Islamic Article Archive - http://articles.ourislam.org
ইবনে আহমদ আল বিরুনী
http://articles.ourislam.org/articles/142/1/aaaa-aaaa-aa-aaaaaa/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 04/4/2008
 
আল-বেরুনী পারস্যের সামানীয় বংশের রাজত্বকালে ৯৭৩ ফ্রিষ্টাব্দে খওয়ারিজমের খিবায় জন্ম গ্রহণ করেন। বিরুন হলো খওয়াজিরজম প্রদেশের একটি জায়গার নাম। আর ঐ বেরুন থেকেই তিনি বিরুনী বা আল-বেরুনী নামে পরিচিত হয়েছেন। তাঁর পুরো নাম আবু রায়হান মুহম্মদ ইবনে আহমদ আল বিরুনী। তিনি একাধারে ভ্রমণকারী, দার্শনিক, গাণিতিক, জ্যোতির্বিদ, ভূগোলবিধ ও বিশ্বকোষ প্রণেতা ছিলেন।

ইবনে আহমদ আল বিরুনী

আল-বেরুনী পারস্যের সামানীয় বংশের রাজত্বকালে ৯৭৩ ফ্রিষ্টাব্দে খওয়ারিজমের খিবায় জন্ম গ্রহণ করেন। বিরুন হলো খওয়াজিরজম প্রদেশের একটি জায়গার নাম। আর ঐ বেরুন থেকেই তিনি বিরুনী বা আল-বেরুনী নামে পরিচিত হয়েছেন। তাঁর পুরো নাম আবু রায়হান মুহম্মদ ইবনে আহমদ আল বিরুনী। তিনি একাধারে ভ্রমণকারী, দার্শনিক, গাণিতিক, জ্যোতির্বিদ, ভূগোলবিধ ও বিশ্বকোষ প্রণেতা ছিলেন।

জ্ঞান ও বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ আর সেই সাথে ছিল ব্যাপক পড়াশুনা। বাল্যকাল থেকেই বিদ্যা ও জ্ঞানের প্রতি তাঁর এ আকর্ষণ ছিল। তিনি ছিলেন বহুভাষাবিদ পণ্ডিত এবং বহুমুখী, প্রতিভাধর ও বহু বিষয়ের লেখক। তিনি তাঁর মাতৃভাষা খওয়ারিজম তুর্কী ভাষা ছাড়াও স্থানীয় ফারসি ভাষাতেও পারঙ্গম ছিলেন। সেই সাথে হিব্রু, সিরিয়ান, সংস্কৃতি ও ভারতের বিভিন্নঅঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। গ্রীক ভাষার জ্ঞান তিনি সরাসরি লাভ করেননি; তবে প্লোটো, অ্যারিস্টটল, সক্রেটিস ও অন্যান্য গ্রীক-পণ্ডিত ও দার্শনিকদের রচনাবলি তিনি আরবি অনুবাদের মাধ্যমে পাঠ করেছিলেন। তাছাড়া আরবি ও ফারসি এবং সংস্কৃতি ভাষাতেও ছিল তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। তিনি তাঁর অধিকাংশ গ্রন্থই আরবি ভাষায় রচনা করেছেন। ভারত সর্ম্পকিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাব-উল-হিন্দ’ আরবি ভাষাতেই লেখা।

আল-বিরুণী বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সীনার সমসাময়িক ছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল এই উপমাহদেশে অবস্থান করেন। গজনির সুলতান মাহমুদ ভারতের উত্তর পশ্চিম অংশ দখল করার পর মধ্য এশিয়ার ক্ষুদ্র রাষ্ট্র খওয়ারিজমও জয় করেন। এ সময় সুলতান মাহমুদ খওয়ারিজমের জ্ঞানী-গুণী, গন্যমাণ্য নাগারিকদের বন্দি করে তাঁর রাজ্য গজ্‌নিতে নিয়ে আসেন। এই বন্দিদের মধ্যে আল-বিরুণীও ছিলেন। আল-বিরুণীকে সুলতান মাহমুদ গজ্‌নির দরবারে রাজ জ্যোতিষী নিযুক্ত করেন। পরবর্তীকালে সুলতান তাঁকে রাজ দায়িত্ব পালনের জন্য ভারতের পশ্চিম অঞ্চলে পাঠিয়েছিলেন।

ভারতবর্ষে থাকাকালীন সময়ে আল-বিরুণী গভীর অভিনিবেশে ও আগ্রহের সাথে ভারতের সামজিক ও ধর্মীয় জীবন সম্পর্ক তথ্যাবলি সংগ্রহ করেন। এই সংগ্রহ এবং পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি “কিতাবুল হিন্দ বা ভারত তত্ত্ব” নামে একটি বিশাল গ্রন্থ রচনা করেন। এর মূল আরবি নাম হল। “কিতাব ফি তাহকিক মালিল হিন্দ মাকুলাৎ ফি আল আকল উ মরযুলাৎ”। বাংলায় এ অর্থ দাঁড়ায় বুদ্ধি বিচারে যা গ্রহণযোগ্য আর গ্রহণ নয়, হিন্দুদের সব রকম চিন্তা পদ্ধতির সঠিক বর্ণনা। এর আনুমানিক রচনাকাল ১০৩০ খ্রিষ্টাব্দ। এটি দশম থেকে একাদশ শতকের ভারতীয় জ্ঞান, সমাজ, ধর্মীয়, বিশ্বাস, আচার-আচরণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর একটি সম্পূর্ণ জ্ঞান কোষ বিশেষ। মধ্যযুগের ভারতবর্ষের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের অতুলনীয় উপাদানের জন্য এই গ্রন্থের প্রসিদ্ধ আজ পৃথিবী ব্যাপী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ঐতিহাসিক আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ ‘আল-বিরুণীর ভারততত্ত্ব নামের এই গ্রন্থটি মূল আরবি ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন। যা ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমী হতে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্যিক সত্যেন সেন আল-বিরুণীর ভারত আগমন এবং তাঁর জ্ঞান সাধনাকে ভিত্তি করে ১৯৬৯ সালে ‘আল-বিরুণী’ নামক একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা করেন।

আল-বিরুণী হিন্দু দর্শন বিশেষত ‘ভগবত গীতা’ দ্বারা গভীরভাবে আলোড়িত হন। তিনি সংস্কৃত থেকে ষষ্ঠ শতকের বরাহমিহিরের দু’খানা গ্রন্থসহ ছোট বড় ২২টি ভারতীয় পুস্তক আরবিতে অনুবাদ করেন। তিনি আরবি ভাষায় ভূগোল, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কেও কয়েকটি বই লেখেন। তার উল্লেখযোগ্য বই হল- ‘কিতাবুল আত্‌হার আল-বাকিয়া আনিল করূন (প্রাচীন জাতিসমূহের ঘটনাপঞ্জি বা অতীতের চিহ্ন); আল কানুন আল-মাসউদী-ফীল-হাইয়া-ওয়াল-নূজুম (জোতির্বিদ্যা ও ফলিত জ্যোতিষশাস্ত্রের সংক্ষিপ্তসার) ইত্যাদি।

আল বিরুণী ভারতীয় সংখ্যা লিখন-পদ্ধতির বিবরণও লিপিবদ্ধ করেন। কোন্‌ (টভথফণ) কে তিনি সমানভাবে বিভক্ত করার নিয়ম প্রবর্তন করেন এবং অন্যান্য যে সকল জ্যামিতিক সম্পাদ্য রুলার ও কমপাসের সাহায্যে সমাধানের নিয়ম ছিল না, তিনি সেসব সম্পাদ্য সমাধান করেন। সেগুলো পরবর্তীকালে “আল বিরুণীর সম্পাদ্য” নামে পরিচিতি লাভ করেছে।

আল-বিরুনী নিখুঁতভাবে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমা নির্ণয় করেন এবং জরিপের সাহায্যে ভূ-পৃষ্ঠের দৈর্ঘø নির্ণয়ের অনুসন্ধান চালিয়ে ১৮টি মূল্যবান প্রস্তর ও ধাতুর নির্ভুল আপেক্ষিক গুরুত্ব নির্ণয় করেন। শব্দের গতির তুলনায় আলোর গতি যে অনেক গুণ বেশী তিনি তাও প্রমাণ করেছিলেন। আল-বিরুণী, সমালোচনা, দক্ষতা, সহনসীলতা, সত্যানুরাগ এবং মানসিক সাহস মধ্যযুগে অতুলনীয় ছিল। তাঁকে শুধু মুসলমান সমাজে নয়, সমগ্র বিশ্বের সকল সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী রূপে গণ্য করা হয়।

আফগানিস্তানের গজ্‌নি বা সিজিস্তানে ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে ৭৫ বছর বয়সে এই জ্ঞানতাপস ইন্তেকাল করেন।

**************************
শাহ্‌ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান
দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ এপ্রিল ২০০৮