দাম্পত্য জীবনে প্রবেশের মাধ্যমে একজন পুরুষ ও একজন নারী জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ও নতুন অধ্যায়ে উপনীত হয়। দাম্পত্যের আবর্তে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শুরু হয় প্রেম-ভালোবাসা। চাওয়া-পাওয়া ও অধিকারের বিষয়টিও সমানতালে চলতে থাকে। একজন স্ত্রীর প্রতি স্বামীর যে অধিকার ও দায়দায়িত্ব রয়েছে, ঠিক তেমনি একজন স্বামীর প্রতিও স্ত্রীর অধিকার ও দায়দায়িত্ব রয়েছে।

একজন নারী তার মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন ফেলে স্ত্রীরূপে স্বামীর ঘরে প্রবেশ করে। স্বামীর ঘরে আসার পর স্ত্রীর চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ-বিনোদন সবকিছুই স্বামীর সংসারকে ঘিরেই শুরু হয়। স্বামীর অবর্তমানে একজন স্ত্রী যাতে অসহায়ত্বের কালোছায়ায় পতিত না হয় এজন্য ইসলাম ধর্মে রয়েছে প্রয়োজনীয় পথনির্দেশনা।

বিয়ের পর একজন স্ত্রীর অধিকার প্রাপ্তিতে প্রথমেই চলে আসে মোহরানার বিষয়টি। পবিত্র কোরআনুল কারিমে সূরা নিছার ৪ নং আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন- ‘আর তোমরা স্ত্রীদের তাদের মোহর দিয়ে দাও সন্তুষ্টচিত্তে।’ বিয়েতে মহান আল্লাহ কতৃêক নির্দেশিত অপরিহার্য প্রদেয় হিসেবে স্বামী কর্তৃক স্ত্রী যে অর্থ-সম্পদ পেয়ে থাকে তাকে মোহরানা বলে। অর্থাৎ মোহরানা বলতে ওইসব অর্থ-সম্পদ বোঝায়, যা বিয়েবন্ধনে স্ত্রীর ওপর স্বামিত্বের অধিকার লাভের বিনিময়ে স্বামীকে আদায় করতে হয়। বিয়েতে নারীকে মোহরানা দেয়ার জন্য পুরুষের প্রতি আল্লাহর যে নির্দেশ, তা নামাজ-রোজার মতোই কোরআনের নির্দেশ, ফরজ।

মহানবী (সা·) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোন মেয়েকে মোহরানা দেয়ার ওয়াদায় বিয়ে করেছে, কিন্তু সে মোহরানা আদায় করা তার ইচ্ছে নেই, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে জেনাকারী-ব্যভিচারী হিসেবে দাঁড়াতে বাধ্য হবে।’ (মুসনাদে আহমেদ)। সুতরাং মোহরানা স্ত্রীর এমন একটি প্রাপ্য, যা তিনি স্বামীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগে পাওনা হন, তবে স্ত্রী সময় দিলে বাকি রাখা যাবে। কিন্তু মোহরানার অর্থ আবশ্যিকভাবে পরিশোধ করতে হবে। বিবাহিত স্ত্রীকে অসহায় মনে করে ছলে-বলে-কৌশলে বা অজ্ঞতার সুযোগে মাফ করিয়ে নিলে মাফ না হয়ে তা হবে জুলুম-প্রতারণা। এ জুলুম প্রতিরোধকল্পে মহান আল্লাহপাক ঘোষণা করেন- ‘যদি স্ত্রী নিজের পক্ষ থেকে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে মোহরের কিছু অংশ ক্ষমা করে দেয়, তবে তোমরা তা হৃষ্টচিত্তে ভোগ করতে পার।’ (সূরা নিছা, আয়াত-৪)।

মোহরানা এককালীন আদায় করতে অক্ষম হলে, উত্তম হল কিছু অংশ নগদ আদায় করে বাকি অংশ পরে আদায় করা, তা ধীরে ধীরে কিস্তিতে পরিশোধ করা। তবে মোহরানা আদায় না করলে স্ত্রীর কাছে ঋণী থাকতে হবে এবং স্ত্রী অনাদায়ী মোহর স্বামীর মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে আদায় করে নিতে পারবে। এটি স্ত্রীর অধিকার এবং শরিয়ত কতৃêক স্বীকৃত।
সামাজিক স্ট্যাটাস রক্ষা ও লৌকিকতার খাতিরে মোটা অংকের মোহরানা ধার্য করা মোটেই উচিত নয়। কেননা সামর্থেøর অতিরিক্ত মোহরানা আদায় করা স্বামীরও বোঝাস্বরূপ। মোটা অংকের মোহরানা ধার্য করে পরে তা পরিশোধ না করা, পরিশোধ করার ইচ্ছা নেই, শুধু একটি অংশ স্বীকার করা প্রতারণার শামিল, কবিরা গোনাহ। সুতরাং মোহরানা কোন প্রদর্শনীমূলক বিষয় নয়, এ নিয়ে যে কোন ধরনের টালবাহানা বা সীমা লংঘন করা ধর্মের দৃষ্টিতে জঘন্যতম অপরাধ।

**************************
হাফেজ জাহিদ উদ্দিন
যুগান্তর, ১১ এপ্রিল ২০০৮