেন। অনেক বিনিদ্র রজনী কাটিয়ে দিলেন অশ্রুসজল নয়নে। কোরআনের ভাষায় -‘প্রভু হে আমাকে একটি নেক সন্তান দিন।’ আল্লাহ তার দোয়া কবুল করলেন। সুসংবাদ দিলেন একটি নেক সন্তানের। কোরআনের ভাষায় '‘অতঃপর তাকে সহনশীল এক সন্তানের সুসংবাদ দিলাম।’ হযরত ইবরাহিম (আ·) শুকরিয়া আদায়ে প্রভুর দরবারে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। আদায় করলেন প্রভুর কৃতজ্ঞতা। এবার ঘুচবে একাকিত্ব। আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। জন্ম নিলেন হযরত ইসমাইল (আ·)। কিন্তু কে জানত পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। শিশু ইসমাইল বড় হতে লাগলেন। ইবরাহিম (আ·) ভালোই কাটিয়ে দিচ্ছিলেন বৃদ্ধ বয়সের শেষ সময়গুলো। এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন প্রিয় বস্তু কোরবানি করার। কোরআনের ভাষায় '‘হে বৎস আমি তোমাকে স্বপ্নে কোরবানি করতে দেখেছি। তো তোমার মতামত কি?’ বালক ইসমাইল দীপ্ত কণ্ঠে পিতাকে জানিয়ে দিলেন আপনাকে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন করুন। নিশ্চয়ই আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন। পিতা-পুত্র মিলে প্রভুর আদেশ বাস্তবায়নে চললেন মিনা প্রান্তরে। পুত্র প্রস্তুত খোদার আদেশে জীবন দিতে। পিতা ইব্রাহিম ছুরি চালাতে প্রস্তুতি শেষ করলেন। দুনিয়ার আকাশ এখনি দেখতে পাবে খোদাপ্রেমের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টা-। পিতা ছুরি চালালেন। খুব শক্তভাবে চালালেন। জবাইও সম্পন্ন হল। তবে পুত্র নয় বরং জান্নাতি দুম্বা। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন হযরত ইবরাহিম ও তার আদরের ইসমাইল। আল্লাহ সন্তুষ্ট হলেন এবং ঘোষণা দিলেন, হে ইবরাহিম তোমার স্বপ্ন তুমি বাস্তবায়ন করেছ। এটাই হল কোরবানির প্রকৃত ইতিহাস। আর সে কোরবানিই মুসলমানরা করে থাকে। আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মদির জন্য তা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। আমরা সে ওয়াজিব আদায় করতেই পশু জবাই করে থাকি; কিন্তু আমরা তো আমাদের ভেতরের পশুত্বটা জবাই করতে পারি না।

দিন দিন আমাদের ভেতরের পশুত্বটা তাজা হচ্ছে। আমাদের ভেতরের হিংসা-বিদ্বেষের পরশ্রীকাতরতার জন্তটা আরও হিংস্র হয়ে উঠছে। আমরা তো বড় পশুর প্রদর্শনী আর ফ্রিজ কেনার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছি। সরে পড়ছি কোরবানির মূল উদ্দেশ্য থেকে। কোরবানির মাধ্যমে রেজায়ে এলাহি প্রত্যাশার বদলে আমরা আজ প্রত্যাশা করি অন্য কিছু। অথচ এসব কিছুই প্রভুর দরবারে পৌঁছে না। পৌঁছে শুধু তাকওয়া, খোদাভীতি। কোরবানির মাধ্যমে সেই তাকওয়া ও খোদাভীতি অর্জনে সক্ষম হলেই আমাদের কোরবানি সার্থক হবে।

**************************
লেখকঃ  মুফতি মুফীযুর রহমান
উৎসঃ দৈনিক যুগান্তর, ৩০শে নভেম্বর ২০০৭