ইসলামে মানুষের অধিকারকে সুনিশ্চিত করা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে সৃষ্টির মধ্যে মানুষ হচ্ছে সেরা আশরাফুল মাখলুকাত, তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সুন্দরতম গঠন ও উপাদানে। প্রতিটি মানুষ পৃথিবীতে রাব্বুল আলামিনের প্রতিনিধি। মানুষের নিজ নিজ ক্ষেত্র ও এলাকায়। গোটা সৃষ্টিকেই তো তার অধীন করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু পরিবেশের কারণে সে হতে পারে পতিত অধমেরও অধম, তাকে এই পতন থেকে বাঁচানোর জন্য, সে যাতে তার মর্যাদার উপযোগী দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সক্ষম হয় তার জন্য তার শারীরিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক, মানবিক স্বাভাবিক ঠিকানার জন্য ইসলাম কতকগুলো মৌলিক অধিকার ঘোষণা করেছে। অধিকার যে বা যারা রক্ষা করবে তারা বা তাদের দিক থেকে রয়েছে দায়িত্ব ও কর্তব্য। কর্তব্যের তাগিদ থেকেই অধিকারগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রথমেই ধরা যাক সাম্যের সমতার অধিকারের কথা। অন্য সবার সমান হিসাব নীতিগতভাবে গণ্য হওয়ার অধিকার প্রত্যেকের। আরাফাতের ময়দানে বিদায় হজের ভাষণে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন, হে মানবমণ্ডলী। তোমাদের আল্লাহ এক এবং তোমাদের প্রত্যেকের পিতা এক। এখন থেকে যারা আরবি নয় তাদের ওপর আরবদের কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর গৌরবর্ণ লোকদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব থাকবে না। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর দরবারে অধিকতর সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া অবলম্বন করে। তিনি আরো ঘোষণা করলেন, শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হচ্ছে তাকওয়া।
মানুষের বাঁচার অধিকার, প্রাণের অধিকার,আল কুরআনের একটি মৌল ঘোষণা। আল কুরআন বলেন, নরহত্যা বা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজের অপরাধ ছাড়া, অন্য কোনো কারণে কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকেই হত্যা করল, আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষেরই প্রাণ রক্ষা করল।
প্রাণ অধিকারের মধ্যেই স্বীকৃত হয়েছে মানুষের সম্পদের অধিকার। কাউকে তার পরিশ্রমলব্ধ উপার্জন থেকে বঞ্চিত করা চলবে না। কুরআনের ঘোষণাঃ পুরুষ যা অর্জন করে তা তারই প্রাপ্য, আর নারী যা অর্জন করে তা নারীরই।
বিদায় হজের ভাষণে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ তোমাদের একের রক্ত, মান ইজ্জত, ধন সম্পদ অপরের কাছে আজকের এই দিনটির, এই মাসটির মতো, এই নগরীর মতো পবিত্র।
অভাবগ্রস্তের হক স্বীকৃত হয়েছে বিত্তবানের সম্পত্তিতে, বলেছেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। অভাবগ্রস্তদের প্রাপ্য হক অবশ্যিই শোধ করতে হবে।
আবাসগৃহ ও আরাম-আয়েশের অধিকার রয়েছে প্রত্যেকটি আদম সন্তানের। এ বিষয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ঘোষণা নিুরূপঃ তিনটি বিষয়ে বনি আদমের রয়েছে মৌলিক অধিকার বসবাসের জন্য একটি বাড়ি, দেহ আবৃত্ত করার জন্য একখানা কাপড় এবং একটুকরা রুটি ও কিছু পানি।
প্রয়োজনবোধে দেশত্যাগ ও বিদেশে আশ্রয় গ্রহণের অধিকার স্বীকার করে ইসলাম। আল্লাহর জমিন প্রশস্ত এবং আল্লাহর পৃথিবী, আল্লাহর আইনে সব মানুষের জন্যই উন্মুক্ত। কেউ আল্লাহর পথে দেশত্যাগ করলে সে দুনিয়ায় পাবে বহু আশ্রয়স্থল এবং প্রাচুর্য। (আল কুরআন ৪:১০০)
মুশরিকদেরও অধিকার থাকবে মুসলিম সমাজে আশ্রয় গ্রহণের। (কুরআন ৯:৬) প্রকাশ্য অপমান ও গিবত থেকে মুক্ত থাকার অধিকার, গৃহের গোপনীয়তা রক্ষা করার অধিকার আল কুরআন স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। অন্যের গিবত করা যাবে না। অনুমতি ছাড়া অন্যের গৃহে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ (২৪: ২৭-২৮ঃ কুরআন)
গোপনে কোনো লোক তার ভাইয়ের চিঠিপত্র লুকিয়ে পড়লে, তাও গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। (আবু দাউদ)
প্রতিটি নাগরিকের ন্যায়বিচার ও সুবিচার পাওয়ার অধিকার সংরক্ষিত হয়েছে কুরআনে এবং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ্তে। (কুরআন ৫ঃ৫৮)
পক্ষপাতহীন আইনের শাসন ইসলামি জীবন-দৃষ্টির বৈশিষ্ট্য। আইনের দৃষ্টিতে সবার সমানাধিকারের প্রতি খুলাফায়ে রাশেদিনের জীবনেও এমন সূক্ষ্মভাবে অনুসৃত হয়েছিল যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রায় খলিফাদের বিরুদ্ধে পর্যন্ত গিয়েছে। আইনে সুবিচার পাওয়ার অধিকার প্রত্যেকটি নাগরিকের। (কুরআনঃ ৩৮ঃ ২৬)
ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশি নয়, পরামর্শ ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কাজ করার অধিকার যেমন জনগণের একটি মৌলিক অধিকার (৪২ঃ ৩৬: ৩৮) তেমনি ইজতিহাদ বা ব্যক্তিগত বিচার বিশ্লেষণের অধিকার একটি স্বীকৃত অধিকার। (২৯:৬৯)
অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান যে কেবল রাষ্ট্র করবে তা নয়, সমাজ এবং সমর্থ ব্যক্তির ওপরও রয়েছে এ দায়িত্ব। এসব অধিকার আদায় ও দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ সম্মানজনক জীবনযাপন ও মনুষ্যত্ব বিকাশের সুযোগ পায়, সমাজ হয়ে ওঠে একটি আদর্শ সমাজ।
দাস মুক্তির ব্যাপারটিই একই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে হবে। অর্থনৈতিক, সামাজিক বা ঐতিহাসিক কারণে কেউ দাসের জীবনযাপন করতে সাধ্য হলেও দাসরাও মানুষ, তারাও আল্লাহর বান্দা। মানবোচিত ব্যবহার পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম দাস মুক্তিকে সবচেয়ে সওয়াবের কাজ বলে ঘোষণা করেন। তিনি বলেছেন, যারা দাস খরিদ করে তারা একান্তই দুরাত্মা। যারা মানুষ কেনাবেচার কারবার করে তারা মজ্জাগতভাবে দুবৃêত্ত, পাষণ্ড। বিচারের দিনে আমি তিন শ্রেণীর লোকের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাব। একঃ চুক্তি করে যারা চুক্তি ভঙ্গ করে, দুইঃ যারা স্বাধীন মানুষকে দাস বানিয়ে বিক্রি করে, তিনঃ যারা শ্রমিক নিয়োগে মজুরি খাটায় কিন্তু তার পারিশ্রমিক দিতে অস্বীকার করে।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম দাস আর মনিবের প্রভেদ মুছে ফেলেন। দাস আর মনিবের খাবার পোশাক পরিচ্ছদে কোনো তফাৎ থাকল না। এক মুক্ত দাসের কাছে বিয়ে দিলেন তার আপন ফুফাতো বোন, এক মুক্ত দাসের পুত্রকে বানালেন এক সামরিক অভিযানের সেনাপতি, এক মুক্ত দাস হলেন মদিনার মসজিদের প্রথম মুয়াজ্জিন।
**************************
শাহেদ আলী
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১১ এপ্রিল ২০০৮