পবিত্র হজ্বের কার্যাবলী
- By Article Poster
- Published 12/4/2007
- হজ্জ্ব
- Unrated
হজ্ব পালনকারী ব্যক্তি কিভাবে হজ্বের কার্যাবলী সম্পাদন করবে তার একটি ধারাবাহিক আলোচনা পেশ করছি। হজ্বে গমনেচ্ছু ব্যক্তি প্রথমে নখ, গোঁফ ইত্যাদি কেটে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করবে। এরপর গোসল অথবা ওজু করবে। তবে গোসল করাই অধিক শ্রেয়। হায়েজ-নেফাসগ্রস্ত নারীর ক্ষেত্রেও গোসল উত্তম- যদি গোসল তার জন্য ক্ষতি না করে। পুরুষ নতুন একটি ইযার ও একটি চাদর পরিধান করবে। ইহরামের একাপড় দুটি সাদা ও নতুন হওয়াই বাঞ্ছনীয়। চাদরে বোতাম লাগাবে না এবং গিরাও দেবে না। মাথা খোলা রাখবে। মহিলারা সেলাইযুক্ত পর্দা রক্ষ হয় এমন যে কোনো কাপড় পরতে পারবেন। তবে তারা মাথা ঢেকে রাখবেন এবং চেহারার উপর এমন পন্থায় কাপড় ঝুলিয়ে দেবেন যেন কাপড়টি চেহারাকে স্পর্শ না করে। গোসলের পর দুই রাকাআত নফল নামায পড়বে। এরপর বলবে ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল হাজ্বা ফায়াসসিরহুলি ওয়াতাকাব্বালহু মিন্নি’- হে আল্লহ। আমি হজ্ব পালনের ইচ্ছা করেছি। একাজটি আপনি আমার জন্য সহজ করুন এবং কবুল করুন। এটা হজ্বের নিয়ত। এরপর তালবিয়াহ পাঠ করবে। তালবিয়াহ হলো- ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা, লাব্বাইকা লা-শারীকা লাকা লাব্বাইকা। ইন্নাল হামদা ওয়ান নেয়ামাতা লাকা ওয়াল মুলকা লা-শারীকা লাকা’। অর্থাৎ হে আল্লহ! আমি হাজির আছি। আমি হাজির আছি। আপনার কোনো শরীক নেই, আমি হাজির আছি। নিশ্চয় সকল প্রশংসা ও নেয়ামত আপনারই এবং সমগ্র বিশ্বজাহান আপনার। আপনার কোনো শরীক নেই। এভাবে উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়াহ পাঠ করবে। তবে মহিলারা কখনো উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়াহ পড়বে না। তালবিয়াহ কমপক্ষে তিনবার পড়া সুন্নত। এভাবে হজ্বের নিয়তে তালবিয়াহ পাঠ করার পর ইহরাম বাঁধা সম্পন্ন হবে। ইহরাম বাঁধার পর অশ্লীল ও আল্লাহর নাফরমানীমূলক কোনো কাজ করা যাবে না। মক্কার বাহিরে থেকে আসা হাজিগণ প্রথমে তাওয়াফে কুদুম করবেন। তাদের জন্য উত্তম হলো মক্কা শরীফে প্রবেশের পূর্বে গোসল করা এবং ‘বাবুল মুআল্লা’ দরজা দিয়ে প্রবেশ করা। প্রবেশের সময় ‘বাবুস সালাম’ দরজায় পৌঁছা পর্যন্ত তালবিয়াহ পড়তে থাকা। এই বাবুস সালাম দরজা দিয়েই মসজিদে হারামে সশ্রদ্ধভাবে বিনয়ের সাথে প্রবেশ করবে। মহানবী (সাঃ)-এর প্রতি দরুদ শরীফও পাঠ করবে। এরপর লা-ইলাহাহ ইল্লাল্লাহ তাকবীর বলতে বলতে হাজরে আসওয়াদের মুখোমুখি হবে। হাজরে আসওয়াদের উপর দু’হাত রেখে শব্দ ছাড়া চুমো খাবে। কাউকে কষ্ট না দিয়ে যদি এ কাজ করা যায় তাহলে করবে। আর নচেৎ কোনো কিছু দ্বারা পাথরটিকে স্পর্শ করে তার উপর চুমো খাবে অথবা দূর থেকে হাত দিয়ে ইশারা করে হাতে চুমো খাবে। তাওয়াফে যখনই হাজরে আসওয়াদের পাশ দিয়ে যাবে তখনই চুমো খাবে। তাওয়াফ শুরু করবে হাজরে আসওয়াদের সামনে থেকে এবং শেষ করবে সেখানে এসে। এরপর মাকামে ইবরাহীম অথবা মসজিদে হারামের যেখানেই সুযোগ মিলবে দু’রাকাআত নামাজ পড়ে নিবে। তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে রমল করবে। রমল হলো- দুই কাঁধ ঝুলিয়ে এভাবে দ্রুত চলা যেভাবে রণাঙ্গনে মুখোমুখি লড়াইয়ে অবতীর্ণ দুই সারি সৈন্যদের মাঝে অগ্রসরমান সৈনিক বুক উঁচিয়ে সদম্ভে চলে। যদি মানুষের ভীড় হয়, তাহলে দাঁড়িয়ে যাবে। যখনই সুযোগ মিলবে তখন রমল করবে। তবে মহিলারা রমল করবে না। তাওয়াফ শেষ হলে সাফা-মারওয়ায় সাঈ করবে। প্রথমে সাফা পর্বতের উপর আরোহণ করবে। বাইতুল্লাহ শরীফের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকবীর বলবে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে, তালবিয়াহ পাঠ করবে এবং নবীজীর ওপর দরুদ পড়বে। এরপর আকাশের দিকে দুই হাত সম্প্রসারিত করে দোয়া করবে। দোয়ার পর মারওয়া পর্বতের উদ্দেশে নেমে আসবে। দুই পাহাড়ের মাঝখানে সমতলভূমিতে পৌঁছবে তখন সবুজ খুঁটি দুটির মধ্যস্থলে সজোরে দৌঁড়াবে। তবে মহিলারা না দৌঁড়িয়ে পায়ে হেঁটে আস্তে-ধীরে সাঈ করবে। সাফা পাহাড় থেকে আসার পর মারওয়া পর্বতের উপর আরোহণ করবে। সাফা পাহাড়ের উপর যা করেছিলে মারওয়া পর্বতের উপরও তাই করবে। এতে সাঈর এক চক্কর পূর্ণ হবে। অনুরৃপ মারওয়া পাহাড় থেকে সাফা পর্বতে গেলে আরেক চক্কর। এভাবে উভয় পাহাড়ের মাঝখানে সাতবার সাঈ করবে। সাঈ শেষ হলে ইহরাম অবস্থায় মক্কা শরীফে অবস্থান করবে এবং যখন মন চায় বাইতুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ করবে।
জিলহজ্বের ৮ তারিখ মক্কায় ফজরের নামাজ পড়ে সূর্যোদয়ের পর মিনার উদ্দেশে রওয়ানা দিবে। সেদিনকার যোহরের নামাজ মিনায় গিয়ে পড়া মুস্তাহাব। মিনাতে ৯ তারিখ ফজরের নামাজ অন্ধকারে আদায় করা পর্যন্ত অবস্থান করবে। সম্ভব হলে মসজিদুল খায়েফের কাছে অবস্থান করবে।
৯ জিলহজ্ব সূর্য উদয় হয়ে গেলে আরাফার উদ্দেশে রওয়ানা দিবে এবং সেখানে গিয়ে অবস্থান নিবে। সূর্য যখন হেলে যাবে, তখন মসজিদে নামিরাতে গিয়ে প্রধান ইমাম অথবা তার প্রতিনিধির ইমামতিতে যোহর ও আছরের নামাজ একসাথে আদায় করবে। নামাজ আদায়ের পূর্বে ইমাম দুটি খুতবা দিবেন। খুতবা মনোযোগ সহকারে শুনবে। এই যোহর ও আছরের নামাজ আদায় করা হবে এক আজান ও দুটি ইকামতের মাধ্যমে। ইমামের সাথে নামাজ আদায়ের পর অবস্থানস্থলে ফিরে যাবে। আরাফাতের পুরোটা ময়দানই অবস্থানস্থল। আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের জন্য সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ার পর গোসল করবে এবং জাবালে রহমতের কাছে অবস্থান নিবে। কিবলা অভিমুখী হয়ে তাকবীর বলবে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়বে, তালবিয়াহ পাঠ করবে এবং খাদ্যপ্রার্থীর ন্যায় দু’হাত সম্প্রসারিত করে দোয়া করবে। নিজের জন্য, স্বীয় মাতা-পিতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন ও মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করবে। দোয়ায় অধিক মনোনিবেশ করবে এবং খুব কান্নাকাটি করবে। কেননা এইদিনের দোয়া আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে থাকে।
৯ জিলহজ্ব সূর্য ডুবে যাবার পর ইমাম সকলকে নিয়ে আরাফাত থেকে মুযদালিফা এসে পৌঁছবেন। মুযদালিকায় মাগরিব ও এশার নামাজ একত্রে এক আজান ও এক ইকামতে আদায় করবে। উক্ত নামাজদ্বয়ের মাঝে নফল পড়বে না। মুযদালিফায় যাওয়ার পথে রাস্তায় মাগরিবের নামাজ পড়া জায়েয নয়। রাতে মুযদালিফায় অবস্থান নেয়ার পর ইমাম ফজরের নামাজ প্রথম ওয়াক্তে অন্ধকার থাকতেই পড়াবেন। ফজর পড়ে সকলে আল্লাহর কাছে মনোযোগ দিয়ে দোয়া করবে। ভোরের আকাশ পরিষ্কার হয়ে উঠলে সূর্যোদয়ের পূর্বেই সকলে মুযদালিফা থেকে মিনায় আসবে। মিনায় এসে অবস্থান নিবে এবং জামরাতুল আকাবার সমতলভূমিতে দাঁড়িয়ে সেখানে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করবে। কংকরগুলো মুযদালিফা অথবা রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিবে। জামরার নিক্ষেপস্থল থেকে পাথর কুড়িয়ে নেয়া মাকরুহ। পাথর নিক্ষেপের পদ্ধতি হলো-বৃদ্ধাঙ্গুলির মাথা ও তর্জনীর মাথা দিয়ে ধরবে, এরপর নিক্ষেপ করবে। এটা সহজতর পদ্ধতি এবং শয়তানের জন্য অধিক অপমানকর। ডান হাত দ্বারা পাথর নিক্ষেপ করা সুন্নত।
১০ জিলহজ্ব মিনাতে পাথর নিক্ষেপের পর হজ্বে ইফরাদ পালনকারী ইচ্ছা করলে কোরবানী করবে, মাথা মুন্ডাবে অথবা চুল ছেঁটে কছর করবে। তবে মাথা মুন্ডানোই উত্তম। মহিলারা মাথা মুন্ডাবে না; বরং কিছু চুল ছাঁটাবে। উল্লেখ্য, মাথা মুন্ডান বা চুল ছেঁটে ফেলার পর হজ্বপালনকারীর জন্য স্ত্রী সহবাস ছাড়া অন্য সব কাজ স্বাভাবিক হয়ে যাবে। সে নখ কাটতে পারবে, সুগন্ধী লাগাতে পারবে, মাথায় টুপি বা রুমাল দিতে পারবে ইত্যাদি কাজ তার জন্য জায়েয।
মিনার কার্য সম্পন্ন করে ওইদিনই অর্থাৎ, ১০ জিলহজ্ব মক্কায় ফিরবে। ওইদিন সম্ভব না হলে পরের দিন। পরেরদিন সম্ভব না হলে তার পরের দিন আসবে। মক্কায় এসে বাইতুল্লাহ শরীফ সাত চক্কর দিয়ে তাওয়াফ করবে। এই তাওয়াফকে তাওয়াফে জিয়ারত বলে। পূর্বেই উল্লেখ হয়েছে তাওয়াফে জিয়ারত হজ্বের একটি রোকন। যা অবশ্যই পালন করতে হবে। ১০, ১১, ১২ জিলহজ্ব এই তিনদিন তাওয়াফে জিয়ারতের সময়। তবে প্রথম দিনই সর্বোত্তম।
মিনায় পাথর নিক্ষেপ শেষ করে মক্কা শরীফ আসবে এবং সেখানে এসে বাইতুল্লাহ সাত চক্কর দিয়ে তাওয়াফ করবে। তাওয়াফের সময় রমল ও সাঈ করবে না যদি পূর্বে রমল ও সাঈ করে থাকে। এই তাওয়াফকে তাওয়াফে বিদা বলে। সর্বশেষ এই তাওয়াফটি মক্কার বহিরাগতদের জন্য ওয়াজিব। তাওয়াফে বিদা শেষ করে দুই রাকায়াত নামাজ পড়বে। এরপর জমজমের নিকট এসে পানি পান করবে। পানি পানের সময় বাইতুল্লাহর অভিমুখী হবে এবং পছন্দমতো নিয়ত করবে। মুস্তাহাব হলো- পানি পান করার পর কাবার দরজার কাছে চলে আসা এবং কাবার চৌকাঠে চুমো খাওয়া। এরপর মুলতাযামের কাছে যাবে। মুলতাযাম হলো- হাজরে আসওয়াদ ও কাবা শরীফের দরজার মধ্যবর্তী স্থান। মুলতাযামের উপর হাজী নিজের বুক ও চেহারাকে লাগাবে এবং কিছুক্ষণের জন্য কাবার গিলাফের সাথে লেপ্টে থাকবে। এ সময় আল্লাহর কাছে কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য পছন্দমতো দোয়া করবে। দোয়াতে বলবে- ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই এটি তোমার ঘর, যাকে তুমি সমগ্র দুনিয়াবাসীর জন্য বরকতময় ও হেদায়েতের নিদর্শন বানিয়েছে। হে আলস্নাহ। তুমি আমাকে যেভাবে এই ঘরের দিকে হেদায়েত দান করেছ, তদ্রুপ আমার এ ইবাদতও কবুল করো এবং আমার এই জিয়ারতকে তোমার ঘরের শেষ জিয়ারত বলে গণ্য করো না। আমাকে পুনরায় এ ঘরে আসার তাওফিক দান করো যাতে তুমি নিজ অনুগ্রহে আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাও। হে দয়ালুদের শ্রেষ্ঠতম দয়ালু।
হজ্বের সফরে আরেকটি গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হলো- প্রিয় নবী (সাঃ) এর রওজা জিয়ারত করা। মূল হজ্ব শুরুর পূর্বে মদীনাতে যাওয়া যেতে পারে, অথবা হজ্বের কার্যাবলী শেষ করেও যাওয়া যেতে পারে। হজ্ব প্রভু প্রেমকে জাগ্রত করে আর নবীজীর রওজা জিয়ারতের মাধ্যমে সেই প্রেমের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়। আল্লাহ সকলকে মক্কা ও মদীনার জিয়ারত নবিস করুন। আমীন।
**************************
লেখকঃ মুফতী মীযানুর রহমান রায়হান
উৎসঃ দৈনিক ইত্তেফাক, ৩০শে নভেম্বর ২০০৭