Islamic Article Archive - http://articles.ourislam.org
এক নজরে বিশ্বনবী সাঃ-এর জীবনযাপন
http://articles.ourislam.org/articles/129/1/aa-aaaa-aaaaaaaa-aaa-aa-aaaaaaaa/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 04/9/2008
 
মানুষকে সৎপথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ প্রত্যেক জাতির কাছে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁরা মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছাতেন । আল্লাহ বলেছেন, ‘এমন কোনো জনপদ নেই যেখানে আমি নবী-রাসূল প্রেরণ করিনি।’ প্রত্যেক নবী-রাসূল মানুষকে আল্লাহর পথে চলার জন্য, সৎপথে চলার জন্য বলতেন। তাঁদের জীবন ছিল সবার অনুকরণীয়। আমাদের মহানবী সাঃ-এর জীবনও অনুকরণীয়।

এক নজরে বিশ্বনবী সাঃ-এর জীবনযাপন

মানুষকে সৎপথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ প্রত্যেক জাতির কাছে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁরা মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছাতেন । আল্লাহ বলেছেন, ‘এমন কোনো জনপদ নেই যেখানে আমি নবী-রাসূল প্রেরণ করিনি।’ প্রত্যেক নবী-রাসূল মানুষকে আল্লাহর পথে চলার জন্য, সৎপথে চলার জন্য বলতেন। তাঁদের জীবন ছিল সবার অনুকরণীয়। আমাদের মহানবী সাঃ-এর জীবনও অনুকরণীয়।

তিনি দেখতে কেমন ছিলেন, কী খেতে পছন্দ করতেন, কী রকম পোশাক পরতেন, মানুষের সাথে কী রকম ব্যবহার করতেন, তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতি কেমন ছিল­ এসব খুঁটিনাটি বিষয় সাহাবিরা বিস্তারিত লিখে গেছেন। সেখান থেকে সংক্ষিপ্তাকারে কিছু উদ্ধৃত করা হলোঃ
তিনি খুব লম্বা ছিলেন না, বেঁটেও ছিলেন না। গায়ের রঙ বেশি সাদা ছিল না, শ্যামলাও ছিল না। তবে বেশ উজ্জ্বল ও কমনীয় ছিল। যে দেখত সে-ই অভিভূত হয়ে পড়ত। তাঁর সিনা ছিল বেশ চওড়া। শরীরে ছিল স্বাস্থ্যের জৌলুশ, দেহাবয়ব বেশ মাংসল, পুরু। শরীরে বেশি লোম ছিল না। চুল মসৃণ ও ঘন। মাথা মুড়াতেন না, ঘন ঘন চুল কাটাতেন না। বাবড়ি চুল কানের কাছে ঝুলত। মাথায় তেল দিতেন যথেষ্ট। বারবার চুল আঁচড়াতেন। ওফাতের সময় কানের কাছে কয়েকগাছি চুল পেকেছিল। চোখে সুরমা দিতেন। শরীর থেকে সবসময় মিষ্টি সুগন্ধ বের হতো। তিনি সুগন্ধিদ্রব্য ব্যবহার পছন্দ করতেন। বেশি বেশি দাঁত মাজতেন।

তাঁর পছন্দের পোশাক ছিল লম্বা জোব্বা বা কোর্তা। বুটিদার চাদর, লুঙ্গি, কম্বল, হুললা (একধরনের লাল জোড়া মূল্যবান পোশাক), পাজামা, পাগড়ি, টুপি, চপ্পল ও মোজা। সাদা ও লাল রঙয়ের লুঙ্গি পরতেন। লুঙ্গি ছিল সাড়ে চার হাত লম্বা ও দুই হাত চওড়া। পাগড়ি সবুজ ও কালো। মোজা কালো। মোজা ভালো করে ঝেড়ে পরতেন। কাপড়-চোপড়ও ভালো করে ঝেড়ে পরতেন।

তাঁর প্রিয় খাবার ছিল রুটি, গোশত, সবজি, খেজুর, মধু, শসা, তরমুজ, লাউ, ঘি, পনির, দুধ, মিষ্টি, হালুয়া, হারস, সাবিদ, নবিস ও ছাতু। তিনি দাঁড়িয়ে বা ডাইনিং টেবিলে বসে আহার করতেন না। তিনি মাটিতে বিছানা পেতে খেতেন। খেতে বসার সময় ডান ঊরু খাড়া করে এবং বাম ঊরু বিছানায় পেতে বসতেন। ডান হাতে আহার করতেন। বামহাতে গ্লাস ধরলে গ্লাসের নিচে ডান হাতের পিঠ ঠেকাতেন। পানি ভর্তি গ্লাসের ওপরে হাত দেয়াকে মাকরুহ বলতেন। এক গ্লাস পানি তিনবার করে পান করতেন। প্রত্যেকবার শুরুতে বিসমিল্লাহ ও শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলতেন।

খাবারের ব্যাপারে তিনি স্বাস্থ্যনীতি পুরোপুরি মেনে চলতে উপদেশ দিতেন। বাসি খাবার খেতে নিষেধ করতেন। খাওয়ার সময় তিন ভাগের এক ভাগ খাবার, এক ভাগ পানি এবং বাকি এক ভাগ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখতে বলতেন। তিনি বলতেন এভাবে আহার করলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। তিনি বেশি গরম খাবার খেতেন না। খাবার ঠান্ডা করেই খেতেন। তিনি কাঁচা পেঁয়াজ খেতে পছন্দ করতেন না ।

তিনি কখনো কখনো ডান হাতের আঙুলে রুপার আংটি পরতেন। তাতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ মোহর করা ছিল। দেশ-বিদেশের চিঠিতে এই মোহর ব্যবহার করতেন। তাঁর তলোয়ারের নাম ছিল জুলফিকার। এর হাতল ছিল রুপার।

তিনি হাঁটার সময় সামনের দিকে একটু ঝুঁকে হাঁটতেন, মনে হতো উপর থেকে নিচের দিকে নামছেন। তাঁর বাহন ছিল সাদা উট, নাম কাসোয়া।

তিনি বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় খুব স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলতেন। মজলিসে উপস্থিত সবাই তাঁর কথা সমানভাবে শুনতে ও বুঝতে পারতেন। তিনি খুব উচ্চস্বরে কথা বলতেন না। আবার স্বর খুব নিচুও ছিল না। তাঁর কণ্ঠস্বর খুব মিষ্টি ছিল। মজলিসে বসার জন্য তাঁর কোনো আলাদা ব্যবস্থা ছিল না। তিনি সবার সাথেই বসতেন।

তিনি আগেই সালাম দিতেন, কেউ তাঁকে আগে সালাম দিতে পারত না। সাক্ষাৎকারীর কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি মাঝখানে কোনো কথা বলতেন না। করমর্দনকারী হাত না ছাড়া পর্যন্ত নিজের হাত সরাতেন না। কেউ কানে কানে কথা বললে কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কান সরাতেন না।

তিনি কাউকে গালমন্দ করতেন না। চাকর-বাকরকে এ কাজটি কেন করোনি অথবা এ কাজটি কেন করলে­ এ কথাও বলতেন না। তাদের সাথে বসেই তিনি খাওয়া-দাওয়া করতেন। তাদের জন্য আলাদা খাবারের ব্যবস্থা ছিল না। তিনি কখনো চাকর-বাকর দূরে থাক কোনো পশু-পাখিকেও পর্যন্ত প্রহার করেননি।

শ্রমিক-মজুরের ন্যায্য পাওনা পরিশোধের জন্য তিনি কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলতেনঃ শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগে তার ন্যায্য পাওনা মিটিয়ে দাও। আর ব্যবসায় অসততাকে তিনি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করতেন। এ ধরনের ব্যবসায়ী তাঁর উম্মত নয় বলতেন।

কেউ খারাপ কাজ করলে নাম উচ্চারণ না করে বলতেন, আজকাল মানুষের কী হয়েছে, তারা এমন কথা কেন বলে বা কেন এমন কাজ করে? তিনি উচ্চেঃস্বরে হাসতেন না, হাসার সময় মুচকি হাসতেন, কখনো দাঁত দেখা যেত না। তাঁর মুখে সবসময় হাসি লেগে থাকত।

তিনি শিশুদের খুব পছন্দ করতেন। সময় পেলেই তাদের সাথে খেলতেন। তাদের আবদার পূরণ করতেন। তিনি বলতেন, শিশুরা বেহেশতের প্রজাপতি। শিশুরাও তাঁকে খুব পছন্দ করত।

তিনি নিয়মিত ব্যায়াম করতেন, নির্দোষ খেলা, ঘোড়দৌঁড়, কুস্তি ও তীর নিক্ষেপ চর্চার জন্য উপদেশ দিতেন।

তিনি রোগীকে দেখাশোনার ব্যাপারে প্রতিদিন সাহাবিদের জিজ্ঞেস করতেন। তিনি প্রথমেই জিজ্ঞেস করতেনঃ কে আজকে কোন রোগীকে দেখতে গেছ? তিনি বলতেন রোগীকে দেখতে গেলে­ ১. তার কাছ থেকে দোয়া চাইবে। ২. তার কাছে স্বল্পসময় থাকবে এবং মিষ্টি কথা বলবে। ৩. রোগীর শান্তি কামনা করবে এবং সাহস জোগাবে। ৪. রোগীর ইচ্ছানুযায়ী খেতে দেবে। ৫. রোগীর রোগমুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে মোনাজাত করবে। ৬. কলেরা-বসন্তের মতো মহামারী হলে স্থানীয় কেউ ভয়ে পালাবে না এবং চিকিৎসক ছাড়া বাইরের কেউ সে এলাকায় যাবে না ।

তিনি কোনোদিন কোনো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হননি। তিনি চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে পাঁচটি পরামর্শ দিতেন­

১. হাজামত বা রক্তমোক্ষণ (দূষিত রক্ত বের করে ফেলা)।
২. লোদুদ­ মুখ দিয়ে ওষুধ সেবন।
৩. সাউত­ নাক দিয়ে ঘ্রাণ নেয়া।
৪. মাসাই­ পেটের জন্য ওষুধ ব্যবহার এবং
৫. লোহা পুড়িয়ে ছ্যাঁক দেয়া (আকুপাংচার)।

তবে ৫ নম্বর পদ্ধতি পারতপক্ষে না করতে বলেছেন। তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতিকে বলা হয় তিব্বুন নবী।

তিনি বলতেন, এমন কোনো রোগ নেই যার ওষুধ আল্লাহ দেননি। তিনি ওষুধ হিসেবে মধু, কালোজিরা, কুস্তা, উদহিন্দি, মেহেদি, খেঁজুর, জলপাই ও জলপাই তেল, সামা, মাক্কি, কুমাত (একপ্রকার গাছ), মান্না, ব্যাঙের ছাতা, মুসাব্বর, এন্টেমনি, পোড়া মাদুরের ছাই, নবিস ও উটের দুধ ব্যবহারের উপদেশ দিয়েছেন। কালোজিরা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, মৃত্যুরোগ ছাড়া সর্বরোগের ওষুধ কালাজিরায় আছে।

তিনি বলতেন নামাজি সচ্চরিত্র লোকের চেয়েও দরিদ্রের সাহায্যকারী ও বিনয়ী লোক উত্তম। সৎ উপায়ে উপার্জনকারীকে অধিক ইবাদতকারীর চেয়ে উত্তম বলেছেন । তিনি সমাজে আর্থিক সমতা আনার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলতেন­তোমার চারদিকের ৪০ ঘরের লোকজনের খবরাখবর নেবে এবং তাদের প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা দেবে ।

জ্ঞানার্জনকে তিনি এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তা অবর্ণনীয়­তিনি বলেছেন, ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানান্বেষণ করো।’ তিনি কোনো কোনো যুদ্ধবন্দীর মুক্তিপণ নিয়েছেন শিক্ষাদানের বিনিময় হিসেবে।

বিশ্বনবী সাঃ-এর জীবন ছিল এক মহান আদর্শ জীবন। এ জীবন পদ্ধতি মেনে চললে শরীর ও মন ভালো থাকবে। দুনিয়ায় চিরকাল শান্তি বিরাজ করবে। সবাই সুখশান্তিতে বসবাস করতে পারবে। কোথাও কোনো হানাহানি থাকবে না, কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ থাকবে না, হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না। সবাই হবে একে অন্যের ভাই-বোন, মাতা-পিতা ও আত্মীয়স্বজনের মতো।

**************************
মসউদ-উশ-শহীদ
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ৪ এপ্রিল ২০০৮