প্রায় দেড় হাজার বছর আগের রবিউল আউয়ালের কোনো এক প্রভাত। আরব মরুর মক্কা উপত্যকায় উদিত হয়েছিল আলোকদীপ্ত এক নতুন সুর্য। যার আলোকরশ্মি বিদীর্ণ করেছিল গোমরাহী ও মুর্খতার পুরু পর্দা। সে প্রভাতের বিভায় অবিচার ও অনাচারের লু হাওয়া পরিণত হয়েছিল মলয় সমীরণে। বছরের পর বছর ধরে যে আরব ভুমি তথা বিশ্বমানবতা পিপাসায় হাহাকার করছিল, তার ওপর বয়ে যায় রহমতের বারিবর্ষণ। যাতে সততা, নিষ্ঠা, ভ্রাতৃত্ব, হৃদ্যতা, ন্যায় ও সাম্য থেকে বঞ্চিত মানবতার রুক্ষ ভুমি পুর্ণ হয়ে ওঠে শ্যামল শোভায়। জগতের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির জন্মের সেই শুভ মুহুর্তে আনন্দের বন্যা বইতেছিল সর্বত্র। সে খুশির বারতা পৌঁছে গিয়েছিল দিক-দিগন্তে। মহানবী (সা.)-এর জন্মের শুভ মুহুর্তের আলোড়িত সব ঘটনাই জানান দিচ্ছিল বিশ্বমানবতার গগনে প্রদীপ্ত সুর্যের উদয়ের কথা। ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, সে রাতে কিসরা প্রাসাদের চৌদ্দখানা পাথর খসে পড়ে। পারস্যের অগ্নিকুন্ড নিভে যায়। সাবওয়াহ নদী শুকিয়ে যায়। এগুলো ছিল মুলত চোখে পড়ার মতো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছাড়াও অনারবের মর্যাদা, রোমের প্রভাব, চীনের অগ্রগতির ধাপসমুহ ভেঙে পড়ার কারণও ছিল তাই। এজন্যই স্তিমিত হয়েছিল অনিষ্টের নরক, কুফরীর অগ্নিকুন্ড, মুর্খতার দাবানল। অন্ধকারের কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যাওয়া বসুন্ধরা ফিরে পেয়েছিল নতুন প্রাণের স্পন্দন। মানবতা পেয়েছিল জন্মের সার্থকতা। তিনি ছিলেন রহমাতুল্লিল আলামীন। স্বয়ং রাব্বুল আলামীনের ঘোষণা, আমি আপনাকে সারাজাহানের জন্য একমাত্র রহমত করেই পাঠিয়েছি। তার কৃপার বারিধারায় সিক্ত হয়েছিল সৃষ্টিকুলের প্রতিটি বস্তু।

প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর করুণার কারণেই প্রাণীকুল তার প্রতি কৃতজ্ঞ। তার ব্যক্তিত্বের প্রতি দুর্বল। তার নাম শুনলে ভক্তিতে গদগদ করে। কালের বিরামহীন চক্রে দেড় হাজার বছর লীন হয়ে গেলেও আজো পর্যন্ত তার অবদানের কথা জগৎ বাসীর কাছে ভাস্বর হয়ে আছে। এখনো দুনিয়ার প্রতিটি স্হানে প্রতি মুহুর্তে শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত হচ্ছে তার বরকতময় নাম। নাতিদীর্ঘ কর্মময় জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে ইতিহাসের পাতায় রক্ষিত আছে সযতনে। তার সর্বপ্লাবী ব্যক্তিত্বের কাছে দুনিয়ার তাবৎ কৃতিত্ব ও যোগ্যতা ধুসরিত। ঘোর শত্রুর কাছেও তিনি কীর্তিমান, অদ্বিতীয় এক মহাপুরুষ। চরিত্রে তার নেই বিন্দু পরিমাণ কালিমার আঁচড়। চারিত্রিক সার্টিফিকেটে স্বয়ং রাব্বুল আলামীন তাকে সর্বযুগের রেকর্ডসংখ্যক মার্ক দিয়েছেন। কৃতিত্ব, অবদান এবং মানবিক যোগ্যতার আকর্ষণীয় দিকগুলোর সম্মিলনের কারণে প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে নবী করিম (সা.)-এর প্রতি সহজাত টান রয়েছে। সর্বোপরি মহব্বতে রাসুলের পরাকাষ্ঠ প্রদর্শন ঈমানের অনিবার্য দাবি। সে দাবি পুরণার্থে মুসলমান হিসেবে রবিউল আউয়ালের সবাই আন্দোলিত হই। প্রিয় নবীর প্রতি আমাদের ব্যাকুল অন্তরের আকুল অনুভুতির প্রকাশ ঘটে। মহব্বতে রাসুলের নতুন হাওয়া বইতে থাকে চারদিকে।

তবে আমাদের মহব্বতের প্রকাশভঙ্গিটা যথার্থ কি-না তা বিবেচনার দাবি রাখে। অনুষ্ঠানের হিড়িক, চোখ ধাঁধানো চাকচিক্য এবং মহব্বতে রাসুলের সস্তা প্রয়োগের কারণে মাহে রবিউল আউয়াল আমাদের জীবন ধারায় কোনোই পরিবর্তন আনতে পারে না। গতানুগতিক বহমান স্রোতে পন্ড হয়ে যায় রবিউল আউয়ালের প্রকৃত চেতনা ও দাবি। রবিউল আউয়ালের পয়গাম ও দাবি কি-সেগুলোও আমাদের কাছে আজ স্পষ্ট নয়। আনুষ্ঠানিকতার সব আয়োজনই আমরা সম্পন্ন করি কিন্তু এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষা, বাস্তব জীবনে নববী আদর্শের কোনো ছাপ রাখতে পারি না। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন, ‘রবিউল আউয়াল এলে তোমারই গান গাই, রবিউল আউয়াল গেলে তোমায় ভুলে যাই।’ মিলাদ, কিয়াম, জশনে-জুলুশ আর অনুষ্ঠানসর্বস্ব রবিউল আউয়াল যতই উদযাপন করি, প্রাপ্তির খাতায় শুন্যতা থেকেই যাবে। এজন্য সিরাতুন্নবীর যথার্থ দাবি আদায়ের প্রতি মনোযোগী হওয়া ঈমানদীপ্ত চেতনার সর্বপ্রধান দায়িত্ব।

একবিংশ শতাব্দীর সমস্যাসঙ্কুল এই বিশ্বে বছর ঘুরে রবিউল আউয়াল আমাদের দুয়ারে হাজির। প্রিয় নবীর জন্ম-মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মাস হিসেবে এ মাসে নতুন প্রাণে উজ্জীবিত হওয়া সবার কর্তব্য। মুমিনের সামনে স্বচ্ছ আয়নার মতো নববী আদর্শের বাস্তব চিত্র স্হির হয়ে আছে। সিরাতুন্নবীর ডাকে সাড়া দিয়ে সে চিত্রের সঙ্গে নিজেদের জীবনের রুপটা পরখ করে দেখলেই প্রত্যেকের স্ব স্ব পরিচয় উদ্ভাসিত হয়ে যাবে। অনুমান করতে কষ্ট হবে না আমাদের জীবনচিত্র সে ছাঁচের কাছে কতটা বেমানান। আদর্শিক বিচারে নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর (সা.) পথ ও পদ্ধতি অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। আমি যে কেউই হই না কেন, আমার জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সিরাতুন্নবীর মধ্যে রয়েছে অনন্ত পাথেয়। অন্ধকারে আলোকদিশা পাওয়ার প্রৌজ্জ্বল জ্যোতি একমাত্র সিরাতে রাসুলের (সা.) মধ্যেই বিরাজমান। জীবনের সকল ঝঞ্ঝাট, সংকট ও সমস্যাকে জয় করতে হলে সিরাতুন্নবীর ডাকে সাড়া দিতে হবে। কারণ, সীরাতুন্নবীই হলো কিয়ামতাবদি আগত-অনাগত সব মানুষের মুক্তি ও সফলতার চিরন্তন অঙ্গীকার।

**************************
জ হি র উ দ্দি ন বা ব র
আমার দেশ, ২১ মার্চ ২০০৮