- Home
- ইতিহাস ও ঐতিহ্য
- ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় মসজিদ
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় মসজিদ
- By Article Poster
- Published 03/28/2008
- ইতিহাস ও ঐতিহ্য
- Unrated
জাকার্তা নগরীতে অবস্থিত ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় মসজিদের নাম ইসতিকলাল মসজিদ। ইসতিকলাল শব্দের অর্থ স্বাধীনতা। ইসতিকলাল মসজিদ মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম মাসজিদ। ইন্দোনেশিয়ানরা শাফেয়ি মাজহাবের সুন্নি মুসলিম।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইন্দোনেশিয়া ছিল ডাচ কলোনি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার আকাশে স্বাধীনতার লাল সূর্য উদয় হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধাবসানে শান্তিপূর্ণভাবে নয়, বরং বাংলাদেশের মতো রক্তাক্ত সংগ্রামের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট আহমাদ সুকর্নোর নেতৃত্বে রক্তের সাগর পাড়ি দিয়ে ইন্দোনেশিয়া স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতা লাভের ১০ বছর পর ১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় মসজিদ হিসেবে জাকার্তার ইসতিকলাল (স্বাধীনতা) মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধা- হয়।
ইসতিকলাল মসজিদের নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৫৫ সালেই। সম্পন্ন হয় ২৯ বছর পর ১৯৮৪ সালে।
নির্মাণ প্রারম্ভকালে মসজিদের জন্য অনুদানদাতাদের থেকে ঐচ্ছিক অনুদান গ্রহণ শুরু হয়। এজন্য ‘ইয়াছানো দানা বানতুয়ান’ নামে একটি জনকল্যাণমূলক সংস্থার মাধ্যমে ঐচ্ছিক দান সংগ্রহ করা হয়।
বাংলাদেশের মতো ইন্দোনেশিয়ার বহু অঞ্চল ঘনবসতিপূর্ণ। এর মধ্যে জাভা প্রদেশ এবং জাকার্তা নগরী অতি ঘনবসতিপূর্ণ। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা নগরীর বিহজা কুশিমা পার্ক ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় মসজিদ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হয়।
ইন্দোনেশিয়ার ইসতিকলাল (স্বাধীনতা) মসজিদের ভেতর-বাইরে যে কোন দিক থেকে তাকালেই মনে হয় যেন মসজিদটি একটি স্থাপত্য নিদর্শন। এর বিরাটত্ব, বহুতল নামাজের ঘর, মার্বেল, এলুমিনিয়াম এবং স্টিলের ব্যবহার- সবকিছু মিলে একটি সংহতি, গুরুত্ব, আভিজাত্য এবং জাঁকজমক প্রতিফলিত হয়।
মসজিদের ডিজাইন তৈরির জন্য আ-র্জাতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। নকশা প্রতিযোগিতায় প্রধান উপদেষ্টা স্থপতি নির্বাচিত হন ইন্দোনেশিয়ান স্থপতি এফ সিলাবান। স্থাপত্য নকশা প্রতিযোগিতায় উল্লেখ করা হয়, মসজিদ নির্মাণে এমন উপাদান বা দ্রব্যাদি ব্যবহার করা হবে- যা হবে শত শত বছর স্থায়ী, যতটুকু সম্ভব স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় এবং যা নির্মিত ভবন রক্ষণাবেক্ষণে ঝামেলামুক্ত। স্থাপত্য শিল্পীরা ছিলেন সবাই ইন্দোনেশিয়ান স্থপতি ও প্রকৌশলী। প্রখ্যাত স্থপতি এফ সিলাবান কিন্’ স্থাপত্য নীতিতে দেশীয় ইমেজ বা স্টাইল ব্যবহার না করে আধুনিক এবং আমদানিকৃত ধারণা ও দ্রব্যাদির ওপরই অধিকতর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। স্থপতি ছিলেন দুটি স্থাপত্য ধারা বা রীতি দ্বারা প্রভাবিত। প্রথমটি ছিল ওসমানিয়া তুর্কি স্থাপত্য রীতি। দ্বিতীয়টি রাশিয়া-চীনের আধুনিক স্থাপত্য ধারা।
স্বাধীনতার এক যুগের বেশি সময় ধরে ইন্দোনেশিয়ায় কমিউনিস্ট প্রভাব ছিল প্রচণ্ড। প্রেসিডেন্ট আহমদ সুকর্নো এ প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন না। ইন্দোনেশিয়ার বহু ইমারত নির্মাণে সোভিয়েত সহযোগিতার জন্য প্রেসিডেন্ট আহমদ সুকর্নো আ-রিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
ইসতিকলাল মসজিদের বাইরের দেয়াল এমনভাবে ত্রিকোণাকৃতি করা হয়েছে, যাতে আলো সহজে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। প্রধান হলটিতে পর্যাপ্ত স্বাভাবিক এবং কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা আছে। অতীতের মসজিদগুলো ছিল পোড়া ইটের দেয়ালে তৈরি। কিন্’ ইসতিকলাল মসজিদের দেয়াল নির্মাণে কনক্রিট এবং স্টিলের ব্যবহার অতি ব্যাপক। এতে রয়েছে আধুনিকতার ছাপ। মসজিদের অভ্য-রে ফিনিশিংয়ের উপাদান হল স্টিল, মার্বেল, সিরামিক ও টাইলস। পলিশ এত উচ্চমানের যে আলো প্রতিফলিত হয়। ইসতিকলাল মসজিদটি ৭ তলা বিশিষ্ট। প্রবেশপথের গম্বুজ এলাকার সঙ্গে রয়েছে প্রাঙ্গণের বহিস্থ দেয়াল এবং তা (অৎ-পধফব) আরবের ধনুকাকৃতি ছাদ ও পথশোভিত। কোথাও কোথাও কাটা গম্বুজের আকারবিশিষ্ট।
মসজিদের চারকোনায় রয়েছে সিঁড়ি, যা থেকে প্রতিটি তলায় ওঠা যায়। এই বিরাট মসজিদে কোন অৎপয বা ধনুকাকৃতির খিলানের প্রাচুর্য নেই। আর নেই আয়তনের তুলনায় দীর্ঘ তোরণশোভিত পথ।
মসজিদে অতি প্রকাণ্ড বেইজমেন্ট এরিয়া রয়েছে। সব অফিস, দফতর, মুসল্লিদের ওজুর সুযোগ-সুবিধা, স্যানিটারি ও বৈদ্যুতিক অবকাঠামো বেইজমেন্টে করা হয়েছে।
ইসতেকলাল মসজিদটির প্রধান নামাজের হল (স্থান) ৩,৯৮,০০০ বর্গফুট (৩৬,৯৮০ বর্গমিটার)। মসজিদের অভ্য-রে ১ লাখের বেশি মুসল্লি একসঙ্গে সালাত আদায় করতে পারেন।
মসজিদের বাইরের সাহান বা উঠান এরিয়া ৩,১২,০০০ বর্গফুট (২৯,০০০ বর্গমিটার)। সাহান বা প্রাঙ্গণটি দুই ভাগে বিভক্ত। দুই ঈদের জামাতের সময় সাহান বা প্রাঙ্গণ বিশেষভাবে ব্যবহার হয়।
মসজিদের অন্যতম প্রধান সৌন্দর্য এবং বিশেষত্ব গম্বুজে এবং মিনারে। ইসতিকলাল মসজিদের একাধিক গম্বুজ আছে। মসজিদে প্রবেশপথের গম্বুজওয়ালা হলটি ৫৩,৮০০ বর্গফুট (৫,০০০ বর্গমিটার)। প্রবেশপথে ছাতার মতো একটি গম্বুজ বহুতলব্যাপী। প্রবেশপথের গম্বুজ এলাকা হয়েও মসজিদের বিভিন্ন তলায় প্রবেশ করা যায়। মধ্যস্থানে আছে নামাজের হলের মধ্যে বিরাট মধ্যবর্তী গম্বুজ। মসজিদের মধ্যবর্তী নামাজের জায়গাটি পাঁচতলা এবং এটি সমবাহু চতুর্ভুজ আকৃতি। প্রধান গম্বুজ এলাকাটির দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ ৪৫ মিটার - ৪৫ মিটার (১৪৭)। প্রধান গম্বুজটি সার্কেল বা গোলাকৃতি এবং ১২টি ঋষঁঃবফ স্টিল কলামের ওপর স্থাপিত।
মসজিদের বিভিন্ন অংশে আলোচনা, বক্তৃতা, প্রদর্শনী, সম্মেলন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা আছে। মসজিদ এলাকার একটি অংশে ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানি দেয়া এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। বৃহৎ মহানগরীতে কোরবানি দেয়ার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এই জাতীয় মসজিদে আছে কোরবানি দেয়ার মতো আধুনিক এবং স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা। মাসজিদের পার্কিং এরিয়ায় একসঙ্গে ৮০০ গাড়ি রাখা যায়। মসজিদে রয়েছে অতি উচ্চ সুদর্শন একটি মিনার। আশপাশে রয়েছে প্রশ- উদ্যান। মসজিদের মিনারটি অতি উঁচু ও সরু। অনেকের দৃষ্টিতে অনেকটা তুর্কি পেন্সিলের মতো মনে হয় এ মিনার। বৃহৎ জাকার্তা নগরীর উচ্চতম স্তম্ভ বা মিনার এটি।
ভারত উপমহাদেশের মসজিদের বি-ার বা দৈর্ঘ্য সাধারণত উত্তর-দক্ষিণে। কিন্’ ইন্দোনেশিয়ার মসজিদের দৈর্ঘ্য হল পূর্ব-পশ্চিমে। প্রবেশ ফটক থেকে অনেকটা পথ অতিক্রম করে মসজিদের সম্মুখ সারিতে আসতে হয়। উদ্দেশ্য হল মেহবারের দিকে চলতে চলতে যেন স্বাভাবিকভাবেই মুসল্লিদের মন মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে অবনত হয়ে আসে।
**************************
এ জে ড এম শা ম সু ল আ ল ম
যুগান্তর, ২৮ মার্চ ২০০৮