- Home
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
- শিল্পকলা এবং ইসলাম
শিল্পকলা এবং ইসলাম
- By Article Poster
- Published 04/3/2008
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
- Unrated
শিল্পকলা শব্দটি খুবই ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রাঙ্কন এই তিনটি শিল্পকলা সাধনার অন্তর্ভুক্ত। এর বাইরেও আছে, যেমন হস্তলিখন শিল্প ও গৃহসজ্জার উপকরণজাত শিল্প। হস্তলিখন শিল্প চীনে আছে, জাপানে আছে; কিন্তু সেসব দেশে হস্তলিখন হচ্ছে শিল্পচর্চার প্রারম্ভিক অনুশীলন এবং কোনোক্রমেই শিল্প হিসেবে তা সম্পূর্ণ নয়। একমাত্র ইসলামেই কুরআন শরীফের বাণী অবলম্বন করে যে হস্তলিখন শিল্প গড়ে উঠেছে সেটাই পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে বিবেচিত। কুরআন শরীফের প্রতিটি শব্দ, বাক্য, উল্লেখ্য ইতিহাস বর্ণনা এবং প্রতিটি উচ্চারিত ধ্বনি আল্লাহতায়ালার। পৃথিবীর সব দেশে ও সব কালে কুরআন শরীফের প্রতিটি উক্তি সব বিচারে এবং সামগ্রিকতায় ঐশীবাণী বলে প্রমাণিত এবং মান্য হয়ে এসেছে। একজন বিশ্বাসীর জীবনসংক্রান্ত সব নির্দেশ এই গ্রন্থে আছে হয় সুস্পষ্ট ব্যাখ্যায় অথবা ইঙ্গিতে অথবা অবশ্য করণীয় উচ্চারিত নির্দেশে।
হিন্দু ধর্মে, বৌদ্ধ ধর্মে ও খ্রিষ্ট ধর্মে উপাসনালয়গুলো দেবমূর্তির চিত্রাঙ্কনে শোভিত। এসব ধর্মের উপাসনাগৃহে ভাস্কর্য ও চিত্রকলা প্রধান স্থান পেয়েছে। চিত্রকলা ও ভাস্কর্য বিষয়ে ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে। ইসলামের পূর্বে ইহুদি ধর্মে মূর্তি পূজার ব্যবস্থা ছিল না। ইহুদি ধর্মের বিবিধ আচার-অনুষ্ঠানে এবং ধর্মীয় সংস্কারে ভাস্কর্য ও চিত্রকলা নিষিদ্ধ ছিল। খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ বলে থাকেন, একই গোত্রজাত বলে ইহুদি মতবাদের প্রভাব ইসলামের ওপর পড়েছে এবং চিত্রকলা বিষয়ে ইসলামে যে বিধিনিষেধ আমরা লক্ষ করি তার উৎপত্তিস্থল ইহুদি ধর্মশাস্ত্র ‘তালমুদ’ কথাটা। সত্য না মিথ্যা সেই বিবেচনায় আমাদের যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রয়োজন শুধু কুরআন শরীফের আদেশ মান্য করা এবং হাদিস শরীফের বিধিনিষেধ মান্য করে চলা।
কুরআন শরীফে হজরত ইবরাহীম আঃ-এর জীবনের বিবিধ ঘটনা প্রসঙ্গে মূর্তি নির্মাণ এবং ভজনার কথা এসেছে।
‘আনআম’ নামক সূরা, যার ক্রমিক সংখ্যা ৬, সেখানে ৭৪ সংখ্যক আয়াতে আছেঃ ‘স্মরণ করো, ইবরাহীম তাঁর পিতা আযরকে বললেন, আপনি কি মূর্তিকে আল্লাহর পরিবর্তে গ্রহণ করেছেন? আমি তো আপনাকে এবং আপনার সম্প্রদায়কে ভীষণ ভ্রান্তিতে দেখতে পাচ্ছি।’ সপ্তম সংখ্যক সূরা ‘আরাফের’ ১৩৮ সংখ্যক আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলছেন ‘আমরা বনি ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে দিই, সেখানে তারা একদল প্রতিমা পূজারীর সংস্পর্শে আসে। তারা বলে, হে মূসা! তাদের দেব প্রতিমার মতো আমাদের জন্যও দেবমূর্তি তৈরি করে দিন।’ এখানে হজরত মূসা আঃ-এর কাছে আবেদন জানিয়েছিল বনি ইসরাঈল সম্প্রদায়। সূরা ‘ইবরাহীমে’ যার ক্রমিক সংখ্যা হচ্ছে ১৪, সেখানে ৩৫ সংখ্যক আয়াতে বলা হয়েছে, ‘স্মরণ করো, ইবরাহীম বলেছিলেন, হে আমার পালনকর্তা! এই নগরীকে নিরাপদ নগরী করো এবং আমাকে ও আমার সন্তান-সন্ততিকে মূর্তি পূজা থেকে রক্ষা করো।’ সূরা ‘আম্বিয়া’ যার ক্রমিক সংখ্যা হচ্ছে ২১, সেখানে হজরত ইবরাহীম আঃ সম্পর্কে বলা হচ্ছে ৫২-৫৭ সংখ্যক আয়াতে, ‘যখন তিনি তাঁর পিতা এবং সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বললেন, এগুলো কিসের মূর্তি যার উপাসনায় তোমরা রত রয়েছ? তারা বলল, ‘আমাদের পিতৃপুরুষরা এদেরই পূজাঅর্চনা করতেন। তিনি বললেন, যথার্থই তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষই বিভ্রান্তিতে রয়েছ। তারা বলল, তুমি কি আমাদের জন্য চরম সত্য নিয়ে এসেছ, না আমাদের সাথে পরিহাস করছ? তিনি বললেন, না, তোমাদের পালনকর্তা তো আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর পালনকর্তা, যিনি সব কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং এ বিষয়ে আমি অন্যতম সাক্ষী। আল্লাহর শপথ, তোমরা যখন পশ্চাৎমুখী হবে তখন তোমাদের মূর্তিগুলো সম্বন্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা অবলম্বন করব।’
এভাবে কুরআন শরীফে আমরা মূর্তি ধ্বংস করার বিবরণ পাই এবং তার মধ্য দিয়ে মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিধিনিষেধ পাই। এভাবে আমরা দেখি যে, কুরআন শরীফে মূর্তি নির্মাণ ও তার উপাসনা চূড়ান্তরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে ইসলামে অর্থাৎ ইসলামি দেশগুলোতে ভাস্কর্য গড়ে ওঠেনি, কিন্তু ভাস্কর্যের ও চিত্রকলার পরিবর্তে কুরআন শরীফের কয়েক ধরনের লিখন-পদ্ধতি গড়ে উঠেছে, যা পৃথিবীতে ইসলামি শিল্পকলা হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে।
কুরআন শরীফে বারবার বলা হয়েছে যে, সৃষ্টি করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর এবং আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সৃষ্টি করতে পারেন না। একটি হাদিসে আছে আবু যুরাহ্ বলেছেন, আমি যখন আবু হুরায়রা রাঃ-এর সাথে মারওয়ানের গৃহে প্রবেশ করলাম তখন আবু হুরায়রা রাঃ বললেন, আমি রাসূলে করীম সাঃকে বলতে শুনেছি, তার চেয়ে অধিক জালিম আর কে হতে পারে, যে ধারণা করে যে সে আমার মতো সৃষ্টি করতে পারে? সৃষ্টি করুক তো একেবারে শূন্য থেকে একটি বালির দানা অথবা একটি ক্ষুদ্র অণু? এভাবেই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, শিল্পকর্মের উদ্দেশ্য যেখানে আল্লাহ্র সাদৃশ্য নির্মাণ করা, প্রতীক গঠন করা অথবা পূজার জন্য মূর্তি নির্মাণ করা, সেখানকার শিল্পকর্ম, শিল্পকর্ম নয়। সৃষ্টির যে ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ্র, সে ক্ষমতার দাবি আর কেউ করতে পারে না এবং আল্লাহ্কে বস্তুগতভাবে দৃশ্যমান করানো চলে না। সুতরাং আমাদের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে ইসলামি শিল্পকলা একটি সৌন্দর্যগত চিত্রপদ্ধতি। এই পদ্ধতির বিজ্ঞান ইসলামে নানাভাবে হয়েছে স্থাপত্যে, বিমূর্ত হস্তলিখনে ও যথাযথ আকৃতিহীন প্রাণীবাচক বস্তুর রূপব্যঞ্জনায়। এভাবেই মনুষ্য বা জীবদেহে অবিকল প্রতিচ্ছবি অস্বীকার করার প্রবণতা থেকে ইসলামে নতুন ধরনের শিল্পস্বভাব গড়ে উঠল। একজন ফরাসি শিল্পরসিক মনীষী ইসলামি শিল্পকলা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে লিখেছিলেন 'Islam marks the definite triumph of that secular revolution which took the orientals further and further away from naturalism.' ‘শিল্পক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মনিরপেক্ষতার চূড়ান্ত বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে প্রাচ্যের শিল্প বাস্তবমুখিতা থেকে ক্রমান্বয়ে দূরে সরে যেতে থাকে।’
‘আধুনিক ইউরোপীয় চিত্রকলায় বস্তুর স্বরূপকে বিমূর্ত করার প্রয়াসের মধ্যে ইসলামকে আমরা লক্ষ করি।’
ইসলামি চিত্রকলাকে মূলত চার ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি হচ্ছে লতাপাতা বা ফুলের ছবি, দ্বিতীয়টি হচ্ছে জ্যামিতিক আকৃতির বৈচিত্র্য, তৃতীয়টি হচ্ছে হস্তলিখন ও চতুর্থ হচ্ছে একধরনের আকৃতিগত। মূলত ইসলামি চিত্রকলা ডেকোরেটিভ বা অলঙ্করণ। পাতা বা লতাই হোক, লিপি হোক বা বিমূর্ত হোক সব কিছুই অলঙ্করণের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে, যাকে আমরা ইংরেজিতে বলতে পারি ডেকোরেটিভ মোটিভ। এগুলো নিত্যব্যবহার্য বস্তুর গাত্রে পিতল, তামা বা কাচের আধারের ওপরে অঙ্কিত হয়েছে অথবা কার্পেটে অঙ্কিত হয়েছে। ইসলামি চিত্রকলা আর একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছে, সেটি হচ্ছে কাব্যগ্রন্থ চিত্রাঙ্কন। এ ক্ষেত্রে আমরা ইউরোপীয় রেনেসাঁসের সময়কালে তৈমুরীয় যুগের বিশ্ববিখ্যাত শিল্প বিহ্যাদের কথা উল্লেখ করতে পারি। বিহ্যাদের বিশিষ্টতা ছিল মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি সমাজের সামগ্রিক জীবনচিত্রকে উদঘাটনা করা। বহুমাত্রিক মসজিদের বিভিন্ন অংশ ও প্রকোষ্ঠে মানুষের বিভিন্ন কর্মপদ্ধতিকে তিনি চিত্রিত করেছিলেন যার ফলে বিহ্যাদের ছবিগুলো যেমন মুসলমান সমাজের আচরণবিধির অভিব্যক্তি বহন করছে, তেমনি আবার ধর্মীয় নিষ্ঠা ও পরিচর্যার আদর্শ বহন করছে।
তবে বিশ্বশিল্পের ইতিহাসে ইসলামের বিশিষ্ট দান হস্তলিখন শিল্প। কুরআন শরীফের অক্ষরগুলো নানাবিধ ব্যঞ্জনায় ও রূপকল্পে উদ্ভাসিত হয়ে পৃথিবীর মানুষকে চিরকাল অভিভূত রেখেছে। এই হস্তলিখনের বিপুল একটি ইতিহাস আছে এবং ইসলামের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পদ্ধতিতে এই হস্তলিখন রূপ পেয়েছে। যেগুলোকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। একমাত্র কুরআন শরীফের বাণীভঙ্গি বিচিত্র লিখনরূপে পরিচিত্রিত হয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো কুরআন শরীফের বাণীতে সমান্তরাল ও ঊর্ধ্বগ লিপির বৈচিত্র্য অসাধারণ। এই দু’য়ের সাহায্যে লিপিকাররা বহুবিধ অসাধারণ লিপিচাতুর্য নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। কুরআন শরীফ হচ্ছে আল্লাহর বাণী। তাই এই ঐশী বাণীকে সর্বোচ্চ মর্যাদার সুমার্জিত ও সুচিত্রিত করার ব্যাকুলতায় শিল্পীরা একে অন্যের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। বলা যেতে পারে যে, পৃথিবীতে শিল্পের বিমূর্ততার উদ্ভব এখানেই। আল্লাহ সর্বব্যাপ্ত ও নিরাকার। তাঁকে আমরা দেখি না, কিন্তু কুরআন শরীফ উচ্চারিত হলে তাঁর বাণী আমরা শুনি ও পাঠ করার সময় তার লিপিরূপ আমরা দেখি। সুতরাং মনুষ্য হৃদয়ের কাছে এবং অনুভূতির নিগূঢ়তম প্রকোষ্ঠে কুরআন শরীফের বাণীরূপকে উপস্থাপিত করার জন্য চিত্রকররা বহুবিধ কৌশল অবলম্বন করেছেন। এক কথায় বলা যায়, হস্তলিখন শিল্পীরা নিজেদের আল্লাহর সেবায় নিযুক্ত বলে বিবেচনা করতেন। তাই এসব লিখনপদ্ধতির মধ্যে সৌন্দর্য, সৌকুমার্য, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা এসেছে।
পৃথিবীর শিল্পকলার ইতিহাসে ইসলাম একটি নতুন অভিব্যক্তি এনেছিল। সেই অভিব্যক্তির ধারা এখনো বিদ্যমান রয়েছে। রঙে ও রেখায় এবং উৎকীর্ণতায় ইসলামি শিল্পকলা শিল্পচাতুর্যে একটি অনন্যসাধারণ স্বাক্ষর রেখেছে। ইসলাম শিল্পকলাকে মর্যাদাবান করেছে, সমৃদ্ধ করেছে।
ইসলামি শিল্পকলার পূর্ণ বিকাশ ঘটে ৮০০ থেকে ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। এই কয়েক শতাব্দীতে যে দীপ্তি ও ঐজ্জ্বল্য এই সভ্যতা পৃথিবীর কাছে উপস্থিত করেছে তা পাশ্চাত্য সভ্যতা ও পৃথিবীর যেকোনো সভ্যতার সাথে বিচার করলে অতুলনীয় বলে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। মধ্যযুগে পশ্চিম ইউরোপে যখন সংস্কৃতি ও সভ্যতার একটি আড়ষ্ট সীমাবন্ধন ছিল, একটি দুরন্ত নির্জনতা ছিল, তখন ইসলামি সভ্যতা একটি স্বচ্ছন্দ উন্মুক্ততায় পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়েছে। মূলত মুসলমানদের কারণে পাশ্চাত্য শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে পুনর্জাগরণ সম্ভব হয়েছিল। যাকে আমরা রেনেসাঁ বলি অর্থাৎ ইউরোপীয় রেনেসাঁ ইসলামের সংস্পর্শে না এলে তা কোনোক্রমেই সম্ভব হতো না। মুসলমানরা স্পেন দখল করেছিল ও তার ফলে ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে নতুন জাগৃতির সাড়া পড়েছিল।
ইসলামের প্রথম স্থাপত্যকর্ম হচ্ছে মসজিদ। আধুনিককালের সব স্থপতি স্থাপত্যকে উন্মুক্ত স্থানের শিল্প বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই উন্মুক্ততাকে স্থাপত্যকর্মে পূর্ণ ব্যবহার করে, আরাধনার স্থান নির্মাণ করে ইসলাম আধুনিক স্থাপত্যসত্তার জন্ম দিয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে পৃথিবীর সব মৃত্তিকা ও ভূমি হচ্ছে আল্লাহর। সুতরাং যেকোনো স্থানেই একজন মুসলমান নামাজ পড়তে ও আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন হতে পারে। সুতরাং উন্মুক্ততা মুসলমানদের ধর্মকর্মের একটা অঙ্গ। মুসলমানদের ধর্মচর্চায় কোনো অন্তরাল নেই। বৌদ্ধধর্ম অথবা হিন্দুধর্মে মন্দিরের অভ্যন্তরে একটি নির্জন প্রকোষ্ঠ থাকে যেখানে বাইরের আলো প্রবেশ করে না। এভাবে পৃথিবীর কর্ম-কোলাহল থেকে বিমুক্ত হয়ে ওই ধর্মাবলম্বীরা তাদের উপাসনা করে। ইসলামে মসজিদ হচ্ছে সব দিক থেকে উন্মুক্ত, সূর্যের আলোর প্রভাব সম্পূর্ণরূপে আলোকিত ও বাতাস নিশ্চিন্তভাবে প্রবাহমান। ইসলামের প্রথম মসজিদ যে তৈরি হয়েছিল সেখানেই প্রথম এই উন্মুক্ততার নিদর্শন আমরা লক্ষ করি। চতুষ্কোণিক আয়তক্ষেত্রে শুধু সম্মুখভাগটি অর্থাৎ কিবলার দিকটি আবরিত আর সব অংশ উন্মুক্ত। এভাবে অভ্যন্তরের পরিসর ও বহির্বিভাগের পরিসর একে অন্যের সাথে সমন্বিত হয়ে মসজিদ নির্মিত হয়েছে। ক্রমান্বয়ে এই মসজিদ একটি অসাধারণ শিল্পকর্ম হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে। কাবামুখী আবরিত অংশটি স্তম্ভ ও খিলানের সমন্বয়ে নির্মিত। পরে উভয় পার্শ্বেও স্তম্ভ ও খিলান তৈরি হতে থাকে। কিন্তু তখনো মধ্যবর্তী অংশটি উন্মুক্ত রইল। বিভিন্ন দেশে মসজিদের রূপকল্প বিভিন্নভাবে গঠিত হয়েছে, মিসরীয় শিল্পীদের হাতে একরকম, তুর্কি শিল্পীদের হাতে একরকম, স্পেনে আবার অন্য রকম, কিন্তু এ পরিবর্তনগুলো এসেছে আর্চ বা খিলানের নির্মাণ কৌশলের মধ্যে, স্তম্ভের অলঙ্করণ প্রক্রিয়ার মধ্যে ও গম্বুজের গঠনের মধ্যে। তুরস্কের মসজিদে উন্মুক্ত স্থান নগণ্য হলেও সেখানকার মসজিদ এত উঁচু যে, গম্বুজের আবরণ থাকা সত্ত্বেও মসজিদকে প্রায়ই উন্মুক্তই মনে হয়।
বিভিন্ন দেশে মুসলমান কারুকর্মীদের হাতে প্রতিদিনের ব্যবহার্য দ্রব্যও শিল্প গুণান্বিত হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে পড়ে কার্পেট, জায়নামাজ, তামা, মাটির পাত্র, বসার আসন ইত্যাদি। এ সব শিল্পের ক্ষেত্রে ডেকোরেটিভ পদ্ধতিটিই প্রবল, শিল্পীরা পুনরাবৃত্তির সাহায্যে রেখা, পাতা ও ফুলকে আকর্ষণীয় করেছেন।
ইসলামের শিল্পবৃত্তি অন্তরের প্রেরণায় অনুভূতির তাৎপর্যে বাইরের পৃথিবীতে দৃশ্যমানরূপে বিভিন্ন সৃজনশীলতায় চিহ্নিত হয়েছে। ইসলামের মসজিদ ও প্রাসাদ দৃষ্টিতে যখন পড়ে তখন মনে হয় এগুলো একটি জাতির যৌবনাবস্থার স্বাক্ষর। কোনোরূপ মানবীয় প্রবৃত্তি নয়, কিন্তু চিত্তের অনুভূতি ও মনোবৃত্তির শ্রী এবং সম্পদ এসব শিল্পে নির্দেশিত হয়েছে। আজো এর প্রভাব প্রবল এবং আজো নতুন নতুন রূপে এই শিল্প বিভিন্ন দেশে বিকাশ লাভ করছে।
**************************
সৈয়দ আলী আহসান
দৈনিক নয়া দিগন্ত