- Home
- ইতিহাস ও ঐতিহ্য
- দার্শনিক ইবনে খালদুন
দার্শনিক ইবনে খালদুন
- By Article Poster
- Published 03/28/2008
- ইতিহাস ও ঐতিহ্য
- Unrated
আরব সভ্যতা জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যেসব মৌলিক প্রতিভার জন্ম দিয়েছে ইবনে খালদুন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর পুরো নাম আবু যইদ ওলিউদ্দীন আবদুর রহমান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে খালদুন আল-তুনিসী আল হাদরামী আল ইশবিলী আল মালিকী। তিনি ১৩৩২ খ্রিস্টাব্দের ২৭মে উত্তর আফ্রিকার তিউনিস শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। ইবনে খালদুন একাধারে ছিলেন পাশ্চাত্য মুসলিম ঐতিহাসিক, দার্শনিক এবং শিক্ষক, ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বের দর্শনের অন্যতম রূপকার।
তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। তিনি নিজে পুত্রকে ইসলামের শিক্ষায় দীক্ষা দেন। ধমীয় শিক্ষা ছাড়াও তিনি পুত্রকে ধর্ম, দর্শন , ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা দেন। পরে অবশ্য তিনি অন্যান্য শিক্ষকের নিকট শিক্ষা লাভ করেন। বাল্যকাল থেকেই ইবনে খালদুনের অসাধরণ মেধা ও তীক্ষ্ন বুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়।
মাত্র কুড়ি বছর বয়সে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। প্রথমে তিনি তিউনিসের সুলতান আবু ইসহাক ইব্রাহীমের খাস মুন্সী নিযুক্ত হন। তাঁর প্রগতিবাদী চিন্তা চেতনা ও যুক্তিবাদী দর্শনের জন্য সেখানকার গোঁড়া আলেম সমাজ তাঁর উপর চটে যান। তিনি প্রাণের ভয়ে তিউনিস ত্যাগ করেন ওমায়িমরী সুলতান আবু ইনামের খাস মুন্সী নিযুক্ত হন। তাই চাকুরীকালে তাঁর যশ, প্রতিপত্তি ও সম্পদের প্রসার ঘটে। অবশ্য এখানেও তিনি মর্যাদার সথে টিকতে পারেননি। অদম্য জ্ঞান স্পৃহা ওমায়িমীতে তাঁর সংকটাবস্থা তাকে আবার সে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য করে। তিনি সে স্থান ত্যাগ করে গ্রানাভার সুলতান মুহাম্মদের শরনাপন্ন হয়। গ্রনাভাতে তিনি তদানীন্তন বিখ্যাত পন্ডিত লিসানউদ্দিন ইবনুল খতিবের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে আসেন। খতিবের চেষ্টায় ইবনে খালদুন সুলতানের কৃপাদৃষ্টি লাভ করতে সমর্থ হন। সুলতান তাঁর রাজনৈতিক প্রঙ্গা ও দূর দৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ক্যাস্টিলের রাজা পেডোর দরবারে রাজদূত হিসাবে প্রেরণ করেন। তিনি গ্রানাডায় কিছুদিন অবস্থান করার পর পুরনায় তিউনিসে প্রত্যাবর্তন করেন। এখানে তিনি দশ বছর অবস্থান করেন। এখানে অবস্থানকালে তিনি রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েন। তবে তিনি নানা কারণে রাজনীতির প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে ইবনে সালামার নির্জন দুর্গে বসবাস শুরু করেন। এখানে তিনি চাার বছর ধরে ইতিহাস, দর্শন ও সমাজ বিজ্ঞানের উপর একাগ্রচিত্তে গবেষণা করেন। এখানে অবস্থানকালে তাঁর অমর সৃষ্টি আল মুকাদ্দামা-র পরিকল্পনা ও রচনা শুরু করেন। ১৩৮০ খ্রিস্ট্রাব্দে তিনি জাইতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে আল মুকাদ্দামা-র রচন সমাপ্ত করেন।
এর দু’বছর পর ইবনে খালদুন হজ্জ্বব্রত পালনের জন্য মক্কায় গমন করেন। পথে কায়রোতে উপস্থিত হলে সেখানকার মামলুক সুলতান মালীক আলী জহির তাঁকে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত করেন। দু’বছর পরে তিনি মালেকী সম্প্রদায়ের কাজী নিযুক্ত হন। বিচারক হিসাবে তিনি মালেকী সম্প্রদায়ের আইন সংস্কার করেন। এতে তাঁর বিরুদ্ধ বাদীর তাঁর উপর চটে যান ও তাঁর বিরুদ্ধে কমিশন বসান। তিনি এক সংকটাবস্থায় নিপতিত হন। এসময়ে তাঁর পরিবার পরিজন তিউনিস থেকে কায়রো আসার পথে নৌকা ডুবিতে সকলে প্রাণ হারান। এতে তিনি আরও মুষড়ে পড়েন ও কাজীর পদে ইস্তফা দিয়ে মক্কা গমন করে হজ্জ্বব্রত পালন করে আবার কায়রোতে ফিরে আল্লাহর বন্দেগী ও জ্ঞান সাধনায় পুরোপুরি আতুনিয়োগ করেন। পরে তিনি সমগ্র মিশরের প্রধান কাজী হিসাবে নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যুএই পদে বহাল থাকেন। কর্মজীবনে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকে তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর প্রতিভার যথার্থ প্রকাশ ঘটেছে ইতিহাস ও ইতিহাসের তত্ত্ব সর্ম্পকে রচিত সুবিশাল আল মুকাদ্দামা নামক গ্রন্থে। আরব ও অন্য জাতিসমূহের বিবরণমূলক ইতিহাসের সঙ্গে ইতিহাস পাঠের তাত্ত্বিক দর্শনের আলোচনাতেই ইবনে খালদুনের সৃষ্টিশীলতা ও মৌলিক চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্ম্পক, পরিবেশগত প্রভাবে আর্থ-সামাজিক ও ধর্মীয় বিধি-বিধানে সংঘটিত পরিবর্তন সম্পর্কিত তাঁর আলোচনায় ব‘বাদে চেতনার প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। আর্নল্ড টয়েবি প্রমুখ কয়েকজন পাশ্চাত্য ইতিহাস বিদের মতে ইতিহাসের দর্শন তত্ত্বের ব্যাখ্যায় ইবনে খালদুনের সমকক্ষ প্রতিভা বিরল।
তাঁর রচিত কিতাবুল ইবার এর তিন খন্ডের প্রথম খন্ড আল মুকাদ্দামা মধ্যযুগের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণê ঐতিহাসিক সম্পদ। ইবনে খালদুনকে বুঝতে হলে তাঁর ধর্মীয় আদর্শ বা ইসলামী আদর্শকে সম্পূর্নভাবে হ্নদয়ঙ্গম করতে হবে এবং তারপরই তাঁর সৃষ্টির গভীরে প্রবেশ করা সম্ভব। এভাবে দেখা যায় যে, তিনি সীমাবদ্ধ চিন্তাধারার মধ্যে থেকেও আতু-জিজ্ঞাসায় যেমন দ্বিধা করেন নি তেমনি এর বিজ্ঞানসম্মত সঠিক জবাব দিতেও কার্পণ্য করেননি। মুসলিম দেশ সমূহের মধ্যে তুরস্কে ইবনে খালদুনের আল মুকাদ্দামা সর্ম্পকে সবিশেষ আলোচনা হয়। ইউরোপে বার দ্য নে (baron de slane) কর্তৃক তিন খন্ডে ফরাসী ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে আল-মুকাদ্দামা বিশ্বসাহিত্যে স্থান পায়। অধুনা আরব জাহানে ইবনে খালদুনের প্রতি পন্ডিতদের সবিশেষ দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। তিউনিস বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮৯৭ খ্রিস্টব্দে খাল দুনিয়া একাডেমী সৃষ্টি হয়েছে। আরবীতে আল-মুকদ্দামা ”র বহু জনপ্রিয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। একটি সংস্করণ মুখস্থ করার জন্য বিশেষ চিহ্নসহ মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছে। ইবনে খালদুন মুসলিম রাজ-রাজাদের মধ্যে বহু যুদ্ধ-বিগ্রহ, জয়-পরাজয় দেখেছেন এবং কখনও কখনও নিজেও ভীষণভাবে ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন। এজন্য সম-সাময়িক সময়ের আরব জাহান সম্বন্ধে তাঁর বহু কঠোর উক্তি লেখার মধ্যে দৃষ্ট হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, মুসলমানদের মধ্যে অধিকাংশ পন্ডিত লোকই বিদেশীয় বংশজাত, সকল জাতির মধ্যে আরবগণই সর্বাপেক্ষা কম শাসন ক্ষমতা সম্পন্ন, চারুকলার দিকে তাদের প্রবণতা সকল জাতির চাইতে কম,· আরবেরা লুঠতরাজ কারী ও ডাকাতদের জাত, তাদের অধিকাংশই অট্টলিকাই খান খান হয়ে পড়ে যায় ইত্যাদি। এমন কঠোর উক্তিসমূহ সত্ত্বেও আধুনিক আরব জাহান ইবনে খালদুনের বহুমুখী মহত্ত্বকে বরণ করে নিয়েছেন। ইউরোপের পন্ডিতগণ ইবনে খালদুনের গ্রন্থসমূহের বহু উদ্ধৃতি প্রকাশ ও সে সবের অনুবাদ প্রকাশ করেছেন কিতাবুল ইবার”-এর সম্পূর্ণ সংস্করণ ৭ খন্ডে বুলাক (bulaq) কায়রো হতে ১৮৬৭ সালে প্রকাশিত হয়। আল-মুকাদ্দামা-র প্রথস সংস্করণ ৩ খন্ডে প্যারিস হতে ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত হয়। মধ্যপ্রাচ্য হতে এ কয়েকটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।
কিতাবুল ইবার ও আল মুকাদ্দামা ব্যতীত ইবনে খালদুন শারহে আল বুরদা, আল-হিসাব এবং আল-মানতিক নামে আরও তিনটি গ্রন্থ রচন করেছেন। ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ মার্চ এই জ্ঞানতাপস ইন্তেকাল করেন।
**************************
শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৮ মার্চ ২০০৮