- Home
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
- সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং আল্লাহর বেঁধে দেয়া সীমারেখা
সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং আল্লাহর বেঁধে দেয়া সীমারেখা
- By Article Poster
- Published 03/28/2008
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
- Unrated
“আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সব কিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ।” (সুরা বাকারা ২৮৪)। ধন-সম্পদের ব্যাপারে প্রাথমিক বা মৌলিক কথা হলো এর প্রকৃত মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। দ্বিতীয়তঃ মানুষ কেবলমাত্র ভোগ-ব্যবহারের অনুমতিসহ-এর আমানতদার বা ট্রাষ্টি মাত্র। যেহেতু সম্পদের মূল মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, তাই তিনিই একমাত্র এর বন্টনের অধিকার রাখেন। তিনি আল-কোরআনের মাধ্যমে এর সুষম ও ইনসাফভিত্তিক বন্টনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। কোন ব্যক্তি নিজের ইচ্ছামত পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে সম্পদ বন্টন করার অধিকার রাখেন না। কারণ মানুষের মস্তিষ্ক তৈরী বন্টন ব্যবস্থায় কখনো ন্যায়-ইনসাফ ও সুষম বন্টন নিশ্চিত হতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা সবচেয়ে বেশী ন্যায়বান। তাই নবী করিম (সাঃ) বলেছেনঃ “ধন-সম্পদকে উহার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী বন্টন কর।” (মুসলিম)। মহান আল্লাহ তায়ালা সুরা নিসার ৭,১১-১৪, ৩৩ ও ১৭৬ নং আয়াতসমূহে মৃত ব্যক্তির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের উত্তরাধিকার ও তাদের অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
ইসলামী মীরাসী আইনের গুরুত্ব অপরিসীম। এ আইনের মাধ্যমে ধন-সম্পদের আবর্তন বংশানুক্রমিকভাবে অনন্তকাল চলতে থাকবে। ব্যক্তির নিজের জীবনে যে সব লোকের সাথে বৈষয়িক কিংবা আত্মিক অথবা রক্তের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, তার মালিকানায় ধন-সম্পত্তি তার মৃত্যুর পর ঐ সব লোকের মধ্যে সুনির্দিষ্ট নিয়মানুসারে বন্টিত হবে। পাশ্চত্যের এক আইনজ্ঞ লিখেছেনঃ “আধুনিক সভ্য পৃথিবী ধন-বন্টনের যত নিয়ম ও পন্থা আবিষ্কার করতে পেরেছে, ইলামের উত্তরাধিকার আইন তন্মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক বৈজ্ঞানিক ও নির্ভুল। এ আইনের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও নিখুঁত সামঞ্জস্য অপরিসীম।” রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ “উত্তরাধিকার আইন নিজেরা শিখ, মানুষকে শিক্ষা দাও। কারণ ইহা ইসলাম সম্পর্কীয় যাবতীয় জ্ঞানের অর্ধেক।” (তিরমিযি, ইবনে মাযাহ)।
০১· প্রায়শই দেখা যায় যে, ব্যক্তি জীবিত থাকতেই কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যেমনঃ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হলে, হজ্জ্বে গমন কালে, বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছলে অথবা অধিক মুন্সীয়ানা প্রকাশ করার নিমিত্তে সম্পত্তি ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বন্টন করে দেয়। এটি ঠিক নয়। কারণ উত্তরাধিকার কারো জীবিতাবস্থায় হয় না।
উত্তরাধিকার বলতে বুঝায় একজনের অনুপস্থিতিতে অন্যের অধিকার লাভ। যাদের মধ্যে সম্পদ বন্টন করা হলো, কোন কারণে সেই ব্যক্তিটি তার উত্তরাধিকার নাও হতে পারে অথবা উত্তরাধিকার হলেও কোন কারণে হয়তবা তার অংশে তারতম্য ঘটতে পারে। কারণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মীরাসের অংশগুলো এমনভাবে নির্ধারণ করেছেন যে, প্রতিটি অংশ উত্তরাধিকারীদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে। একজনের অনুপস্থিতিতে অন্যজনের অংশের ক্ষেত্রে তারতম্য সৃষ্টি হয়।
তাছাড়া বিশেষ কার্যকারণেও মীরাসে পরিবর্তন ঘটতে পারে। কারণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মীরাসের অংশগুলো এমনভাবে নির্ধারণ করেছেন যে, প্রতিটি অংশ উত্তরাধিকারীদের পারস্পারিক সম্পর্ক ও উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে। একজনের অনুপস্থিতিতে অন্যজনের অংশের ক্ষেত্রে তারতম্য সৃষ্টি হয়। তাছাড়া বিশেষ কার্যকারনেও মীরাসে পরিবর্তন ঘটতে পারে। যেমন তিন ব্যক্তি মিরাস হতে বঞ্চিত হয়ঃ (ক) হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির মীরাস লাভ করতে পারবে না। নবী করিম (সাঃ) বলেছেনঃ “হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির মীরাস লাভ করতে পারবে না।” (ইবনে মাজাহ)। (খ) ধর্মের বিভিন্নতার দরুন একজন অপরজনের মীরাস হতে বঞ্চিত হবে। বুখারী ও মুসলিমের এক হাদিস থেকে জানা যায় যে, “মুসলামান ব্যক্তি কাফিরের এবং কাফির ব্যক্তি মুসলিমের উত্তরাধিকার লাভ করতে পারবে না।”
০২· অনেকে আবার মনে করেন যে, কন্যারা স্বামীর বাড়িতে ধন-সম্পদ নিয়ে যাবে, এ ভয়ে জীবিতাবস্থায় সমস্ত সম্পদ ছেলেদের নামে দলিলপত্র করে দেয় অথবা কোনক্রমে সামান্য কিছু দিয়ে বিদায় করে দেয়া হয়। এটিও একটি মারাত্মক অন্যায় ও ইসলামী আইনের সুস্পষ্ট লংঘন। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছেঃ পুরুষদের অংশ দু’জন মেয়ের সমান। যদি দু’য়ের বেশী মেয়ে হয়, তাহলে পরিত্যক্ত সম্পত্তির তিনভাগের দুভাগ তাদের দাও। আর যদি একটি মেয়ে ওয়ারিশ হয়, তাহলে পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধেক তার।” (নিসাঃ ১১)
০৩· অনেক সময় লক্ষ্য করা যায় যে পিতামাতার মৃত্যুর পর ছেলে উত্তরাধিকারীরা বিভিন্ন কলা-কৌশল অবলম্বন করে মৃত ব্যক্তির মেয়ে উত্তরাধিকারীদেরকে বঞ্চিত করে থাকে। কোন কোন এলাকায় মেয়েরা ওয়ারিশ গ্রহণ করবে, এটিকে ঘৃণার বিষয় মনে করা হয়। সমাজের সুবিধাবাদী লোকেরাই মূলতঃ নিজেদের বদ-মতলব চরিতার্থ করার জন্য এ ধরনের একটি কুপ্রথা গড়ে তুলেছে। তারা এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করে যার দরুন মেয়েটি তার অংশ নিতে আর এগিয়ে আসে না। এ সমস্ত লোক, দুষ্ট, লোভী ও স্বার্থপর। বোনদের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাদের দরুন অবশ্যই এদেরকে আল্লাহর বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে বোন মনে করে যে, অংশ চাইতে গেলে ভাই রাগ করবে অথবা ভাইয়ের সাথে মন কষাকষি হবে। ফলে সে তার অংশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় অথবা চক্ষু লজ্জায় মাফ করে দেয়। এদিকে ধূর্ত ভাইটি নিরব ভূমিকা পালন করতে থাকে। এক সময় দেখে যে বোনটি আর তার অংশ দাবী করছে না, প্রসংগক্রমে হয়ত জানতে পেরেছে যে বোন মাফ করে দিয়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন এ ধরনের মাফ ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়।
০৫· কারো শুধুমাত্র একটি অথবা দু’টি মেয়ে আছে, সে মনে করে যে, এরা অর্ধেক অথবা দুই তৃতীয়াংশ পাবে, বাকি সম্পত্তি অন্যেরা নিয়ে যাবে এটি কি করে হয়। তাই জীবিতাবস্থায় সমস্ত সম্পত্তি তাদের নামে লিখে দেয় হয়। এটি আল্লাহর আইনের সুস্পষ্ট লংঘন। আবার যারা আল্লাহর আইনটি সম্পর্কে অল্পবিস্তর জানেন, তারা আবার জায়েজ করার নিমিত্তে তসবিহ, এক যিল কোরআন শরীফ ও একখান জায়নামাজ-এর পরিবর্তে সমস্ত সম্পত্তি লিখে দেন। এখানে নিয়তের ওপর আমি হামলা করতে চাই না। তবে বুখারী শরীফের প্রথম সেই হাদীসটি যা নিয়তের ব্যাপারে বলা হয়েছে তা স্মরণ করার অনুরোধ করবো।
০৬· এয়াতিমের মাল আগুন। অপরিণামদর্শী কিছু কিছু লোককে এ আগুন নিয়েও খেলা করতে দেখা যায়। এয়াতিম এবং নাবালেগ উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তি মৃতব্যক্তির প্রভাবশালী আত্মীয়-স্বজনেরা বিভিন্ন কলা-কৌশল অবলম্বন করে আত্মসাৎ করে। এদেরকে বলবো আপনি যদি আপনার চক্ষুশীতলকারী আদরের শিশু সন্তানটি নিয়ে একটু এভাবে চিন্তা করেন যে, আপনার অনুপস্থিতে সে কি কি অভাবের সম্মুখীন হবে। তাহলে একজন এতিমের মর্মস্পর্শী হ্নদয়ের অব্যক্ত কান্না আপনার বিবেককে অবশ্যই ব্যতিত করবে, আপনার উপলব্ধির করুণ মর্মবেদনা আপনার চোখকে অশ্রুসিক্ত করবে। এয়াতিমের মালের ব্যাপারে আল্লাহর বাণী শুনে নিনঃ “নিশ্চয় যারা এয়াতিমদের মাল অন্যায়ভাবে ভোগ করে, তারা নিজেদের পেট শুধুমাত্র অগ্নি দ্বারা ভর্তি করছে এবং শীগ্রই জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে প্রবেশ করবে।” (নিসাঃ ১০) আল্লাহতায়ালা আরো বলেনঃ “এয়াতিমদেরকে তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দাও। উত্তম মালামালের সহিত খারাপ মালামালের বিনিময় করো না এবং তাদের সম্পদকে নিজেদের সাথে সংমিশ্রণ করে, তা গ্রাস করো না। নিশ্চয় এটা বড় ধরনের পাপ।” (নিসাঃ ২)
০৭· দূরবর্তী আত্মীয়-এয়াতিম ও মিসকীন যাদের মিরাসে কোন অংশ নেই তাদের সাথে যেন হ্নদয়হীন ব্যবহার করা না হয়। একটু ইহসান, একটু ঔদার্যের পরিচয় দিয়ে পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে তাদেরকেও কিছু দেয়া উচিত। দুঃখ ভারাক্রান্ত হ্নদয় নিয়ে তারা যেন ফিরে না যায়। যদি এমনটি হয় তবে এর চেয়ে অমানবিক, নির্মম ও হ্নদয়বিদারক আচরণ আর কিছুই হতে পারে না। আল্লাহতায়ালা বলেন “ধন-সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারার সময় আত্মীয়-স্বজন, এয়াতিম ও মিসকিনরা এলে তাদেরকেও ঐ সম্পদ থেকে কিছু দিয়ে দাও এবং তাদের সাথে ভালোভাবে কথা বলো।” (সূরা নিসাঃ ৮) আমাদের সমাজ সংসারে প্রচলিত উল্লেখিত নিষিদ্ধ কাজগুলো পরিহার করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করব। মনে রাখবেন আপনি যে মৃত ব্যক্তিটির উত্তরাধিকারী হয়েছেন, সেখানে আপনাকেও যেতে হবে। প্রতিটি কৃতকর্মের জবাব আপনাকে দিতে হবে। দুনিয়ার সম্পদের লোভে যে হ্নদয়হীন ব্যবহার আপনি করেছেন, যেদিন সকল ক্ষমতার দন্ড একমাত্র আল্লাহর হাতে থাকবে, সেদিন যদি আপনার সাথে একই ব্যবহার করা হয়, তখন আপনার কি হবে? আল-কোরআনে মিরাসী আইন বর্ণনা করার পর বলা হয়ঃ “এগুলো হলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা।
**************************
জাফর আহমাদ
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৮ মার্চ ২০০৮