বর্তমান বিশ্বের খ্যাতনামা গবেষক ও ইতিহাসবিদ আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী ইহুদিদের ধর্মীয়, নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘ইহুদিরা নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক অধঃপতনের শেষ মর্গে গিয়ে পৌঁছেছিল। নিজেদের প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে নিকৃষ্টতম কাজ জাদু-টোনা, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য খাদ্যে বিষ মেশানো, বিদ্রূপবাণ নিক্ষেপ, দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ সৃষ্টি, ধোঁকা নিক্ষেপক অর্থপূর্ণ কথা বলে আহত নিজের অন্তরকে প্রবোধ দান করা তাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছিল। যা ওই সব হীন মানসিকতার ও পরাজিত সমাজের পরিচয়জ্ঞাপক চিহ্ন ছিল। যারা পুরুষোচিত গুণ ও নৈতিক সাহস থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে।’
প্রখ্যাত ইহুদি পণ্ডিত ড. ইসরাইল ওয়েলফিনসনে’র ভাষ্য অনুযায়ী ’৭০ সালে ইহুদি ও রোমানদের যুদ্ধের পরিণতিতে যখন ফিলিস্তিন ও বায়তুল মোকাদ্দাস ধ্বংস হয়ে যায়, তখন ইহুদিদের অধিকাংশই আরব উপদ্বীপে বিশেষ করে ইয়াছরিব (মদিনা) শহরে বসতি স্থাপন করে। কায়নুকা, নাযির ও কুরাইযাহ নামে তিনটি শক্তিশালী গোত্র মদিনায় বসবাস করত। এদের মধ্যে যুদ্ধ করতে সক্ষম এমন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২০০-এর মতো। মদিনায় ইহুদিরা নির্দিষ্ট কলোনি ও মজবুত দুর্গে বাস করত। নানা কারণে ইহুদিরা মদিনাকে একটি ইহুদি রাষ্ট্র বানাতে পারেনি। কিন্তু মদিনার ওপর ছিল তাদের লোলুপ দৃষ্টি।
প্রাচীনকাল থেকেই ইহুদিরা ছিল হাত গণনা ও জাদুবিদ্যায় বিশ্বখ্যাত। রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর যুগেও তারা এ পেশায় নিয়োজিত ছিল। ইহুদি আলেমরা এ পেশায় পারদর্শিতা অর্জনের জন্য গর্ববোধ করতেন। মুসলিম-বিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত ইহুদি মনীষী মারগুলিয়ন যিনি আরবি ও ইসলামিয়াতে পাণ্ডিত্য অর্জন করে খ্যাতিলাভ করেছিলেন তিনি ইহুদিদের পেশার বর্ণনা দিতে গিয়ে মন্তব্য করেন, ‘মদিনার ইহুদিরা জাদুবিদ্যায় বড় অভিজ্ঞ ছিল। তারা প্রকাশ্য ও পুরুষোচিত শৌর্যবীর্যের মোকাবেলায় জাদুর কসরত প্রদর্শনকে অগ্রাধিকার প্রদান করত।’ ড. ওয়েল ফিনসনের মতে, বিশেষ কারণে ইহুদিদের জন্য ধর্মের প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। তবে এ কথা সত্য, অন্য কোনো সত্য ধর্ম বিশেষ করে খ্রিষ্ট ও ইসলাম ধর্মের প্রচার-প্রসারে ইহুদিরা বাদ সেধেছে। সব শক্তি দিয়ে এই দু’ধর্মের অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছে। নিজেদের অর্থনৈতিক লাভ ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি স্থায়ী করার উদ্দেশ্যে ইহুদিরা মদিনার আরব বাসিন্দা আউস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর গড়ে তোলে। উভয়কে অর্থ দিয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দেয়।
রিসালাত ও নবুওয়াতের দাওয়াতের ব্যাপারে রাসূল সাঃ ছিলেন আপসহীন। তিনি ইসলাম প্রচারে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের সাথে তোয়াজ বা তদবিরের পথ বেছে নেননি। আল্লামা আবুল হাসান নদভী এ প্রসঙ্গে বলেন, নবুওয়তে মুহম্মদীর তাবলিগ ইহুদিদের আকিদা-বিশ্বাস, তাদের জীবনধারা ও কর্মকাণ্ডের ওপর প্রচণ্ডভাবে আঘাত হানে। ফলে এটা তাদের ইসলাম ও মুসলমানদের বিরোধিতা ও শত্রুতায় অবতীর্ণ করে। অনন্তর ইহুদিরা তাদের এত দিনের পুরনো দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ পাল্টিয়ে ফেলে এবং গোপন ও প্রকাশ্য উভয় পন্থায় ইসলামের বিরোধিতা ও লড়াইয়ে ময়দানে নেমে পড়ে।
ইহুদিরা কেন ইসলাম, ইসলামের নবী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করে এবং এর চরম বিরোধিতায় গোপনে ও প্রকাশ্যে নিজেদের কেন নিয়োজিত রেখেছে তার একটি জবাব রয়েছে ইহুদি পণ্ডিত ড. ইসরাইল ওয়েল ফিনসনের গবেষণাকর্মে। তিনি বলেন, ইহুদি মানসিকতা এমন কোনো জিনিসের সামনে নরম হতে রাজি হয় না, যা তাকে তার ধর্ম থেকে সরিয়ে দিতে চায়। তারা বনি ইসরাইল ছাড়া আর কোনো বংশের নবীকে মেনে নিতে রাজি হতে পারে না। ইসলামের বিরোধিতার আর একটি বড় কারণ হচ্ছে, মহানবীর সাঃ আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ৩৯ জন নেতৃস্থানীয় ইহুদি বিশেষত আবদুল্লাহ ইবনে সালামের মতো সম্মানিত ব্যক্তি ইসলাম কবুল করেন। ইহুদিরা এটা কল্পনাও করতে পারেনি যে, তারা তাদের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের হারাবেন। এ ঘটনা তাদের হিংসা ও দহন জ্বালাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্নভাবে তারা ইসলাম, রাসূল সাঃ ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে শুরু করে। এই ষড়যন্ত্রের কয়েকটি নমুনা এখানে উদ্ধৃত করা হলো।
মদিনার তিনটি শক্তিশালী গোত্র বনু কায়নুকা, বনু নাযির ও বনু কুরাইযা হজরত মুহাম্মদকে সাঃ প্রতিশ্রুত নবী হিসেবে গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ সাঃ হিজরতের পর ইহুদিদের সাথে সম্পাদিত এক চুক্তিতে তাদের পর্যাপ্ত স্বাধীনতা প্রদান করেন। তার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য শর্ত ছিল, মদিনা নগরী বহিশত্রু কতৃêক আক্রান্ত হলে তারাও আগ্রাসী শক্তির মোকাবেলায় যুদ্ধে অংশ নেবে। কিন্তু বদরের যুদ্ধে ইহুদিরা মক্কার কুরাইশদের গুপ্ত সংবাদ সরবরাহ করে। মদিনায় তাদের ভূমিকা ছিল গুপ্তচরের। সৈয়দ আমীর আলী বলেন, সারা মদিনা শহর (মুনাফিক ও ইহুদি) বিদ্রোহ ও বিশ্বাসঘাতকতায় ভরে গিয়েছিল। মদিনায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামকে ধ্বংসের জন্য ইহুদিরা রাসূল সাঃ ও সাহাবীদের রাঃ বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অপবাদ ছড়ায় ও কুৎসা রটনা করে। পবিত্র কুরআনের বাণীগুলোকে তারা অশুদ্ধ উচ্চারণ করত, যাতে অর্থের বিকৃতি ঘটে। কিছু ইহুদি পুরুষ ও মহিলা কবি মুসলিম মহিলাদের উদ্দেশে অশ্লীল ও বিদ্রূপাত্মক কাব্য রচনা করে আরবদের শালীনতাবোধ ও বীরত্বে আঘাত হানত। ইহুদি কবি কা’ব ইবনে আশরাফ বদরের যুদ্ধের পর মক্কায় গিয়ে কবিতার আসর জমিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের উত্তেজিত করে। মুসলিম নারীদের নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লিখে। রাসূলকে সাঃ হত্যার চক্রান্ত চালায়। আবু রাফে সাল্লাম অনুরূপভাবে সুলাইম ও গাতফান গোত্রকে ইসলামের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে। আমর বিন জাহাশ গৃহচূড়ায় আরোহণ করে প্রকাণ্ড পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে রাসূলকে সাঃ হত্যার চেষ্টা চালায়। খায়বার থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ইহুদিরা মদিনার উপকণ্ঠে মুসলমানদের ঘরবাড়ি ও শস্যক্ষেত্র জ্বালিয়ে দিত অথবা লুণ্ঠন করত। যয়নাব নামের জনৈক ইহুদি মহিলা রাসূলকে সাঃ গোশতের সাথে বিষ প্রয়োগ করে হত্যার চেষ্টা চালায়।
**************************
মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ৪ এপ্রিল ২০০৮