Islamic Article Archive - http://articles.ourislam.org
সাংবাদিকতার ইসলামী দৃষ্টিকোণ
http://articles.ourislam.org/articles/152/1/aaaaaaaaaaa-aaaaaa-aaaaaaaaaa/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 04/15/2008
 
কয়েক বছর আগে টাইম ম্যাগাজিনের একজন ভারতীয় রিপোর্টার ভারতের বিশিষ্ট পণ্ডিত ও গ্রন্থাকার মাওলানা ওয়াহিদ উদ্দিন খানের কাছে উপস্থিত হন এবং ইসলামে নারীর মর্যাদা বিষয়ে তার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। তিনি (মহিলা রিপোর্টার) মাওলানা সাহেবকে সাধারণ কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেন এবং প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর রেকর্ড করেন।

সাংবাদিকতার ইসলামী দৃষ্টিকোণ

কয়েক বছর আগে টাইম ম্যাগাজিনের একজন ভারতীয় রিপোর্টার ভারতের বিশিষ্ট পণ্ডিত ও গ্রন্থাকার মাওলানা ওয়াহিদ উদ্দিন খানের কাছে উপস্থিত হন এবং ইসলামে নারীর মর্যাদা বিষয়ে তার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। তিনি (মহিলা রিপোর্টার) মাওলানা সাহেবকে সাধারণ কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেন এবং প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর রেকর্ড করেন।

কয়েক সপ্তাহ পর তিনি আরো কিছু ফলোআপ প্রশ্ন নিয়ে মাওলানার কাছে ফিরে আসেন। এসব ফলোআপ প্রশ্নে তিনি মূল প্রশ্নগুলোকে ভিন্ন অর্থে অনেকটা পেঁচালো ও বিকৃতভাবে উত্থাপন করেন এবং মাওলানার দেয়া প্রশ্নোত্তর নিয়েও আলোচনা করেন। এরপর ওই সাংবাদিক তৃতীয়বার মাওলানার কাছে এলে তিনি বিস্মিত হয়ে তার এই কাজের উদ্দেশ্য কী জানতে চান। জবাবে সংশ্লিষ্ট রিপোর্টার অহঙ্কারের সাথে বলেন, ‘আপনার কাছে এতবার আসার কারণ হচ্ছে আমরা কোনো ভুল করতে চাই না’। এই জবাবে মাওলানা সাহেব এতই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে, সত্যান্বেষণ এবং নিখুঁত পেশাগত মান অর্জন করার জন্য মুসলমানদের কাছে তিনি এই ঘটনাটি একটি অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। অবশ্য ইসলামে নারীর মর্যাদাবিষয়ক নিবন্ধটি যখন চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয় তখন দেখা যায়­নিবন্ধটিতে নারীদের প্রতি ইসলামের আচরণের ব্যাপারে সচরাচর যেসব দোষারোপ করা হয়ে থাকে সেগুলোর সবই বিদ্যমান রয়েছে। টাইম ম্যাগাজিনের রিপোর্টার উল্লেখিত মুসলিম পণ্ডিত ব্যক্তিটির কাছ থেকে যত্নসহকারে যেসব উত্তর সংগ্রহ করেছিলেন তার কোনোটিই নিবন্ধটিতে স্থান পায়নি। টাইম ম্যাগাজিন হয় তো ‘প্রথমত, সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করো­ এবং এরপর সেগুলোকে যত বেশি সম্ভব বিকৃত কর’ এই প্রচারণা বা রটনানীতি অনুসরণ করে থাকে।

আসলে এ ঘটনার পুরোটাই অত্যন্ত বিচিত্র এবং কৌতূহলউদ্দীপক। বর্তমানে টাইম বিশ্বের অত্যন্ত সফল ম্যাগাজিনগুলোর একটি। এই ম্যাগাজিনটি নিয়মিত ইসলামবিরোধী প্রচারণায় লিপ্ত থাকলেও এমনকি মুসলিম দেশগুলোতেও এটাকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এখানকার একটি অনুচ্ছেদ বা একটি নিবন্ধের সাথে হয়তো মুসলমানদের বিরোধ থাকতে পারে কিন্তু তারা এখনো এই ম্যাগাজিনকে সাংবাদিকতার জন্য একটি আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করে। কী ঘটতে যাচ্ছে?

এসব জোরালো দাবি বা দৃঢ়প্রত্যয়ী বক্তব্যগুলো যাচাই করার জন্য বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে যেসব পত্রপত্রিকা এবং নিউজ ম্যাগাজিন আছে সেগুলোর ওপর একবার চোখ বোলানোই যথেষ্ট। আমরা দেখতে পাই, এসব পত্রপত্রিকা ও ম্যাগাজিনগুলো মুসলমানদের খুশি করার জন্য কেবল কিছু ধর্মীয় নিবন্ধ এবং কিছু রাজনৈতিক কমেন্ট্রি প্রকাশ করে থাকে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি ইসলামি কাঠামোর সম্পূর্ণ অনুপস্থিতির বিষয়টি উপলব্ধি করতে হলে অবশ্যই এর উদ্দেশ্য এবং দর্শনের ব্যাপারে গভীরতর প্রশ্নগুলোকে বিবেচনায় আনতে হবে। যেমন এই ইনস্টিটিউশনের আত্মা কী? কী কারণে এটা পরজীবী কীটে পরিণত হয়েছে? এর লক্ষ্য কী? ইসলামিক স্কিমে এর স্থান কোথায়? লেখালেখি এবং প্রকাশনার উদ্দেশ্য কী? সংবাদ কী সেটা কিভাবে নিরূপণ বা নির্ধারণ করা হবে? প্রিন্ট বা ছাপার উপযোগী নির্ধারণ করা হবে কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে? একটি মুসলিম সমাজে সাংবাদিকদের কী অধিকার ও দায়দায়িত্ব রয়েছে? সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কী? ইত্যাদি, ইত্যাদি।

অর্ধশত বছরেরও আগে পাকিস্তানের গ্র্যান্ড মুফতি মুফতি মোহাম্মদ শফি আদাবুল আখবার (দি নিউজ-প্রটোকল) শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি ইসলামি কাঠামো গড়ে তোলার ব্যাপারে এটা ছিল একটি ব্যতিক্রমী প্রয়াস। তিনি তার সময়ের মুসলিম পত্রপত্রিকায় এই পেশায় হালাল ও হারাম সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করার ব্যাপারকে যারা হারাম বলে মনে করতেন তাদের ব্যাপারে চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন।

ইসলামিক ভিত্তিঃ এসব বিষয়ে যারা উদ্বিগ্ন, তার নিবন্ধ তাদের জন্য কিছু গাইডলাইন (দিকনির্দেশনা) প্রদান এবং এই প্রভাবশালী পেশার একটি ইসলামি কাঠামো তৈরি করতে ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। ইসলামে সাংবাদিকতার ভিত্তি তৈরির জন্য মুফতি মোহাম্মদ শফি দু’টি হাদিসের উদ্ধৃতি দেন। প্রথমটি তিরমিজি শরিফে সংগৃহীত একটি দীর্ঘ হাদিস থেকে নেয়া হয়েছে। এতে মহানবী হজরত মোহাম্মদ সাঃ-এর দৈনন্দিন রুটিন বা কার্যক্রমের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। ‘আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম নবী সাঃ যখন বাড়ি থেকে বাইরে যেতেন তখন তার আচরণ কেমন হতো? হিন্দবিন হালা জবাবে বলেন, তিনি কোনো কিছু বলা কল্যাণকর এবং প্রয়োজনীয় মনে না করা পর্যন্ত নীরব থাকতেন ‘... এবং তিনি সাধারণত তার সঙ্গীসাথীদের কল্যাণের বিষয়ে খোঁজখবর নিতেন এবং জনগণের মধ্যকার সাধারণ ঘটনাবলির ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। এরপর তিনি এসব রিপোর্টের ব্যাপারে কোন্‌টা ভালো কোন্‌টা খারাপ সাধারণত সে ব্যাপারে মন্তব্য করতেন।

আনাস রাঃ দ্বিতীয় হাদিসটি বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী করিম সাঃ তার কোনো সাহাবিকে (সাথী) তিন দিন পর্যন্ত না দেখলে তার সম্পর্কে জানতে চাইতেন। এরপর তিনি তাঁর সাথীটি ভ্রমণে রয়েছেন বলে জানতে পারলে তার জন্য দোয়া করতেন; তিনি শহরে থাকলে নবী করিম সাঃ সেখানে গিয়ে তাঁকে দেখে আসতেন, তিনি (সাহাবি) অসুস্থ থাকলে নবী করিম সাঃ তাঁর স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজ নিতেন। মুফতি শফি বলেন, উল্লিখিত হাদিস দু’টির শিক্ষা হলোঃ উম্মাহর অবস্থা সম্পর্কে অব্যাহতভাবে সচেতন থাকা হচ্ছে সুন্নত। বর্তমান সময়ে এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যম হচ্ছে পত্রপত্রিকা বা মিডিয়া। এ ছাড়াও সরকারের কাছে সাধারণত মানুষের দুঃখ দুর্দশার বিষয়টি তুলে ধরা, মুসলমানদের অধিকার আদায়ের দাবি এবং ইসলামের বার্তা তথা ইসলামের আহ্বান বা দাওয়াত ছড়িয়ে দেয়ার জন্য পত্রপত্রিকাকে ব্যবহার করা যেতে পারে। এখানে উপলব্ধি করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নিউজ বা সংবাদ। সংবাদের অনুসন্ধান করা, সংগ্রহ করা এবং প্রকৃতপক্ষে অ্যাকশনের সম্ভাব্যতা থেকে তার অর্থ খুঁজে পাওয়া। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে একজন ভিকটিমের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা, দুর্বল ও অভাবগ্রস্তদের সহায়তা করা; রোগীদের দেখতে যাওয়া। যদি কোনো কিছুই সম্ভব না হয়­ যারা বিপদে আছে তাদের জন্য দোয়া ও প্রার্থনা করা। নতুন প্রযুক্তির কারণে আধুনিক সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও অনেক পরিবর্তন এসেছে।

মৌলিক নিয়মবিধিঃ মুফতি শফি একটি মৌলিক ইসলামি নিয়মবিধিরও বর্ণনা দিয়েছেন। যা সাংবাদিকতাবিষয়ক সব ধরনের আলাপ-আলোচনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মুখের শব্দ বা বক্তব্যকে যে আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয় সেই একই আইন দ্বারা লিখিত বক্তব্য তথা লেখাকেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কোনো ভালো কাজ বা ধর্মীয় কাজ হলে তা লিখে প্রকাশ করা যায়। এ ক্ষেত্রে এটা যদি হারাম হয় তাহলে একইভাবে অন্য ক্ষেত্রেও সেটি হারাম হবে। প্রকৃতপক্ষে, লিখিত শব্দ তথা লিখিত বক্তব্য বা বিষয়ের স্থায়িত্ব হয় দীর্ঘ এবং বৃহত্তর পরিসরে সেটা পৌঁছতে পারে। তাই লেখার মাধ্যমে বড় ধরনের ভালো বা বড় ধরনের মন্দ কাজ সম্পন্ন করা যায় এবং এ জন্য আনুপাতিকভাবে বৃহত্তর পুরস্কার অথবা শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে। ইসলামী শরিয়তে প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত স্বাভাবিক আচরণবিধির ক্ষেত্রে যেকোনোভাবে সাংবাদিকদের জন্য কিছুটা শিথিলতা বা ছাড় দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ গিবৎ করা কেবল সাধারণ মানুষের জন্যই নিষিদ্ধ নয় তবে সাংবাদিকদের জন্য কোনো না কোনোভাবে অনুমতিসাপেক্ষ। স্মরণ করা যেতে পারে, শরিয়তে বিস্তারিত নিয়মবিধির বর্ণনা দেয়া হয়েছে যা একজন মুসলিমকে অবশ্যই মেনে চলতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কুরআনে অন্য লোকদের ব্যাপারে হাসি-ঠাট্টা বা তামাসা করতে নিষেধ করা হয়েছে। ‘হে ঈমানদারগণ, পুরুষরা যেন অন্য পুরুষদের বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। আর মহিলারাও যেন অন্য মহিলাদের বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অপরকে বিদ্রূপ করো না এবং পরস্পরকে খারাপ নামে ডেকো না।’ [আল-হুজরাত ৪৯ঃ১১] এটা হচ্ছে একটা সাধারণ প্রয়োজন এবং কোনো ব্যক্তি কলামিস্ট হওয়ার কারণেই কেবল তাকে এই নিয়মবিধির বাইরে রাখা যায় না। একজন কলামিস্ট আরও অধিক পরিমার্জিত ভাষায় বৃহত্তর পরিসরে এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। অধিকন্তু প্রাইভেসি বা গোপনীয়তার অধিকার হচ্ছে একটি পবিত্র মানবাধিকার। সাংবাদিকসহ যে কেউ এটা লঙ্ঘন করতে পারে না। আল্লাহ্‌র আইন রাজকুমারী অথবা ভিখারি যেই হোক না কেন সবার ওপর প্রযোজ্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতালা বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! নিজেদের গৃহ ছাড়া অন্যের গৃহে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না গৃহবাসীদের সম্মতি লাভ করো এবং তাদেরকে সালাম করো। এটিই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম পদ্ধতি, আশা করা যায় তোমরা এদিকে নজর রাখবে।’ [আন-নূর ২৪ঃ২৭]
একইভাবে মিথ্যা অভিযোগ আনা সাধারণ লোকদের জন্য যেমন গোনাহর কাজ তেমনিভাবে লেখকদের জন্যও এটা গোনাহর কাজ। অন্যের গোনাহ গোপন রাখার বিষয়টি যেকোনো মুসলমানের ক্ষেত্রে যেভাবে প্রযোজ্য একজন রিপোর্টারের জন্য সেটি আরও বেশি প্রযোজ্য। শরিয়তে এই বিষয়টির ওপর খুব জোর দেয়া সত্ত্বেও বর্তমানে সাধারণত এসব বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়।
একটি হাদিসে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি তার ভাইয়ের গোনাহ বা পাপ গোপন করলে, আল্লাহ বিচারের দিনে তার গোনাহগুলো গোপন রাখবেন। কোনো ব্যক্তি তার ভাইয়ের পাপ বা গোনাহর পেছনে ছুটলে এবং সেগুলো প্রকাশ করে দিলে, আল্লাহ তার গুনাহগুলো প্রকাশ করে দেবেন এমনকি সে নিজের বাড়িতে লুকিয়ে থাকলেও’। এই একটি হাদিসই ট্যাবলয়েড পত্রিকার ভিত্তি ধ্বংস বা নষ্ট করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।

অন্যান্য গাইডলাইনঃ আদাবুল আখবারে­ অন্যান্য গাইড লাইন রয়েছে। কোনো ব্যক্তি সে মুসলিম অমুসলিম যা-ই হোক না কেন তাকে অন্যায়ভাবে দোষারোপ বা অভিযুক্ত করা যাবে না। ভিক্‌টিম বা অন্যায়ভাবে দুঃখকষ্টের শিকার কোনো ব্যক্তির তার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করার এবং আগ্রাসী শক্তিকে অভিযুক্ত করার অধিকার রয়েছে।

পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে এর অনুমতি দেয়া হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘মানুষ খারাপ কথা বলে বেড়াক, এটা আল্লাহ পছন্দ করেন না। তবে কারো প্রতি জুলুম করা হলে তার কথা স্বতন্ত্র। আর আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন।’ আন-নিসা ৪ঃ১৪৮

সুতরাং, দুঃখ-দুর্দশা বা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করার অনুমতি রয়েছে। যান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকতার বিবর্তনের বিষয়টি জানার জন্য প্রয়োজনে আমরা ব্রিটেনিকায় গভীরভাবে নজর দিতে পারি। দু’টি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন তথা প্রিন্টিং প্রেস এবং টেলিগ্রাফের ফলে আধুনিক সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু হয়েছে। এই দু’টি প্রযুক্তি একত্রে অবিশ্বাস্য গতিতে বিশাল দূরত্বের তথ্যসম্ভার নিয়ে সংবাদপত্র প্রকাশকে সম্ভব করে তুলেছে। এ ধরনের প্রথম ঘটনা ঘটে জার্মানিতে এবং অন্য ঘটনা ঘটে যুক্তরাষ্ট্রে। নেইল পোস্টম্যান ’অশৎঢ়মষব সৎড়ঢ়পলংপঢ় য়স নপথয়ভ’ ( ১৯৮৫)-এ বর্ণনা দেন।
এটা ছিল আমেরিকায় সংবাদপত্র বিষয়ক অগ্রগতি (১৮৪৪)। এর মাধ্যমে বিশাল সাকুêলেশনের দৈনিক পত্রিকাই প্রকাশ করা সম্ভব হয়। গোটা বিশ্বের খবরাখবর লিখে এই পত্রিকা প্রকাশ করা হয়, যেটাকে ‘দি নিউজ অব দ্য ডে’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। নেইল পোস্টম্যান যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘কনটেক্সট ফ্রি ইনফরমেশনের ধারণার প্রতি টেলিগ্রাফ বৈধতা দিয়েছে।
অর্থাৎ তথ্যমূল্য বা তথ্যের গুরুত্ব যেকোনো অনুষ্ঠানের সাথে সংযুক্ত বা সংশ্লিষ্ট কথার প্রয়োজন নেই। যাতে সামাজিক এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যক্রমের ক্ষেত্রে তথ্য ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কেবল এর মহানুভবতা, আগ্রহ এবং কৌতূহল সংযুক্ত করা যেতে পারে। আমাদের দৈনন্দিন সংবাদের সাথে এমন সব সমন্বিত তথ্য থাকে যা আমাদেরকে কিছু বিষয়ে কথা বলতে অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু কোনো অর্থবহ কার্যক্রম গ্রহণের দিকে পরিচালিত করে না।’
টেলিগ্রাফ সম্পর্কে এখানে কিছু জোরালো প্রযুক্তিগত বিতর্কের বিষয় তুলে ধরা হলো। পত্রিকাটি প্রচুর অপ্রাসঙ্গিক বা অবান্তর তথ্যের মাধ্যমে সংবাদ পরিবেশন করে। পোস্টম্যান যেটা এড়িয়ে গেছেন সেটা হচ্ছে, টেলিগ্রাফ এমন একটা সমাজে বিকশিত হয় এবং প্রথম কাজ শুরু করে যেখানে ইনফরমেশন অ্যাকশন রেশিয়োর (ওহভড়ৎসধঃরড়হ অপঃরড়হ জধঃরড়) ব্যাপারে কোনো পুরস্কার দেয়া হতো না এবং সেখানে গল্পগুজব, বাজে কথা, স্ক্যান্ডাল এবং কুৎসা রটনার বিষয় নিয়ন্ত্রণে রাখার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বরং সেখানে এসব পণ্যের জন্য অসংখ্য চমকপ্রদ বাজার রয়েছে, সমাজ যেসব কাজ যেকোনোভাবে করতে চায় টেলিগ্রাফ কেবল সেগুলোকে সহজতর করেছে। যারা এই পথ প্রদর্শন করেছেন তারাই এই মার্কেটকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। তাদের একজন হচ্ছেন জোসেফ পুলিৎজার। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পুলিৎজার পুরস্কার হচ্ছে একজন সাংবাদিকের জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক পুরস্কার। পুলিৎজার তিন বছরের মধ্যে নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের সাকুêলেশন ১৫ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজারে উন্নীত করেছিলেন। এটা ছিল সে সময়ে বিশ্বের সর্বাধিক সাকুêলেশন। তিনি কিভাবে সেটা করেছিলেন? ব্রিটানিকা থেকে জানা যায়, ‘পুলিৎজার যেন সেনসেশনালিজম ও আইডিয়ালিজমের প্রতিষ্ঠিত ফর্মুলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করেন এবং ব্যাপকভাবে চটকদার ও তাক লাগানো পন্থায় প্রচারণা চালান। এ কাজের ক্ষেত্রে আরো একজন পথ প্রদর্শক ও অত্যন্ত সফল ব্যক্তি হলেন উইলিয়াম হেয়ার্স্ট। ব্রিটানিকার মতে, তিনি যেকোনো মূল্যে সাকুêলেশন বৃদ্ধি করা সংক্রান্ত সেনসেশনে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। এমনকি সম্পূর্ণ মিথ্যা কাহিনীকেও বিশেষভাবে সাজিয়ে সংবাদ হিসেবে পরিবেশন করতেও তিনি দ্বিধা করতেন না।’ নজিরবিহীন বাণিজ্যিক সফলতা অর্জনের জন্য ‘দি পেনি প্রেস অ্যান্ড দ্য ট্যাবলয়েড’ একই ফর্মুলা ব্যবহার করে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এজেন্ডা বলবৎ করার জন্য প্রযুক্তির হাতে রয়েছে নতুন পথ। এ ক্ষেত্রে এয়ারহোস্টেস তথা বিমানবালাদের কথা বলা যায়। তাদেরকে বিমানে নিয়োগ দেয়ার পর কোনো প্রতিবন্ধকতা বা প্রশ্ন উত্থাপন ছাড়াই মুসলিম বিশ্ব এটা অনুমোদন করে নিয়েছে। পত্রিকাটিকেও অন্ধসমর্থক গোষ্ঠী ও ভক্তরা স্বাগত জানিয়েছে।
পয়সা আখবার এবং...ঃ দি পেনি প্রেস ব্রিটিশ ভারতে পয়সা আখবারকে অনুপ্রাণিত করে। গোটা মুসলিম বিশ্বে মুসলমানরা কেবল প্রিন্টিং প্রেস এবং ওয়ার সার্ভিসই (এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি) অর্জন করেনি­ বরং তারা তাদের সংবাদপত্রের জন্য পশ্চিমাদের কাছ থেকে সংবাদপত্রের নাম এবং দৃষ্টিভঙ্গিও গ্রহণ করেছে। অধিকন্তু তারা পশ্চিমাদের কাছ থেকে ‘সংবাদের’ সংজ্ঞা কি তাও গ্রহণ করেন। এটা বলা যায় যে, পশ্চিমাদের কাছে কিছু নতুনত্ব বা অভিনবত্ব ছাড়া সংজ্ঞা দেয়ার মতো বেশি কিছু নেই। ‘(মানুষ কুকুরকে কামড়ায়)’ অথবা ঔৎসুক্য ‘(আমরা আজকে যা জানি গতকাল তা জানতাম না।)’ ভিকটিম হচ্ছে সংবাদপত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একটি রিপোর্ট সঠিক হলেও যদি দেখা যায়, সেটি প্রকাশ হলে সমাজের স্বার্থহানি তথা সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাহলে সেটা প্রকাশ করা উচিত নয়। শরিয়ত কর্তৃক কোনো আইটেম নিষিদ্ধ হওয়ার প্রশ্ন দেখা দিলে সে সংক্রান্ত কোনো পণ্য বা সার্ভিসের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা যাবে না। ক্রাইম বা অপরাধ সংক্রান্ত রিপোর্ট যেগুলো এখনকার সংবাদপত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বা মজার বা রসালো অংশ সেগুলো সম্পর্কে অন্যত্র মুফতি শফি বলেছেন, এ ধরনের রিপোর্ট প্রকাশ করার অনুমতি দেয়া যায় না। তিনি বলেন, অপরাধের বিস্তারিত বর্ণনা কেবল অপরাধীকে উৎসাহিত করে। অপরাধকে নিরুৎসাহিত করার সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়েই কেবল অপরাধ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা উচিত। মুফতি শফি বলেন, এটা করার একটা পথ আছে­ সেটা হচ্ছে অপরাধের শাস্তিসংক্রান্ত সংবাদসহ অপরাধ বিষয়ক সংবাদটি প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে সমাজের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি মেসেজ বা বার্তা পৌঁছে যাবে এবং এর ফলাফল হবে­ অপরাধীরা অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িত হওয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়বে।

সাংবাদিকতার জন্য একটি ইসলামিক সেন্টারঃ সামান্য একটি ঘটনা বা বিষয় দিয়ে টাইম অথবা পশ্চিমা মিডিয়ার প্রতি মুসলমানদের ভালোবাসা বা ঘৃণা যে ধরনের সম্পর্কই হোক না কেন তা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যেমন পশ্চিমারা সাংবাদিকতাকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করে সেটাকেই সাংবাদিকতার সর্বোত্তম উদাহরণ হিসেবে মনে করা হয়ে থাকে। মুসলমানরা যখন আঘাত পায় তখন ব্যথা অনুভব করে। কিন্তু সাংবাদিকতার জন্য তাদের নিজেদের কোনো কাঠামো, সংবাদকে সংজ্ঞায়িত করার নিজস্ব কোনো পদ্ধতি এবং সংবাদ প্রকাশের বিষয়টিকে যাচাই করার জন্য নিজস্ব কোনো মানদণ্ড বা ক্রাইটেরিয়া নেই। তারা এসব কিছু পশ্চিমাদের কাছ থেকে ধার করেছে। তারা বুঝতে পারে কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে কিন্তু সেটা চিহ্নিত করতে পারে না। কারণ তারা যেসব মানদণ্ড ব্যবহার করে সেগুলোর সবই ধার করা। এই প্রেক্ষাপটে এটা হচ্ছে সমসাময়িক মুসলিম সমাজের বৃহত্তর সমস্যার অংশ। এই অবস্থায় অন্যান্য ক্ষেত্রে যেখানে অগ্রগতি হয়েছে সেখান থেকে আমরা কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামি অর্থনীতির কথা বলা যায়। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের কিছু করা প্রয়োজন। ওলেমা বা আলেম সমাজ এবং ইসলামের ব্যাপারে আন্তরিক সাংবাদিকদের দ্বারা ইসলামিক সাংবাদিকতা বিষয়ক একটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা যায়। এভাবে ইসলামি চিন্তাবিদ বা পণ্ডিত ব্যক্তি এবং পেশাজীবী সাংবাদিকদের মধ্যে ইতিবাচক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ইসলামিক সাংবাদিকতা বিষয়ক একটি কাঠামোর উন্মেষ ঘটানো যায়। এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ না করা পর্যন্ত মুসলমানরা সংবাদপত্র এবং ম্যাগাজিন প্রকাশ করলেও তারা একটি ইসলামি মিডিয়া গড়ে তুলতে পারবে না এবং এ কারণে গোটা বিশ্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

**************************
খালিদ বেগ
অনুবাদঃ মুহাম্মদ খায়রুল বাশার
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১১ এপ্রিল ২০০৮