- Home
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
- ইসলামে নৈতিকতার গুরুত্ব
ইসলামে নৈতিকতার গুরুত্ব
- By Article Poster
- Published 04/4/2008
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
- Unrated
মানুষের মধ্যে নৈতিক গুণাবলী বিকাশের ক্ষেত্রে ধর্মের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মানবতার মুক্তির একমাত্র পাথেয় পবিত্র ধর্ম ইসলামে নৈতিকতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নৈতিকতার সপক্ষে এবং এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলতে গিয়ে কোরআনুল হাকিমে বলা হয়েছে- ‘শপথ মানুষের এবং তাঁর, যিনি তাকে সুঠাম করেছেন। অতঃপর তাকে তার সৎকর্ম ও অসৎকর্মের জ্ঞানদান করেছেন। সেই সফলকাম হবে যে নিজকে পবিত্র করবে এবং সে-ই ব্যর্থ হবে যে নিজকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।’ (সূরা শামসঃ ৭-১০)।
পবিত্র কোরআনে উত্তম নৈতিক মূল্যবোধের সব মৌলিক বৈশিষ্ট্যাবলীকে একত্রে সন্নিবেশিত করে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তোমাদের সুবিচার, কল্যাণ কামনা ও আত্মীয়তার বন্ধনকে সুদৃঢ় করার নির্দেশ দেন এবং অন্যায়-অশ্লীলতা, জুলুম ও খোদাদ্রোহিতা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। আল্লাহ তোমাদেরকে নসিহত করেন এই জন্য যে, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পার।’ (সূরা নাহলঃ ৯০)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘হে নবী (সা·)! আপনি তাদেরকে বলে দিন, তোমরা আল্লাহ্র সাথে কাউকে শরিক কর না। মাতা-পিতার সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করো। নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতার কাছেও যেও না, চাই তা প্রত্যক্ষ হোক আর পরোক্ষ হোক। আর ইসলামী আদালতে মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করো না। এসব উপদেশ আল্লাহ তোমাদেরকে দান করেন- যাতে তোমরা ভেবে-চিে- কাজ কর।’ (সূরা আনআমঃ ১২৭-১৩১)
এছাড়াও অসংখ্য আয়াতে কারিমায় নৈতিকতার সপক্ষে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যেমন- সূরা বনি ইসরাইলের ২৩-২৮ আয়াতে নৈতিক কর্মকাণ্ড, মায়িদার ৯০ নং আয়াতে মদ, জুয়া, সুরা পান, সূরা আন আমের ১৫১ ও আরাফের ৩৩ নং আয়াতে অশ্লীলতা, ইউনূসের ১৩ নং আয়াতে জুলুম, ইসরার ৩৩ নং আয়াতে হত্যা, মায়িদার ৩৩ ও ৩৮ নং আয়াতে যথাক্রমে অশাি- সৃষ্টি, চুরি ইত্যাদি কাজকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কোরআনিক দর্শন অনুযায়ী ইসলামের এই যে নৈতিক শিক্ষা এটি শুধু দার্শনিক তত্ত্বের মতো পুঁথিগত নয়, বরং একে সারাবিশ্বের মানুষের জন্য নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপনের নিমিত্তে আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রিয় রাসূল মোহাম্মদ (সা·)-এর জীবন মুবারকের মধ্যেও প্রতিফলিত করেছেন। নবী করিম (সা·) ছিলেন উন্নত ও উত্তম নৈতিকতার এক অনুপম আদর্শ। স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে সার্টিফাই করেন এভাবে- ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।’ (সূরা কলমঃ ৪) নবী করিম (সা·)-এর নৈতিকতার উল্লেখযোগ্য মৌলিক গুণাবলী ছিল- ন্যায়বিচার, ইনসাফ, আল্লাহ্র রা-ায় ব্যয়, বিশ্ব-তা, ওয়াদা পালন, সততা, কর্তব্যবোধ, শালীনতা, বদান্যতা, সঠিক পন্থা গ্রহণ, ন্যায়পরায়ণতা, প্রয়োজনে প্রতিশোধ গ্রহণ, উদারতা, মধ্যপন্থা প্রভৃতি। এ মহৎ কাজগুলো শুধু নিজের জীবনে বা-বায়ন করেই তিনি ক্ষা- হননি বরং নৈতিক মূল্যবোধ ও নৈতিক আচরণসমূহের প্রতি যে উৎসাহ এবং প্রেরণা দিয়েছেন তা সত্যিই অনন্য।
হাদিসে এসেছে, হজরত নাওয়াস ইবনে সাময়ান বর্ণনা করেন, ‘একদা রাসূলুল্লাহকে (সা·) নেক ও বদ আমল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তদুত্তরে তিনি বলেন, নেক আমল হচ্ছে উত্তম চরিত্র আর বদ আমল হচ্ছে যে কাজ তোমার বিবেকের কাছে সদ্বিগ্ন মনে হয়, অ-র ইত-ত করে, আর তা লোকের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়-ক এটা তুমি চাও না।’ (মুসলিম, তিরমিজী)। অন্যত্র আবু দারদা (রা·) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী করিম (সা·) বলেছেন- ‘কিয়ামতের দিন মুমিনের নেকের পাল্লা ভারি করার মতো উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারি কোন আমল নেই। আর অবশ্যই আল্লাহ অশ্লীল ও অশ্রাব্য গালিগালাজকারীর ওপর অসন্তুষ্ট। (তিরমিজী ও ইবনে মাজাহ)
সুতরাং কোরআন ও হাদিসে নৈতিকতার প্রতি যে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, উন্নত নৈতিক গুণাবলী মেনে চলার যে ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে তা কারও জানার মধ্যে নয় বরং মানার মধ্যেই রয়েছে যথার্থ সার্থকতা। ইসলামের সুপ্রতিষ্ঠিত এ নৈতিক দর্শনের মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি, তাবে-তাবেয়িন, সালফে সালেহিন ও আইইম্মায়ে মুজতাহিদীন অত্য- সফলভাবে ইসলামের বিজয় কেতন চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরা যে দিকে গিয়েছেন সে দিকেই সফলতা তাঁদের পদচুম্বন করেছিল। এর মূল কারণ ছিল- তাঁরা নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ ছিল। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়, ইসলামের এই নৈতিক শিক্ষা মুসলমান সমাজ থেকে প্রায়ই নির্বাসিত। মুসলমানরা বিশেষ করে মুসলিম তরুণরা আজ গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়ে স্বজাতীয় কৃষ্টি-কালচার ও নৈতিকতাকে উপেক্ষা করে তথাকথিত ‘সুস্থ সংস্কৃতি’ নামে যাবতীয় বেহায়াপনা ও অশ্লীলতায় মেতে উঠেছে। সুতরাং এ পথ থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামের নৈতিক শিক্ষাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে তাকওয়াভিত্তিক জীবন গঠন না করলে আমাদের জন্য আল্লাহ্র আজাব-গজব অনিবার্য।
**************************
এম জ হি রু ল ই স লা ম
যুগান্তর, ৪ এপ্রিল ২০০৮