Islamic Article Archive - http://articles.ourislam.org
অজু সাধনার প্রাথমিক স্তর
http://articles.ourislam.org/articles/141/1/aaa-aaaaaa-aaaaaaaa-aaaa/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 04/15/2008
 
পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। অজু পরিচ্ছন্নতার পটভূমি। আল্লাহতায়ালা মানুষকে দু’টো উপাদানে ভূষিত করেছেন-একটি দেহ, অপরটি মন। দেহ এবং মনের সুষ্ঠু সমম্বয়ে গড়ে উঠে পরিপূর্ণ মানবজীবন। অজু দেহ ও মন এই উভয়বিধ উপাদানের পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতা আনয়ন করে।

অজু সাধনার প্রাথমিক স্তর

পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। অজু পরিচ্ছন্নতার পটভূমি। আল্লাহতায়ালা মানুষকে দু’টো উপাদানে ভূষিত করেছেন-একটি দেহ, অপরটি মন। দেহ এবং মনের সুষ্ঠু সমম্বয়ে গড়ে উঠে পরিপূর্ণ মানবজীবন। অজু দেহ ও মন এই উভয়বিধ উপাদানের পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতা আনয়ন করে।

অজুর সঙ্গে দেহের সরাসরি সংযোগ থাকার কারণে আমরা সাধারণতঃ মনে করি যে, অজু দেহ বা শরীরেরই পবিত্রতা আনয়ন করে। আসলে তা নয়। অজু দেহ ও মন উভয়েরই উৎকর্ষ সাধন করে মানবজীবনকে অর্থবহ করে তুলে।

সৃষ্টিকর্তা মানবদেহকে বিচিত্ররূপে সজ্জিত করেছেন। তিনি প্রথমতঃ দেহ সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর এটাকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করেছেন। তারপর, সৃষ্টি করেছেন বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। কিছু কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আবার জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। হস্ত, কর্ণ, চুক্ষু, পদ, নাসিকা, মুখ ও মস্তক তারই অপূর্ব সৃষ্টি। প্রতিটি অঙ্গই বিশেষ উদ্দেশ্যে নিবেদিত। স্রষ্টা ও সৃষ্টির সেবাই এদের মূল লক্ষ্য।

আধুনিক বিজ্ঞানের স্বাস্থ্যসম্মত প্রণালীগুলো অজু থেকে প্রাপ্ত বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। অজু স্বাস্থ্যসম্মত ও বিজ্ঞানভিত্তিক একটা পরিচ্ছন্নতা প্রণালী। ইসলামের ঊষালগ্নে স্বাস্থ্যবিধির এ প্রণালীর কিভাবে উদ্ভব ঘটেছিল তা’ ভেবে আশ্চর্য হতে হয়। অজু আমাদের অন্তর-বাহির নির্মল করে দেয়। অজু বা পবিত্রতার ভেতর চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত।
প্রথমতঃ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে অপবিত্রতা বা নাপাক হতে পবিত্র করা;
দ্বিতীয়তঃ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গুনাহ্‌ বা দোষ হতে পবিত্র করা।
তৃতীয়তঃ মন্দভাব বা নিন্দনীয় অভ্যাস হতে মনকে পবিত্র করা।
চতুর্থতঃ আল্লাহ ব্যতীত মনকে অন্য জিনিস হতে পবিত্র করা।

অজুর বিধানগুলোর সংক্ষিপ্ত বিশেস্নষণ বিষয়টি অনুধাবন করা যাক।

অজুর প্রাথমিক পর্বে আমরা দু’হাতের অগ্রভাগে কব্জি পর্যন্ত ভালভাবে তিনবার ধৌত করি। এটা যে কত বিজ্ঞানভিত্তিক এবং স্বাস্থ্যসম্মত তা’ বলা অপেক্ষা রাখে না। শরীরে নানাবিধ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌত করার সময় হস্তদ্বয়ের এই অগ্রভাগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই অগ্রভাগই যদি ময়লা ও আবর্জনাযুক্ত থাকে, তবে তা’ দিয়ে অন্যান্য অংশে ধৌত করা একান্তই অর্থহীন। তাই অজুর প্রাথমিক পর্যায়ে দুই হস্তের অগ্রভাগ কব্জি পর্যন্ত ধোয়ার উপর জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। তিনবার ধৌত করার পেছনেও একটা উদ্দেশ্য নিহিত। প্রথম ধোয়াতে ময়লা পরিষ্কার করার পর যদিওবা কিছু লেগে থাকে তা’ দ্বিতীয় ধোয়াতে অবশ্যই চলে যাবে এবং তৃতীয় ধোয়ার পর একেবারে সন্দেহমুক্ত হওয়া যায়। শরীরের এই অংশ ধোয়ার সঙ্গে মানসিক যে দোয়া সম্পৃক্ত তা অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। এ সময় বলা হয়ঃ “হে আল্লাহ নিশ্চয় আমি তোমার সৌভাগ্য ও বরকত চাচ্ছি; দুর্ভাগ্য ও বিনাশ হতে তোমার নিকট আশ্রয় চাই।” সূত্রঃ এহইয়া উলুমিদ্দীন ১ম খন্ড পৃঃ ২৪৬

দেহ ও মনের কি অপূর্ব সমম্বয়। দেহ পরিচ্ছন্নতার সাথে মানসিক বিশুদ্ধতারও বিকাশ লাভ গটেছে। হস্তের অগ্রভাগ ধৌত করার পর পালাক্রমে আসে কুল্লি করা, নাক পরিষ্কার করা এবং মুখমন্ডল ধৌত করা। নাক-কান-গলা এই তিন অংশই আন্তঃসম্পর্কে সম্পর্কিত। এর কোন একটিতে কিছু ঘটলে অপর অংশে তা’ প্রভাব বিস্তার করতে বাধ্য। আধুনিককালের নাক-কান-গলা বা ঋূক বিশেষজ্ঞরা নাক-কান-গলাকে পরিষ্কার রাখার জন্য যে উপদেশাবলী প্রদান করে থাকেন, মনে হয়, অজুর নাক-কান গলা ধৌত করার পদ্ধতি যেন তারই প্রতিধ্বনি। যে যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞান উন্নতি লাভ করে নাই, যে যুগে স্বাস্থ্যবিধি প্রণয়ন করা হয়নি, সেইকালে অজুর ন্যায় বিশুদ্ধকরণের এমন ভাবধারা আমাদেরকে সত্যি অবাক করে। ইসলাম ধর্মের বিশেষত্বই এই যে, যা নিয়ে আমরা আজ গর্ববোধ করি, বহুযুগ পূর্বেই ধর্ম তা আমাদের স্বীকৃতি দিয়াছে। একবার স্বাভাবিকভাবে গড়গড়া করার পর ঊর্ধ্বমুখী হয়ে যে দু’বার গড়গড়া করা হয় তা’ আমাদের বর্তমান বিজ্ঞানের ঐটরথফধভথ এর কথাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। মুখাভ্যন্তর এবং কণ্ঠনালীকে পরিস্কার করার এর চেয়ে কোন উত্তম পন্থা আছে বলে আমার জানা নেই। কুলির এই বহিস্থপরিচ্ছন্নতার পর মানসিকভাবে যে দোয়া চাওয়া হয় তা’ হচ্ছে “হে প্রভু, তোমার বহু জেকের করতে, তোমার পবিত্র গ্রন্থ কোরআন পাঠ করতে আমাকে সহায়তা কর।” সূত্রঃ এহইয়া উলুমিদ্দীন ১ম খন্ড পৃঃ ২৪৬

মহান প্রভু আল্লাহতাআলাকে ডাকার পূর্বে মুখাভ্যন্তরকে পরিষ্কার করার কি সুন্দর নিয়ম। আল্লাহ নামের স্মরণ এবং পবিত্র কোরান পাঠের অর্থ হলো আল্লাহতাআলার বাণী এবং তাঁর আদেশ-নিষেধকে মেনে চলা। মুখের ভেতর ভাল পরিশুদ্ধি করার অর্থ দন্ত, রসনা, কণ্ঠ ও তালু যেন মহান প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনার কাজে ব্যস্ত থাকে। কণ্ঠ নিঃসৃত কথা ও সুর মুখ নিঃসৃত বাণী যেন সুন্দর, মধুর ও পবিত্রতার মূর্ত বাহক ও ধারক হয়। দৈহিক পরিচ্ছন্নতার সাথে যেন কার্যকর আত্মিক বিশুদ্ধতা অর্জিত হয়।

নাকের ভেতর পানি ঊর্ধ্বশ্বাসে টেনে সজোরে নিক্ষেপের ফলে নাকের শেস্নষ্মা সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়। শ্বাস-প্রশ্বাসের কার্য সহজতর হয় এবং হ্নদপিন্ড ও ফুসফুসকে বিশুদ্ধ রাখে। এ সময় যে দোয়া পাঠ করা হয় তা’ নাকের প্রকৃত কার্যকে নির্দেশ করে। এ সময় বলা হয়, “হে প্রভু, আমাকে বেহেশতের সুঘ্রাণ নিতে দাও এবং নরকের দুর্গন্ধ ও মন্দ হতে তোমার আশ্রয় কামনা করি”। সূত্রঃ এহইয়া উলুমিদ্দীন ১ম খন্ড পৃঃ ২৪৭। দৈহিক পবিত্রতার সাথে মানসিক বিশুদ্ধতার কি উন্নত প্রকাশ।

সমগ্র মুখমন্ডল ধৌত করার সময় বলা হয়, ‘হে প্রভু তোমার নূর ও জ্যোতির দ্বারা আমাকে নূরায়িত ও জ্যোতির্ময় কর।’ অর্থাৎ, আমার এ মুখমন্ডল যেন তোমার পবিত্রতার আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত হয়। ডান ও বাম হস্ত কনুই পর্যন্ত ধৌত করার সময় প্রার্থনা করা হয়, ‘হে প্রভু আমার আমলনামা আমার ডান হাতে এবং বাম হস্তের আমল থেকে তোমার নিকট আশ্রয় চাই।’ সূত্রঃ এ-হইয়া উলুমিদ্দীন ১ম খন্ড পৃঃ ২৪৭। অর্থাৎ তোমার পবিত্র কার্য দ্বারা আমার হস্তকে সুশোভিত কর। ডান হাত অর্থাৎ সৎকার্যের পুরস্কার আমাকে বিনীতভাবে গ্রহণ করার সুযোগ দাও এবং অসৎ ও মন্দ কার্য হতে আমি করুণাময়ের নিকট আশ্রয়প্রার্থী। মস্তক ধৌত করার সময় বলা হয়, ‘যেদিন আরশের ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন আমার মস্তকে তোমার আরশের নীচে ছায়া প্রদান করো।’ সূত্রঃ এহইয়া উলুমিদ্দীন ১ম খন্ড পৃঃ ২৪৮। অর্থাৎ আমার মস্তককে তোমার সুশীতল ছায়ার নীচে আশ্রয় দিয়ে আমাকে স্থির ও ঠান্ডা মস্তিষ্কে কার্য করার ক্ষমতা প্রদান করো। পদদ্বয়কে বাহ্যিকভাবে ধৌত করার সময় বলা হয়, ‘হে আল্লাহ, আমার পদদ্বয়কে সহজ-সরল পথে রেখো।’ সূত্রঃ এহইয়া উলুমিদ্দীন ১ম খন্ড পৃঃ ২৪৮। অর্থাৎ তোমার প্রদর্শিত পথ চলতে আমাকে সাহায্য করো।

অজু সমাপান্তে উচ্চস্থ আসমানের পানে মস্তক উত্তোলনপূর্বêক যে নিবেদিত দোয়া পাঠ করা হয় তা আমাদেরকে সাধনার উচ্চতম মার্গে উপনীত করে। বলা হয়ঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তিনি এক, অদ্বিতীয়, লা-শারীক। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মোহাম্মদ (সাঃ) তাঁর প্রেরিত পুরুষ ও বান্দাহ। আল্লাহ মহান, পবিত্র এবং সমস্ত প্রশংসা তাঁরই। তিনি ব্যতীত উপাস্য নেই। হে আল্লাহ, আমি গুনাহ করেছি এবং আমি নিজের উপর অত্যাচার করেছি। হে আল্লাহ, আমি তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি, তোমার নিকট তাওবা করি। হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা কর এবং আমার দোয়া কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি দোয়া গ্রহণকারী, দয়ালু। হে আল্লাহ, আমাকে তাওবাকারী, পবিত্রতাকামী এবং সৎ কর্মশীলদের অর্ন্তর্ভুক্ত কর, আমাকে সবরকারী এবং শোকরগোজারকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর। হে আল্লাহ, আমাকে তোমার স্মরণের সেই তৌফিক দান কর যেন আমি সকাল-সন্ধ্যা তোমার প্রশংসা করতে পারি। সূত্রঃ এহইয়া উলুমিদ্দীন ১ম খন্ড পৃঃ ২৮৪-২৪৯।

প্রতিদিন পাঁচবার, প্রতি অঙ্গ আবার তিনবার করে ধৌত করার ফলে শরীরের বহিরাংগ কিরূপ বিশুদ্ধতা লাভ করে এবং প্রতি অঙ্গের সাথে সংযুক্ত দোয়াগুলো পাঠ করলে কিরূপ মানসিক ভাবধারার বিকাশ ঘটায়, তা সহজেই অনুমেয়। অপবিত্র দেহ দুর্বল ও কলুষমনের পরিচায়ক। অপরিচ্ছন্ন দেহ সুস্থ চিন্তার অন্তরায়। সুস্থ দেহ, সুস্থ মন গড়ে। ইসলামের অজুর বিধান অন্তর-বাহির উভয়কে নির্মল করে। দেহ-মন উভয়ের উৎকর্ষ সাধনে মানুষের মন উন্নীত হয় এক বিশুদ্ধ ও মহৎ চিন্তায়-আমরা প্রধাবিত হই এক মহান পবিত্রতার পানে-সাক্ষাৎ পাই মহান স্রষ্টাকে, লাভ করি প্রশান্তি।

**************************
প্রফেসর· এম·এ· হালিম
দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ এপ্রিল ২০০৮