Islamic Article Archive - http://articles.ourislam.org
ইতিহাসের পাতা থেকেঃ বাংলায় ইসলাম প্রচারে আরব বণিকদের ভূমিকা
http://articles.ourislam.org/articles/114/1/aaaaaaaa-aaaa-aaaaa-aaaaaa-aaaaa-aaaaaaa-aaa-aaaaaaa-aaaaaa/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 03/28/2008
 
পৃথিবীর সবদেশ, সব জাতিরই রয়েছে নিজস্ব জীবন-সংস্কৃতি। আবার, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জ্ঞানবিকাশের সাথে সাথে একদেশের সংস্কৃতি পৌঁছে যায় আরেক জনপদে। প্রাক ইসলাম যুগে আরব বণিকদের উর্টের কাফেলা মরুসীমানা অতিক্রম না করলেও, ইসলামের অভ্যুদয়ের পর সমুদ্রের হাতছানি তারা উপেক্ষা করেননি। বাণিজ্যের তরী ভাসিয়ে তারা পাড়ি দিয়েছেন সাগর-মহাসাগর। একইসঙ্গে তারা এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে নিয়ে গেছেন ইসলামের শাশ্বত বাণী।

ইতিহাসের পাতা থেকেঃ বাংলায় ইসলাম প্রচারে আরব বণিকদের ভূমিকা

পৃথিবীর সবদেশ, সব জাতিরই রয়েছে নিজস্ব জীবন-সংস্কৃতি। আবার, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জ্ঞানবিকাশের সাথে সাথে একদেশের সংস্কৃতি পৌঁছে যায় আরেক জনপদে। প্রাক ইসলাম যুগে আরব বণিকদের উর্টের কাফেলা মরুসীমানা অতিক্রম না করলেও, ইসলামের অভ্যুদয়ের পর সমুদ্রের হাতছানি তারা উপেক্ষা করেননি। বাণিজ্যের তরী ভাসিয়ে তারা পাড়ি দিয়েছেন সাগর-মহাসাগর। একইসঙ্গে তারা এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে নিয়ে গেছেন ইসলামের শাশ্বত বাণী।

ইসলামের প্রাথমিক যুগেই আরব বণিকগণ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দ্বীপাঞ্চল-জাভা, সুমাত্রা, বর্ণীও, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, বাঙ্গালা, কামরূপ (কামরূত) আরাকান চীন প্রভৃতি জনপদে প্রসারিত করতে সক্ষম হয় বাণিজ্যের দিগন্ত। বণিক ও সওদাগরের বেশে আরব ভূমি থেকে এদেশে আসেন অনেক জ্ঞানী-গুণী দরবেশ কামেল।

আরব বণিকগণ এইসব অঞ্চল হতে গরম মশল্লা সহ বিবিধ পণ্য সংগ্রহ করে ইউরোপের বাজারে রপ্তাণী করত। খ্যাতিমান আরব ভৌগোলিকগণের মতে বাংলার দক্ষিণ পূর্ব উপকূলে সমন্দর/শতগঙ্গ বা শাতি-উল-গঙ্গ নামক বন্দরটি তৎকালীন আরব বণিকদের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে বিকাশ লাভ করে। এই সমন্দর বা শতগঙ্গ বন্দরকেই কেন্দ্র করে বাংলার বিখ্যাত হস্তিদন্ত, সুগন্ধি চাল, আর সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্র সংগ্রহ করে ইউরোপের বাজারে রপ্তাণী করা হত। এ সকল অতি মূল্যবান দ্রব্য সামগ্রী তৎকালীন ইউরোপের বাজারে আভিজত্যের প্রতীক হিসেবে ব্যাপক চাহিদা ছিল। এই বন্দর থেকে সংগৃহীত সুগন্ধি আগর আতর, চন্দন কাঠ ইরাক, ইরান, খোরাসান সহ মধ্যপ্রাচ্যয়ীয় দেশগুলোতে রপ্তাণী করা হত।

উল্লেখ্য, এখনও সিলেট জেলা হতে আগর আতর ও কাঠ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তাণী হয়ে থাকে।

সমন্দর বা শতগঙ্গ বন্দর সম্পর্কে ঐতিহাসিক আল-ইদ্রিসীতাঁর “নুজহাতুল মোস্তাক” গ্রন্থে বলেন যে, “কনৌজের অধীন সমন্দর একটি বড় শহর ও বাণিজ্য কেন্দ্র এবং সমৃদ্ধশালী বন্দর। এখান থেকে মিষ্টি পানির নদীপথে কামরূত থেকে বিশদিনে চন্দন কাঠ আনয়ন করা যায়”। ভৌগোলিক খুরদাদবীহ্‌, আল মাসালিক ওয়াল মামালিক “গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, ”কামরূত থেকে নদীপথে সমন্দরে চন্দন কাঠ আনীত হয়”। ডঃ আব্দুল করিম তাঁর “চট্টগ্রামে ইসলাম” গ্রন্থে সমন্দর ও চট্টগ্রাম যে একই স্থান তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন। বিশ্বখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে আরব বণিকদের বাণিজ্য পন্য সমন্দর বা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আনা নেয়া করত সে বিষয়ে উল্লেখ্য করেছেন।

আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে ঐতিহাসিক আবুল ফজল উল্লেখ করেন যে, “বাঙ্গালার দক্ষিন পূর্বে আরখংগ (আরাকান) নামে একটি দেশ আছে, সেখানে প্রচুর হস্তি দন্ত প্রাপ্ত হওয়া যায় এবং চাটগাঁও যার একমাত্র সমুদ্র বন্দর।”

উপরোক্ত বিষয় বিশ্নেষণ করে ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে আরব বণিকগণ যে, বঙ্গদেশের উপকুলীয় অঞ্চলের অভ্যন্তরে বাণিজ্য পরিচালনা ও যাতায়াত করত, সে কথা সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়। যাহোক, প্রাক ও প্রাথমিক ইসলাম যুগের সন্ধিক্ষনে অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিশ্বমানবতার মূর্ত প্রতীক হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বিদায় হজ্জের বানী শুধু মুসলমানদের মধ্যেই নয় বরং মানব জাতির ধর্মীয় চেতনায় পুর্নজাগরণ ঘটায়। দশম হিজরীতে নবীকরিমের (সাঃ) ওফাতের পর সাহাবা, তাবে দেশ তাবেয়ী, জ্ঞানী মুসলমানগণ ও মুসলিম বণিক সম্প্রদায় আপন তাগিদে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে ছুটে যান দেশ হতে দেশান্তরে।

সপ্তম শতকের প্রারম্ভেই ভারতীয় পশ্চিম উপকূল মালাবারে (বর্তমান কেরালা) ইসলাম প্রচার শুরু হয়। “তুহফাতুল মোজাহেদীন ফি বা যে আহওয়লীল বারতাকালীন” গ্রন্থে শায়খ জয়েনউদ্দীন বর্ননা করেন যে, “তৎকালীন মালাবার রাজ চেরুমল ও তদীয় ভ্রাতা পেরুমল ইসলামের মহিমায় উদ্দীপ্ত হয়ে মক্কায় গিয়ে নবীকরিমের নিকট ইসলাম গ্রহন করেন”।

ভারতীয় পশ্চিম উপকূল অতিক্রম করে দক্ষিন -পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যাতায়াত করার সময় বঙ্গ দেশের উপকূলবর্তী তাম্রলিপ্তি (অধুনা তমলুক) ও শতগঙ্গ (চট্টগ্রাম) ছিল তাদের মধ্যবর্তী প্রধান বন্দর। সঙ্গত কারণে সমকালীন স্বেচ্ছায় ইসলাম প্রচারক সাহাবী, তাবেরী ও মোত্তাকীনগণ আরবীয় বণিক গণের সহিত সহজেই আগমন করতে পারতেন। আরবীয় বণিকগণ দীর্ঘ সময় এদেশে অবস্থান করে গঙ্গা নদীর উপকূল বেয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ব্যবসা বাণিজ্য করতেন এবং তৎসঙ্গে পাহাড়পুর, ময়নামতি ও শালবন বিহারে ইসলাম প্রচার করতেন বলে ডাঃ রহিম তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

ব‘ত বাংলার উপকূলে আরব বণিকগণের আগমনের মাধ্যমেই যে ইসলাম প্রচারের সূত্রপাত হয়েছিল, ইবনে বতুতা, ইবনে খুরদারবিহ মাসউদী, আল-ইদ্রিসী প্রমুখ ভৌগোলিক এবং পরিরাজকগণ বাংলার উপকূলে আরব বণিকগণের যাতায়াত সম্পর্কে তাদের মূল্যবান গ্রন্থাদিতে বহুবার উল্লেখ্য করেছেন।

অনেকে মনে করেন, ভারতে ইসলাম প্রসারে রাষ্ট্রীয় শক্তির উদ্ভবই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে একথার যথার্থ স্বীকার করার আগে বলতে হয় যে, বঙ্গদেশে আগে ইসলাম প্রসার লাভ করে নাকি ইসলামী রাষ্ট্রশক্তির উদ্ভব ঘটে? একবাক্যে বলা যাবে যে, রাষ্ট্রশক্তির উদ্ভব নয় বরং ইসলামই আগে এদেশে প্রসার লাভ করে। আর তা যদি হয়, তবে আরব বণিক ও পুতচরিত্র ইসলাম প্রচারকগণ বাংলায় সর্বপ্রথম ইসলামের শাশ্বত বাণী প্রচার ও প্রসার ঘটায় যা পরবর্তীকালে মুসলিম বিজেতাগণের বিজয় সাফল্যে সহায়তা করে। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরীয় বহুদেশ ও বাংলার উপকূল হয়ে ইসলামের বাণী প্রচারিত হয়। আরব বণিকগণ দীর্ঘসময় বাণিজ্যব্যপদেশ বাংলায় অবস্থানের কারণে অনেকে এদেশীয় মহিলা বিবাহ করে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। তাদের ঔরসে জন্ম নেয়া সন্তান সন্ততির মাধ্যমে সূচীত হয় নতুন বংশধারা। বংশপরস্পারায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভাষায় আরবী উচ্চরনের ধৃনীর খেই এখনও বিদ্যমান। আরবী আদলে নাম রাখার প্রবণতা এবং অনেকেই নিজেকে আরব বংশউদ্ভূত সৈয়দ বংশীয় বলে দাবী করে গৌরব বোধ করেন। চট্টগ্রাম বাংলার উপকূল অঞ্চল হিসাবে। আরব বণিকগণের সহজ যাতায়াত হেতু আরবী ভাষা, সংস্কৃতি, রক্তের সংমিশ্রণ উপকূলীয় অঞ্চল ইসলাম প্রচারে আরব বণিকগণের অগ্রণী ভূমিকার ইঙ্গিত বহন করে।

ডাঃ আবদুর রহিমের ঝড়পরধষ ধহফ পঁষঃঁৎধষ যরংঃড়ৎু ড়ভ ইধহমষব গ্রন্থে বাংলার উপকূলভাগ এবং বিশেষ করে চাটগাঁও অঞ্চলে আরব বণিকগণের যাতায়াত অতি প্রাচীন, সে সম্পর্কে অতি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, এমনকি “শান্তি -উল-গঙ্গ” নামটি আরব বণিকগণেরই দেয়া। চট্টগ্রামের আলকরণ, সুলকবহর, বাকালিয়া অঞ্চল গুলো আজও আরবী নামে জীবন্ত বর্তমান।

আরব বণিকদের সঙ্গে বাংলার যোগাযোগ অতি সুপ্রাচীন তা আরাকান রাজবংশীয় উপাত্থান “বাজদাতুয়ে” বলা হয়েছে, “কানরাদজাগীয় বংশীয় আরাকান রাজা মহতইঙ্গত চন্দয়ত এর রাজত্বকালে (৭৮৮-৮১০ খ্রিঃ) কয়েকটি বিদেশী জাহাজ রনবী) (অধুনা-রামরী) দ্বীপের কাছে বিধৃস্ত হলে মুসলমান আরোহীগণকে আরাকান পাঠান হয়”।

সার্বিক তথ্যাদি ও আলোচনার ভিত্তিতে নির্দ্ধিধায় বলা যায় যে, ইসলাম পূর্ব ও প্রাথমিক পর্যায় হতে আরব বণিকগণের অবাধ বাণিজ্যিক যাতায়াত বঙ্গ দেশে ইসলাম প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

**************************
মোহাম্মদ কোরবান আলী বকসী
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৮ মার্চ ২০০৮