প্রিয় নবী হজরত রাসূলে করিম সাঃ যে অনিন্দ্যসুন্দর আদর্শ পেশ করেছেন, তা যেমন চিরস্মরণীয়, তেমনি চিরঅনুকরণীয়। পবিত্র কুরআনে তাঁর মহান আদর্শকে ‘উস্‌ওয়াতুন হাসানা’ বা উত্তম নমুনা বলা হয়েছে। তাঁর পবিত্র জীবনের প্রতিটি ঘটনা ছোট হোক কি বড়, ব্যক্তিজীবনের হোক কি সমাজ ও জাতীয় জীবনের সবই সংরক্ষিত রয়েছে। এমনকি তাঁর জীবনের প্রতিটি কথা কণ্ঠস্থ করা হয়েছে। অগণিত সাধক তাঁর মহান বাণীর প্রচার-প্রসারে জীবন উৎসর্গ করেছেন। কেননা তাঁর প্রতিটি কথা ও কাজ সমগ্র মানবজাতির জন্য একমাত্র অনুসরণীয় আদর্শ। তাই বলছিলাম, পরিশুদ্ধ জীবন গঠনে মহানবী সাঃ-এর সুন্নাহ বা মহান আদর্শের অনুকরণ ছাড়া গত্যন্তর নেই।

যে কথা এখানে বিশেষভাবে প্রাণিধানযোগ্য তা হলো, যিনি সর্বকালীন মানুষকে সর্বাধিক প্রভাবিত করেছেন, যার পবিত্র নাম আকাশে-বাতাসে সর্বদা ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যাঁর পূতঃপবিত্র জীবনাদর্শ সম্পর্কে সর্বাধিক আলোচনা এবং গবেষণা হচ্ছে, তিনিই আমাদের প্রিয় নবী সাঃ। তাঁর প্রতিটি কথাকে আল্লাহতায়ালা তাঁর নিজের কথা বলে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে­ তিনি নিজের ভাবাবেগে কোনো কথা বলেন না, তাঁর কথা ওহি ছাড়া আর কিছুই নয়’। (সূরাঃ নাজম)

এ বৈশিষ্ট্য একমাত্র তাঁরই। সর্ব যুগের মানুষের জন্য তিনিই একমাত্র আদর্শ। ইমাম বুখারি রাঃ আদাবুল মুফরাদে, নাসায়ি, ইবনুল মুনযের, হাকিম, ইবনে মরদুবিয়া, বায়হাকি প্রমুখ ইয়াযিদ ইবনে বারনুসের বর্ণিত হাদিস সঙ্কলন করেছেন। তিনি বর্ণনা করেছেনঃ আমরা হজরত আয়েশা সিদ্দীকাহ রাঃ-এর কাছে জিজ্ঞাসা করলাম, হজরত রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান পূতঃপবিত্র চরিত্রমাধুর্যের বর্ণনা দিন। তিনি বললেন, তাঁর চরিত্রমাধুর্য হলো কুরআনে করিম। এরপর তিনি বললেন, তোমরা কি সূরা মু’মিনুন পাঠ করো? এরপর তিনি এ সূরার প্রথম ১০টি আয়াত তিলাওয়াত করলেন। এরপর বললেন, এ ছিল প্রিয় নবী সাঃ-এর চরিত্রমাধুর্যের বৈশিষ্ট্য।

হজরত রাসূলে করিম সাঃ ছিলেন অত্যন্ত সহনশীল, অধিক লজ্জাশীলতার দরুন তিনি পূর্ণদৃষ্টিতে কারো চেহারার দিকে তাকাতে পারতেন না। সর্বদা বাহুল্য কথা পরিহার করতেন, মানুষের মন রক্ষা করতেন এবং কোনো প্রকার শ্রেণিভেদ করতেন না। কারো সাথে হাসিমুখে মিশতে এতটুকু কার্পণ্য করতেন না। তাঁর সুমহান চরিত্রমাধুর্য সর্বদা বিনয়, আন্তরিকতা এবং সন্তুষ্টি পরিলক্ষিত হতো, সমগ্র বিশ্বের সর্বত্র তিনি নন্দিত, সর্বাধিক প্রশংসিত। শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবাই তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ, আল্লাহ পাকের পবিত্র নামের পরই যে নামটি উচ্চারিত হয় তা হলো হজরত রাসূলে করিম সাঃ-এর মুবারক নাম। তিনি আল্লাহপাকের একমাত্র কামিল বান্দা, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব এবং গুণ মহিমার তুলনা তিনি নিজেই।

হজরত রাসূলে করিম সাঃ শুধু মানুষের জন্য নন, বরং জীব-জন্তুর জন্যও রহমতস্বরূপ আগমন করেছেন। কখনো এমন হয়েছে, তিনি বিড়ালের সম্মুখে খাবারের পাত্র (দুধ অথবা অন্য কিছু) তুলে ধরেছেন, এটি চলে না যাওয়া পর্যন্ত তিনি পাত্র সরিয়ে ফেলেননি।

সাহাবায়ে কেরামের সাথে হজরত রাসূলে করিম সাঃ প্রসন্নচিত্তে মিলিত হতেন। যখন কোনো মজলিসে রাসূলুল্লাহ সাঃ তশরিফ নিয়ে যেতেন, তখন যে স্থানে লোকদের আসন শেষ হতো, সে স্থানেই বসে পড়তেন। বিশেষ কোনো আসন নির্দিষ্ট ছিল না, যেখানে অকারণে আসন গ্রহণ করতেন, অথবা কাউকে তার অবস্থান থেকে তুলে দেয়াও রীতিবিরুদ্ধ ছিল এবং অন্যদের এভাবে স্থান নির্দিষ্ট করতেও তিনি নিষেধ করতেন। তার মজলিসে উচ্চস্বরে কথা বলা রুচিশীল আচরণের পরিপন্থী মনে করা হতো। ভদ্রতা, নম্রতা, লজ্জা ও সহনশীলতা এবং আমানতদারিতে পূর্ণ ছিল নবী করিম সাঃ-এর মজলিস। নবী করিম সাঃ যখন কোনো বক্তব্য রাখতেন, তখন সাহাবায়ে কেরাম রাঃ এমন অবনত মস্তকে উপবিষ্ট থাকতেন, যেন তাদের শিরদেশে কোনো পক্ষী উপবিষ্ট রয়েছে। হজরত রাসূলে করিম সাঃ-এর যেকোনো নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ, কে কার আগে হুকুম তামিল করবেন, তার প্রয়াস লক্ষ করা যেত। কোনো কারণবশত সাহাবায়ে কেরামের কেউ অনুপস্থিত থাকলে রাসূলুল্লাহ্‌ সাঃ তার খোঁজখবর নিতেন। অসুস্থ হয়ে পড়লে দেখতে যেতেন। যদি কোনো সন্ধান পাওয়া না যেত, তবে তার ফিরে আসার জন্য দোয়া করতেন। কারো মৃত্যু হলে তার জন্য ইস্তিগফার করতেন। যদি কেউ মনক্ষুণ্ন হতেন, তবে হুজুর সাঃ স্বয়ং তার গৃহে তশরিফ নিতে যেতেন।

মজলিসে উপবিষ্ট সবার প্রতি নবী সাঃ সমানভাবে দৃষ্টিপাত ও সম্বোধন করে নসিহত করতেন। সবাই উপলব্ধি করতেন যে, তিনি তার প্রতিই সর্বাধিক মনোযোগী হয়েছেন। হুজুর সাঃ-এর খেদমতে আগত কোনো ব্যক্তি নিজে থেকে বিদায় না নিলে নবী সাঃ তার কাছ থেকে পৃথক হওয়ার প্রয়োজন বোধ করতেন না। কেউ মুসাফা করলে নবী সাঃ কখনো আগে নিজের হাত সরিয়ে নিতেন না। তিনি কখনো কারো নিন্দা করতেন না, কাউকে লজ্জা দিতেন না এবং কারো দোষত্রুটি বর্ণনা করতেন না। অধিকাংশ সময় নীরবতা অবলম্বন করতেন। এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর ধ্বংস এবং চিরস্থায়ী আখিরাত সম্পর্কে চিন্তাভাবনায় গভীরভাবে নিমগ্ন থাকতেন। তার কথা খুবই সারগর্ভ হতো, অতিরঞ্জনের তো প্রশ্নই ওঠে না। নেয়ামত সামান্য হলেও তার সম্মান করতেন, কখনো কোনো খাদ্যদ্রব্যের নিন্দা করতেন না, প্রতিবেশীর খোঁজখবর নিতেন, সর্বপ্রকারে মেহমানের হক আদায় করতেন।

রাসূলে আকরাম সাঃ-এর দরবারে মানুষকে তার দরিদ্র্যের কারণে যেমন তুচ্ছ জ্ঞান করা হতো না, তেমনি কাউকে তার প্রভাব-প্রতিপত্তির জন্য সম্মানী এবং শ্রদ্ধাভাজন মনে করারও কোনো কারণ ছিল না। যদি কেউ সীমালঙ্ঘন করত তখন নিষেধ করে দিতেন অথবা মজলিস থেকে চলে যেতেন।

সব মানুষ হজরত রাসূলে করিম সাঃ-এর কাছে ছিলেন সমমর্যাদার অধিকারী, তবে তাক্‌ওয়ার ভিত্তিতে মুত্তাকিরা সন্ধান লাভ করতেন।

কখনো কখনো সাহাবায়ে কিরামের বাগ-বাগিচাগুলোতে তিনি আগমন করতেন। কোনো সাহাবি তাঁকে দাওয়াত করলে তিনি তাঁর দাওয়াত কবুল করতেন। নবী সাঃ কঠোর ছিলেন না, আর তাঁর আচরণও রূঢ় ছিল না। কারো কোনো অশোভন মন্তব্য যা তাঁর অপছন্দনীয় হতো, তা যেন তিনি শুনেও শুনতেন না, অর্থাৎ এ জন্য সে ব্যক্তিকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করতেন না, বরং নীরবতা অবলম্বন করতেন, কেউ কোনো ব্যাপারে ওজর পেশ করলে তিনি তা গ্রহণ করতেন।

পথ চলার সময় নবী সাঃ অপেক্ষাকৃত দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন, যেন কোনো উঁচু স্থান থেকে নিচে অবতরণ করছেন। সঙ্গীদের সম্মুখে রেখে হুজুর সাঃ স্বয়ং পেছনে চলতেন এবং ইরশাদ করতেন, আমার পশ্চাৎভাগ ফেরেশতাদের জন্য উন্মুক্ত রাখো। পথিমধ্যে কারো সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি প্রথমেই তাকে সালাম করতেন।

নবী সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লামের যে ক’জন গোলাম-বাঁদি ছিল, খাওয়া-পরা ও আনুষঙ্গিক ব্যাপারে তিনি তাদের সাথে নিজের কোনো ব্যবধান রাখতেন না, বরং নিজে যা পোশাক পরিধান করতেন, তাদের জন্যও ছিল ঠিক তাই, এতে কোনো পার্থক্য ছিল না।

হজরত আনাস ইবন মালিক রাঃ, যিনি ১০ বছর হুজুর সাল্লাল্লাহআলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সান্নিধ্যে অতিবাহিত করেছেন, তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে­ আমি তাঁর যে খেদমত করেছি, তার চেয়ে বেশি তিনি আমার খেদমত করেছেন। আমার কোনো ত্রুটিবিচ্যুতির জন্য তিনি বিরক্তবোধ করেননি। তাঁর নির্দেশের পরিপন্থী কিছু করলে তিনি বলেননি, ‘এটা কেন করলে’? অথবা কোনো কাজ তাঁর ইচ্ছানুযায়ী না করলেও তিনি বলেননি, ‘এটি কেন করলে না’।

হজরত আয়েশা রাঃ বর্ণনা করেন, হজরত রাসূলুল্লাহ সাঃ আল্লাহর রাহে জিহাদ ছাড়া নিজের দস্তে মোবারক দ্বারা কাউকে কখনো প্রহার করেননি। কোনো খাদেমকেও নয়, কোনো স্ত্রীকেও নয়। তিনি কখনো কারো কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে কেউ যদি আল্লাহপাকের বিধান অমান্য করত, তবে আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাকে শাস্তি দেয়া হতো। (মুসলিম শরিফ)

হজরত রাসূলে করিম সাঃ তাঁর সাহাবায়ে কেরামদের সাথে বিভিন্ন কাজকর্মে সমানভাবে অংশগ্রহণ করতেন। একবার এক সফরে নবী সাঃ তাঁর সাহাবায়ে কেরামকে বকরির গোশত রান্না করার জন্য বললেন। এ জন্য সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কেউবা জবাইয়ের দায়িত্ব নিলেন, কেউ গোশত পরিষ্কার করে রান্নার উপযোগী করতে চাইলেন আর রান্নার দায়িত্বও এভাবে একজন সাহাবি নিয়ে নিলেন। হজরত রাসূল সাঃ তখন ইরশাদ করলেনঃ আমি লাকড়ি সংগ্রহ করতে যাচ্ছি। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার পরিবর্তে আমরাই এ কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছি। ইরশাদ করেনঃ তোমরা আমার পরিবর্তে এসব কাজ সম্পন্ন করতে পারবে, কিন্তু তোমাদের মাঝে নিজেকে বিশিষ্ট করে তোলা আমার পছন্দ নয়; আর আল্লাহপাকও তাঁর এমন বান্দাকে পছন্দ করেন না। অতঃপর তিনি তশরিফ নিয়ে গেলেন এবং লাকড়ি সংগ্রহ করলেন।

অন্য একদিনের ঘটনা। হুজুর সাঃ সফরের অবস্থায় নামাজের জন্য প্রস্তুত হয়েছেন, কিন্তু আবার পেছনের দিকে ফিরে গেলেন। তখন সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কেউ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কোথায় তশরিফ নিয়ে গিয়েছিলেন? হুজুর সাঃ ইরশাদ করলেনঃ স্বীয় উটের পা বাঁধার জন্য। আরজ করা হলো, (আপনি কেন কষ্ট করলেন উট বাঁধার জন্য) এ কাজ তো আমরাই করতে পারতাম। তিনি ইরশাদ করলেনঃ কোনো কাজে কারো সাহায্য (যতক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব) না নেয়াই উচিত, হোক না তা মেসওয়াক কাটা।

হজরত রাসূল সাঃ-এর পূতঃপবিত্র জীবনের বিভিন্ন দিক এবং ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে দেখা যাবে, আপন শ্রষ্টা ও পালনকর্তা আল্লাহপাকের সন্তুষ্টিই মুখ্য, অন্য সব কিছুই গৌণ। দু’টি বিষয়ের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেয়ার ইখতিয়ার থাকলে তিনি সর্বদা যা সহজে করা যায়, সেটিই বেছে নিতেন।

হজরত রাসূলে করিম সাঃ দীন ইসলামের প্রচারে-প্রতিষ্ঠায় যে অক্লান্ত সাধনা এবং ত্যাগ-তিতিক্ষার পরিচয় দিয়েছেন, কাফেরদের অকথ্য নির্যাতনের মুখেও যেভাবে ধৈর্য ও সহনশীলতায় অটল অবিচল থেকেছেন, সবরের ইতিহাসে এর দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। তিনি ইরশাদ করেছেনঃ আমাকে লা’নতকারী রূপে প্রেরণ করা হয়নি, শুধু রহমত রূপেই প্রেরণ করা হয়েছে।
প্রিয় নবী সাঃ আরো ইরশাদ করেছেনঃ আল্লাহ্‌র রাহে আমাকে এত কষ্ট দেয়া হয়েছে, যা অন্য কোনো নবীকে দেয়া হয়নি। স্বয়ং আল্লাহপাক প্রিয় নবী সাঃ-এর এই অপরিসীম আত্মত্যাগের প্রশংসায় পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেনঃ

‘(হে রাসূল!) আর নিশ্চয় আপনার জন্য এমন বিনিময় রয়েছে, যা কখনো নিঃশেষিত হবে না, আর নিশ্চয় আপনি চরিত্রমাধুর্যের উচ্চতম স্তরে রয়েছেন।’

হজরত রাসূলে করিম সাঃ-কে আল্লাহতায়ালা তাঁর নৈকট্য ও সান্নিধ্যের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেছেন। পবিত্র শবে মি’রাজে আল্লাহপাক প্রিয় নবী সাঃকে তাঁর দীদার নসিব করেছেন। সমগ্র মানবজাতির মধ্যে এ বৈশিষ্ট্য একমাত্র তাঁরই। কিন্তু তবু হজরত রাসূল সাঃ প্রতিদিন ৭০ মতান্তরে একশতবার দরবারে ইলাহিতে ইস্তিগফার করতেন, অথচ আল্লাহপাক তাঁর পূর্বাপর সবকিছুই মাফ করে দিয়েছেন।

ঐতিহাসিক মক্কা বিজয় অর্জিত হয়েছে। আল্লাহপাক মুসলমানদের সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছেন। হজরত রাসূলে করিম সাল্লালাহুআলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে ১০ হাজার সাহাবায়ে কিরামের সাঁজোয়া বহর মক্কা মোয়াজ্জমায় প্রবেশ করেছে, কিন্তু বিজয়ের নামে কেউ কোনো উচ্ছৃঙ্খলতা দেখায়নি, পরাজিত শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করারও কোনো আয়োজন নেই। কাফেররা যখন তাদের অনিবার্য পরিণতির কথা ভেবে ব্যাকুল হয়েছে, তখন হজরত রাসূলে করিম সাঃ মক্কাবাসীকে সম্বোধন করে ইরশাদ করেছেনঃ ‘হে মক্কাবাসী! তোমাদের কী ধারণা, আমি তোমাদের সাথে কী ব্যবহার করব? লোকেরা জবাব দিলো, আপনি দয়াবান এবং দয়াবান ভাইয়ের পুত্র (এ জন্য আপনি আমাদের প্রতি দয়াই করবেন)’। তখন প্রিয় নবী সাঃ ঘোষণা করলেনঃ

‘আজ তোমরা মুক্ত, তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। কোনো তিরস্কার নেই, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন, তিনি সর্বশেষ্ঠ দয়াবান।’

হজরত রাসূলে করিম সাঃ রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ ছিলেন, পানাহারের প্রয়োজন থেকে তিনিও মুক্ত ছিলেন না। অতি স্বাভাবিকভাবেই হজরত রাসূল সাঃ-এর পবিত্র নয়নযুগল নিদ্রিত হলেও তাঁর অন্তর থাকত জাগ্রত, ওহির প্রতীক্ষায় উন্মুখ, এই অন্তর জিকরে ইলাহি থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হতো না। নিদ্রা অজু ভঙ্গের কারণ হিসেবে স্বীকৃত হলেও হুজুর সাল্লালাহুআলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য ছিল না। হজরত আয়েশা রাঃ হুজুর সম্পর্কে বলেছেনঃ

‘হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বক্ষণ আল্লাহপাকের স্মরণে তন্ময় থাকতেন।’
অভিশপ্ত শয়তান পৃথিবীর সবকিছুর আকৃতিধারণ করতে পারে, কিন্তু হুজুর সাল্লালাহুআলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষেত্রে সে অপারগ। কেননা তিনি হেদায়েতের উৎস। অতএব, পরিশুদ্ধ ও পবিত্র জীবন গঠনে প্রিয় নবী সাল্লালাহুআলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান আদর্শের অনুসরণ একান্ত কর্তব্য।
মহান আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন!

**************************
মাওলানা মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ৪ এপ্রিল ২০০৮