(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
সুবেহ সাদেক বা প্রকৃত প্রভাতের উদয়ের সাথে সাথে সেহরির সময় শেষ এবং ফজরের নামাজের সময় শুরু হয় এবং সুবেহ সাদেকের সূচনাকাল নির্ধারণের সম্পর্ক রয়েছে ফজরের (প্রভাত) আলোর প্রকৃতি ও বিস্তৃতির সাথে। অপর দিকে এশা নামাজের সময় ‘শাফাক’ অর্থাৎ সান্ধ্য আলোর অস্তের সাথে সম্পর্কিত। দিগন্তের ওপর সূর্যের আলোর অবস্থা সবসময় এবং সর্বত্র এক রকম থাকে না বিধায় বিকল্প হিসেবে তাকদিরের মাধ্যমে ফাজরে সাদেক বা প্রকৃত প্রভাতের উদয় ও শাফাক বা সান্ধ্য আলোর অস্ত যাওয়ার সময় নির্ধারণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

আল্লাহতায়ালা মানবজাতির জন্য ক্রমান্বয়ে স্বীয় বস্তু-বিজ্ঞানের ফটক খুলে দিতে থাকেন। মুসলমানরা প্রথমে বালু আর পানি দিয়ে সময় নির্ণয় করে। তারপর খলিফা হারুনুর রশীদের সময়কালে তারা ঘড়ি আবিষ্কার করে (ওয়াক্ত নামাজে এশাকে বারে মেঁ তাহকীক, পৃষ্ঠা-৪০) এবং নামাজের সময় জানার জন্য আকাশের দিকে তাকানো আর ছায়া মাপার পরিবর্তে ঘণ্টা ও মিনিটের সাহায্যে এর নির্ধারণ শুরু করে। এভাবে মুসলিম জাহানে এ পদ্ধতিতে নামাজের সময় নির্ণয় করা একটা সর্বজন স্বীকৃত স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়। এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপে ইসলামি শাসনের বিস্তৃতির সাথে সাথে মুসলিম বিজ্ঞানীরা শুধু ঘড়ি আবিষ্কার করে থেমে যাননি। তারা মুসলমানদের চাহিদা মোতাবেক অন্যান্য বস্তু-বিজ্ঞানের অনুরূপ সৌরবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও প্রভূত উন্নতি সাধন করেন এবং সৌরবিজ্ঞানের বিধিবিধান অনুসরণ করে নামাজের সময় নির্ধারণের নিয়ম-পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, বিশেষত ফজর ও এশা নামাজের সময় কখন শুরু হয় এ প্রশ্নে তারা যথেষ্ট পর্যবেক্ষণ-নিরীক্ষণ করেছেন। কেননা এ উভয় সময় সূর্য দিগন্তের নিচে থাকে। এ জন্য উভয় নামাজের সময় সম্পর্ক রয়েছে দিগন্তের ওপর সূর্যের আলোর দৃশ্য-প্রকৃতির সাথে। সৌরবিজ্ঞানের আলোকে নির্ধারিত সময়ের যথার্থতা প্রমাণিত হওয়ার পর ইসলামের ফেকাহবিদরা স্বীকার করে নেন যে, মুসলিম সৌরবিজ্ঞানীরা নামাজের যে সময়সূচি তৈরি করেন, শরিয়তের সময়ের সাথে তা সঙ্গগতিপূর্ণ। এ জন্য পরবর্তীকালের বিশেষজ্ঞ আলেমরা সৌর সময়কে নামাজের সময় জানার জন্য প্রধানতম ব্যবস্থা হিসাবে গণ্য করেছেন। যেমন আল্লামাহ আবদুর রহমান আল-জাযীরী আল-ফিকহ আলা আল-মাযাহিবিল আরবাআহ খণ্ড- ১-এর ১৮২ পৃষ্ঠায় এ পদ্ধতিকে সর্বোত্তম পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করেছেনঃ ‘নামাজের সময় পাঁচ পদ্ধতিতে জানা যায়। তন্মধ্যে প্রথম পদ্ধতি হচ্ছে, সৌরবিজ্ঞানের হিসাব, যা সঠিক হিসাবের পদ্ধতির ওপর ভিত্তিশীল। আজকাল এ পদ্ধতি প্রচুর গ্রামগঞ্জে ব্যবহৃত হয়। শরিয়তের সময় জানার জন্য এটা একটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। দ্বিতীয়ত, সূর্য হেলে যাওয়ার পরবর্তী দৃশ্যমান ছায়া, তদ্বারা জোহরের শেষ এবং আসরের সূচনার সময় জানা যায়। তৃতীয়ত, সূর্যাস্ত, তদ্বারা মাগরিবের সময় জানা যায়। চতুর্থত, শাফাকের অস্ত, মতবাদ নির্বিশেষে লালীমা কিংবা শুভ্রতা তদ্বারা এশার সময় জানা যায় এবং পঞ্চমত, ভোরের শুভ্রতা, তদ্বারা ফজরের সময় জানা যায়।’
 
শরিয়তে ইসলামের প্রবর্তক রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কুরআনে করিমের নির্দেশনা, রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও দিকনির্দেশনা, ইমাম ও মোজতাহেদীনে কেরাম এবং মুসলিম সৌরবিজ্ঞানীদের আবিষ্কার থেকে এ যাবৎ নামাজের সময় নির্ধারণের জন্য মোশাহাদাহ ও তাকদিরের যত সূত্র ও পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে সেসবের একটা সংক্ষিপ্ত চার্ট নিচে দেয়া হলোঃ
 
নামাজের সময় জানার পদ্ধতি প্রথমত দুই প্রকার। যথা­ মোশাহাদাহ বা প্রত্যক্ষকরণ ও তাকদির বা নির্ধারণ।
মোশাহাদাহ করার সময় চারটি। যথাঃ সূর্য হেলে যাওয়া। সূর্যাস্ত। সান্ধ্য আলোর অস্ত। প্রভাতি আলোর উদয়।
তাকদিরের পদ্ধতি দু’টি। যথাঃ সৌর হিসাব এবং তাহাররি বা চিন্তাভাবনা।

কুরআনে করিম ও হাদিস শরিফে এবং ইমাম মোজতাহেদীনে কেরাম কতৃêক নামাজের সময় নির্দেশক যেসব আলামত নির্দেশ করা হয়েছে সেগুলো মোশাহাদাহ করে নামাজের সময় নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। মাজহাবগুলোর ইমাম-মুজতাহেদীনে কেরাম স্বীয় গবেষণার আলোকে সেসব আলামত নির্দেশ করেছেন। ফলে নামাজের সময় নির্ধারণের আলামত সম্পর্কে তাদের সবার অভিমত এক ও অভিন্ন হয়নি। পরবর্তীকালে মুসলিম সৌরবিজ্ঞানীরাও দিগন্তের নিচে সূর্য কত ডিগ্রিতে পৌঁছলে স্বীয় মাজহাবে নির্দেশিত নামাজের সময়ের আলামতগুলো দৃশ্যমান হয় তা নির্দেশ করেছেন। ফলে তাদের নির্ধারিত ডিগ্রি এবং নির্দেশিত সময়কালও এক ও অভিন্ন হয়নি। তাই ফজর ও এশার নামাজের সময় কখন শুরু হয় এ প্রশ্নের সমাধানে পৌঁছতে হলে তার আগে বিভিন্ন মাজহাবের ইমাম সাহেবান ও মোজতাহেদীনে কেরামের মতবাদ, স্বীয় মতবাদের সমর্থনে তাদের দলিল ও যুক্তি প্রমাণ, তারপর তাদের অনুসরণ করে সৌরবিজ্ঞানী কর্তৃক প্রদত্ত সৌর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আলোচনা-পর্যালোচনা করা আবশ্যক। তাই বিষয়টি আলাদাভাবে তিনটি পর্যায়ে আলোচনা করব। প্রথমত, কুরআনে করিম ও হাদিস শরিফে এবং বিভিন্ন মাজহাবে নির্দেশিত নামাজের সময়ের আলামত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে থাকবে মুসলিম সৌরবিজ্ঞানী কর্তৃক নির্ধারিত স্বীয় মাজহাবে নির্দেশিত নামাজের সময়ের আলামত দৃশ্যমান হওয়ার সময় নির্দেশক দিগন্তের নিচে সূর্যের অবস্থানের ডিগ্রি সম্পর্কে আলোচনা। পৃথিবীর যেসব এলাকায় সাধারণত রাত হলেও প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে যথার্থ অর্থে রাত হয় না এবং শরিয়ত নির্দেশিত এশা ও ফজরের আলামতগুলো পাওয়া যায় না কিংবা ২৪ ঘণ্টায় রাত ও দিন উভয়টা পাওয়া যায় না, শুধু রাত অথবা শুধু দিন হয় তৃতীয় পর্যায়ে সেসব ধরনের এলাকায় নামাজের সময় নির্ধারণের জন্য তাকদিরের পদ্ধতি আলোচনা করা হবে।

**************************
ড. আবু যার মোহাম্মদ সাঈদ চৌধুরী
সাবেক পরিচালক, কেন্দ্রীয়
মসজিদ ও ইসলামিক
সেন্টার, গ্লাসগো, যুক্তরাজ্য
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৮ মার্চ ২০০৮