Islamic Article Archive - http://articles.ourislam.org
মিরাস বণ্টনে আল্লাহর সীমারেখা
http://articles.ourislam.org/articles/153/1/aaaaa-aaaaaa-aaaaaaa-aaaaaaaa/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 04/12/2008
 
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদিত ‘নারী উন্নয়ন নীতি-২০০৮’-এর অধীনে নারীর উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে সমান অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। (সূত্র নয়া দিগন্ত ৩ মার্চ) যদি এমনটি করা হয় তবে তা কুরআন পরিবর্তন শামিল এবং আল্লাহর আইনের সুস্পষ্ট সীমা লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে। এ ধরনের উদ্ভট বিষয় বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, বরং যারা এ চিন্তা মাথায় এনেছেন, তারা আল্লাহর গজবে নিপতিত হওয়ার মতো একটি বিষয় মাথায় এনেছেন। মনে হচ্ছে এর পেছনে গভীর কারণ ষড়যন্ত্র কাজ করছে।

মিরাস বণ্টনে আল্লাহর সীমারেখা

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদিত ‘নারী উন্নয়ন নীতি-২০০৮’-এর অধীনে নারীর উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে সমান অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। (সূত্র নয়া দিগন্ত ৩ মার্চ) যদি এমনটি করা হয় তবে তা কুরআন পরিবর্তন শামিল এবং আল্লাহর আইনের সুস্পষ্ট সীমা লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে। এ ধরনের উদ্ভট বিষয় বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, বরং যারা এ চিন্তা মাথায় এনেছেন, তারা আল্লাহর গজবে নিপতিত হওয়ার মতো একটি বিষয় মাথায় এনেছেন। মনে হচ্ছে এর পেছনে গভীর কারণ ষড়যন্ত্র কাজ করছে। এক-এগারো সরকার ক্ষমতা আরোহণের পর থেকে ঘাপটি মারা একটি গোষ্ঠী বিভিন্ন সময় এমন সব উদ্ভট চিন্তা ও বিষয় সরকারের দৃষ্টির সামনে উপস্থাপনের চেষ্টা করে আসছে, যা এ দেশের অধিকাংশ মানুষের চিন্তাচেতনা, কৃষ্টি-কালচার ও ফিতরাতের সম্পূর্ণ বিপরীত। তবে এক-এগারো সরকারের উদ্দেশ্যে প্রথমেই বলে নিতে চাই, যে কেউ স্বাধীনভাবে যেকোনো আদর্শ পোষণ করতে পারেন, কিন্তু তিনি যখন দেশের দায়িত্বে থাকেন, তখন তাকে অবশ্যই দেশের অধিকাংশ মানুষের অভিমত ও আদর্শকে মূল্যায়ন করতে হবে। ধনসম্পদের ব্যাপারে প্রাথমিক বা মৌলিক কথা হলো এর প্রকৃত মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। দ্বিতীয়ত, মানুষ কেবল বৈধ ভোগ ব্যবহারের অনুমতিসহ এর আমানতদার বা ট্রাস্টি মাত্র। যেহেতু সম্পদের মূল মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন, তাই তিনিই একমাত্র এর বণ্টনের অধিকার রাখেন। তিনি আল-কুরআনের মাধ্যমে এর সুষম ও ইনসাফভিত্তিক বণ্টনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সুতরাং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের ইচ্ছামতো পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে সম্পদ বণ্টন করার অধিকার রাখেন না। কারণ মানুষের মস্তিষ্ক তৈরি বণ্টনব্যবস্থায় কখনো ন্যায়-ইনসাফ ও সুষম বণ্টন নিশ্চিত হতে পারে না। আল্লাহতায়ালা সবচেয়ে বেশি ন্যায়বান। তাই নবী করিম সাঃ বলেছেন, ‘ধন-সম্পদকে উহার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী বণ্টন কর।’ (মুসলিম) মহান আল্লাহতায়ালা সূরা নিসার ৭, ১১-১৪, ৩৩ ও ১৭৬ নম্বর আয়াতগুলোয় মৃত ব্যক্তির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের উত্তরাধিকার ও তাদের অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
ইসলামে মিরাসি আইনের গুরুত্ব অপরিসীম। এ আইনের মাধ্যমে ধন-সম্পদের আবর্তন বংশানুক্রমিকভাবে অনন্তকাল চলতে থাকবে। ব্যক্তির নিজের জীবনে যেসব লোকের সাথে বৈষয়িক কিংবা আত্মিক অথবা রক্তের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, তার মালিকানায় ধন-সম্পত্তি তার মৃত্যুর পর ওই সব লোকের মধ্যে সুনির্দিষ্ট নিয়মানুসারে বণ্টিত হবে। পাশ্চাত্যের এক আইনজ্ঞ লিখেছেনঃ ‘আধুনিক সভ্য পৃথিবী ধন বণ্টনের যত নিয়ম ও পন্থা আবিষ্কার করতে পেরেছে, ইসলামের উত্তরাধিকার আইন তন্মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক বৈজ্ঞানিক ও নির্ভুল। এ আইনের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও নিখুঁত সামঞ্জস্য অপরিসীম।’ রাসূল সাঃ বলেছেনঃ ‘উত্তরাধিকার আইন নিজেরা শিখ, মানুষকে শিক্ষা দাও। কারণ ইহা ইসলাম সম্পর্কীয় যাবতীয় জ্ঞানের অর্ধেক।’ (তিরমিযি, ইবনে মাযাহ)

কোনো মুসলমান মৃত্যুবরণ করার পর তার পরিত্যক্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তার ছেলে ও মেয়ে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের জন্য কুরআনের নির্দেশনা হলোঃ আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, পুত্র দুই কন্যার অংশের সমান পাবে, আর যদি কন্যা দুইয়ের অধিক হয় তবে পরিত্যক্ত সম্পত্তির তিন ভাগের দুই ভাগ পাবে। একমাত্র কন্যা হলে অর্ধেক পাবে। মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে পিতা-মাতা (প্রত্যেকে) ছয় ভাগের এক ভাগ পাবে। আর যদি মৃত ব্যক্তির সন্তান না থাকে এবং পিতা-মাতাই উত্তরাধিকারী হয়, তাহলে মাতার প্রাপ্য এক-তৃতীয়াংশ। আর যদি মৃত ব্যক্তির একাধিক ভাই-বোন থাকে, তাহলে মাতা এক-ষষ্ঠাংশ পাবে।’ (সূরা নিসাঃ ১১)

উল্লিখিত আয়াতের আলোকে এক-এগারো সরকারকে বলতে চাই আল্লাহর আইনে হাত না দিয়ে বরং নিুলিখিত অনিয়মগুলোর ব্যাপারে আইন করুন, তাতে নারী জাতি আর্থিকভাবে লাভবানসহ নারী নির্যাতনের হার বহুলাংশে কমে যাবে।

পরামর্শগুলোঃ ১. প্রায়ই দেখা যায় যে, ব্যক্তি জীবিত থাকতেই কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যেমন­ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হলে, হজে গমনকালে, বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছলে অথবা অধিক মুনশিয়ানা প্রকাশ করার নিমিত্তে সম্পত্তি ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। এটি ঠিক নয়। কারণ উত্তরাধিকার কারো জীবিতাবস্থায় হয় না। উত্তরাধিকার বলতে বোঝায় একজনের অনুপস্থিতিতে অন্যের অধিকার লাভ। কোনো কোনো সময় দেখা যায় যে, অতি ভালোবাসার বশবর্তী হয়ে আদরের সন্তানকে ধন-সম্পদ লিখে দিয়ে নিজেকে অন্যের অনুগ্রহের পাত্র হতে হয়। আবার এমন অপাত্রে ধন-সম্পদ তুলে দেয়া হয় যে, সে পাত্রটি অল্প কিছু দিনের মধ্যেই অসামাজিক কাজে ব্যয় করে ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। সুতরাং জীবিত অবস্থায় সম্পদ বণ্টন করা ঠিক নয়। অনেকে আবার মনে করেন যে, কন্যারা স্বামীর বাড়িতে ধন-সম্পদ নিয়ে যাবে, এ ভয়ে জীবিতাবস্থায় সব সম্পদ ছেলেদের নামে দলিলপত্র করে দেয় অথবা কোনোক্রমে সামান্য কিছু দিয়ে বিদায় করে দেয়া হয়। এটিও একটি মারাত্মক অন্যায় ও ইসলামি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
২. অনেক সময় লক্ষ করা যায় যে, পিতা-মাতার মৃত্যুর পর ছেলে উত্তরাধিকারীর বিভিন্ন কলা-কৌশল অবলম্বন করে মৃত ব্যক্তির মেয়ে উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করে থাকে। কোনো কোনো এলাকায় মেয়েরা ওয়ারিশ গ্রহণ করবে, এটিকে ঘৃণার বিষয় মনে করা হয়। সমাজের সুবিধাবাদী লোকরাই মূলত নিজেদের বদমতলব চরিতার্থ করার জন্য এ ধরনের একটি কুপ্রথা গড়ে তুলেছে। তারা এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করে যার দরুন মেয়েটি তার অংশ নিতে আর এগিয়ে আসে না। এসব লোক দুষ্ট, লোভী ও স্বার্থপর। বোনদের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাতের দরুন অবশ্যই এদের আল্লাহর বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বোন মনে করে যে, অংশ চাইতে গেলে ভাই রাগ করবে অথবা ভাইয়ের সাথে মন কষাকষি হবে। ফলে সে তার অংশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় অথবা চক্ষুলজ্জায় মাফ করে দেয়। এদিকে ধূর্ত ভাইটি নীরব ভূমিকা পালন করতে থাকে। এক সময় দেখে যে, বোনটি আর তার অংশ দাবি করছে না। প্রসঙ্গক্রমে হয়তো জানতে পেরেছে যে, বোন মাফ করে দিয়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন এ ধরনের মাফ ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। এ ক্ষেত্রে ভাইয়ের কর্তব্য হবে যেহেতু আদরের বোনটি নিজের অংশ চাইতে লজ্জা পাচ্ছে, তাই স্বেচ্ছায় বোনের অংশ ভাগ করে তাকে বুঝিয়ে দেয়া।
৩. মাঝে মধ্যে এমনটি হতে দেখা যায় যে, নিঃসন্তান ব্যক্তি জীবিতাবস্থায় সব সম্পত্তি স্ত্রীকে লিখে দেয়, এটি অবৈধ। পক্ষান্তরে মৃত ব্যক্তিটির সন্তান না থাকায়, তার ভাইয়েরা তার অসহায় স্ত্রীকে তার প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করে অথবা নামমাত্র মূল্যে ক্রয় করে তাকে স্বামীর ভিটেমাটি ছাড়া করে। এটি মানবতার সাথে মারাত্মক অসদাচরণ।
৪. কারো শুধু একটি অথবা দু’টি মেয়ে আছে, সে মনে করে যে, এরা অর্ধেক অথবা দুই-তৃতীয়াংশ পাবে, বাকি সম্পত্তি অন্যেরা নিয়ে যাবে এটি কি করে হয়। তাই জীবিতাবস্থায় সব সম্পত্তি তাদের নামে লিখে দেয়া হয়। এটি আল্লাহর আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আবার যারা আল্লাহর আইনটি সম্পর্কে অল্পবিস্তর জানেন, তারা আবার জায়েজ করার নিমিত্তে তসবিহ, এক যিল কুরআন শরীফ ও একখান জায়নামাজের পরিবর্তে সব সম্পত্তি লিখে দেন। এখানে নিয়মের ওপর আমি হামলা করতে চাই না। তবে বুখারী শরীফের প্রথম সেই হাদিসটি যা নিয়তের ব্যাপারে বলা হয়েছে তা স্মরণ করার অনুরোধ করব।

৬. এতিমের মাল আগুন। অপরিণামদর্শী কিছু কিছু লোককে এ আগুন নিয়েও খেলা করতে দেখা যায়। এতিম এবং নাবালেগ উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তি মৃত ব্যক্তির প্রভাবশালী আত্মীয়-স্বজনরা বিভিন্ন কলা-কৌশল অবলম্বন করে আত্মসাৎ করে। এদের বলব আপনি যদি আপনার চক্ষুশীতলকারী আদরের শিশু সন্তানটি নিয়ে একটু এভাবে চিন্তা করেন যে, আপনার অনুপস্থিতিতে সে কী কী অভাবের সম্মুখীন হবে। তাহলে একজন এতিমের মর্মস্পর্শী হৃদয়ের অব্যক্ত কান্না আপনার বিবেককে অবশ্যই ব্যথিত করবে, আপনার উপলব্ধির করুণ মর্মবেদনা আপনার চোখকে অশ্রুসিক্ত করবে। এতিমের মালের ব্যাপারে আল্লাহর বাণী শুনে নিনঃ ‘নিশ্চয়ই যারা এতিমদের মাল অন্যায়ভাবে ভোগ করে, তারা নিজেদের পেট শুধু অগ্নি দ্বারা ভর্তি করছে এবং শিগগিরই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করবে।’ (নিসাঃ ১০) আল্লাহতায়ালা আরো বলেন, ‘এতিমদের তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দাও। উত্তম মালামালের সাথে খারাপ মালামালের বিনিময় করো না এবং তাদের সম্পদকে নিজেদের সম্পদের সাথে সংমিশ্রণ করে, তা গ্রাস করো না। নিশ্চয় এটা বড় ধরনের পাপ।’ (নিসাঃ ২)

আমাদের সমাজ-সংসারে প্রচলিত উল্লিখিত নিষিদ্ধ কাজগুলো বন্ধ করার জন্য সরকারকে বিশেষভাবে অনুরোধ করব। আবারো মনে করিয়ে দিতে চাই তা না করে আল্লাহর আইন ও আল কুরআনে হাত দেয়া মানে হাতকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করার শামিল। আল-কুরআনে মিরাসি আইন বর্ণনা করার পর বলা হয়ঃ ‘এগুলো হলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, তাকে আল্লাহ এমন বাগিচায় প্রবেশ করাবেন, যার নিুদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হবে, সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানি করবে এবং তার নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করে যাবে, আল্লাহ আগুনে ফেলে দেবেন। সেখানে সে থাকবে চিরকাল, আর তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনা ও অপমানজনক শাস্তি। (সূরা নিসাঃ ১৩-১৪) অতএব, মিরাসে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করুন।

**************************
জাফর আহমাদ
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১১ এপ্রিল ২০০৮