মুনাফিক শব্দটি আরবি। আমাদের পরিভাষায়ও এর বহুল ব্যবহার রয়েছে। শব্দটির অর্থ হল- ভণ্ড, কপটাচারী। যার মনের ভাবের সাথে বহির্ক্রিয়ার কোন মিল নেই তাকেই বলে মুনাফিক। মানুষের জন্য স্বভাবটি খুবই ক্ষতিকর ও কদর্যপূর্ণ। এ ধরনের লোকেরা সমাজের চোখে যেমন ব্রাত্য, তেমনি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারেও তাদের কোন ঠাঁই নেই। সূরা নিসার ১৪৫নং আয়াতে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘নিঃসন্দেহে মুনাফিকরা রয়েছে দোযখের সর্বনিম্ন স্তরে। আর তোমরা কখনও তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না।’ চারিত্রিক এই অবক্ষয়গ্রস্ত লোকদের রাব্বুল আলামীন কতটা অপছন্দ করেন, তা বুঝবার জন্য পবিত্র কোরআনের এই হুঁশিয়ার বাণীটিই যথেষ্ট। শাস্তির এই ধমকি যদিও ঈমানহীন মুনাফিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, কিন্তু যেসব ঈমানদার ব্যক্তি মুনাফিকদের এই হীন স্বভাব গ্রহণ করবে, তাদের জন্যও আখেরাতে রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি। যেসব চারিত্রিক অবক্ষয়ের কারণে একজন মুসলমান মুনাফিকের পর্যায়ে অধঃপতিত হয়, তার সংক্ষিপ্ত পরিচয় হযরত নবী করীম (দ·) এভাবে দিয়েছেন- ‘হযরত আবু হোরায়রা (রা·) থেকে বর্ণিত, হযরত নবী করীম (সা·) বলেন, ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি- তারা অধিক পরিমাণে মিথ্যে কথা বলে, প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না এবং তাদের নিকট আমানত হিসেবে কোন জিনিস গচ্ছিত রাখলে তা খেয়ানত করে।’ অন্য একটি হাদীসে বর্ধিত আকারে বলা হয়েছে যে, ‘যদিও তারা নামাজ পড়ে, রোযা রাখে এবং নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করে।’ (সহীহ বুখারী)

হাদীসে প্রদত্ত বিবরণ থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো- প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা মুনাফিকের স্বভাব। পক্ষান্তরে ইসলামের দৃষ্টিতে মুমিনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট হলো- যে কোন মূল্যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা। তাই শরীয়তের বিধান মতে প্রতিশ্রুতি দানের পর যদি এমন কোন বাধা বা অপরাগতা এসে পড়ে, যার ফলে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তাহলে যাকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তাকে নিজের অপরাগতা সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। মনে করুন, কেউ কাউকে কোন নির্দিষ্ট তারিখে এক হাজার টাকা দেয়ার ওয়াদা করেছিল, কিন্তু পরে সে ব্যক্তি এমনই কপর্দকশূন্য হয়ে পড়ল যে, প্রদত্ত ওয়াদা রক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাহলে সেক্ষেত্রে তার কর্তব্য হল, যে ব্যক্তিকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তাকে উদ্ভুত পরিস্থিতি এবং তার বর্তমান অপারগতা সম্পর্কে অবহিত করা। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রতিশ্রুতি পূরণ করার ক্ষমতা থাকা অবস্থায় এবং প্রতিশ্রুতি পালনে শরীয়তের কোন আপত্তি না থাকলে যে কোন মূল্যে তা পূরণ করা ওয়াজিব। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা·) ছিলেন প্রতিশ্রুতি রক্ষার ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল প্রতীক। তিনি নিজের সঙ্গী-সাথীদেরকে শত্রম্নর সাথেও প্রতিশ্রুতি রক্ষার নির্দেশ দিতেন। রাসুল (সা·) প্রতিশ্রুতি পালনের ক্ষেত্রে কতটা দায়িত্বশীল ছিলেন তা বুঝে আসে নিম্নোক্ত ঘটনা থেকে।

হযরত হোযায়ফা (রা·)-এর পিতা ইয়ামন (রা·) মুসলমান হয়ে মদীনার পথে রওয়ানা হন তখন সময় ছিল বদর যুদ্ধের পূর্বক্ষণ। মক্কার কাফেররা আবু জেহেলের নেতৃত্বে মদীনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। পথে হযরত ইয়ামনকে দেখতে পেয়ে আবু জেহেল তাঁকে আটক করে তার গন্তব্য সম্পর্কে জানতে চায়। তিনি সরলভাবেই বলে দিলেন, মদীনায় মুহাম্মদের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি’। জবাব শুনে আবু জেহেল বলল- ‘তোমাকে যেতে দেয়া হবে না। কেন না, মদীনায় গিয়ে তুমি মুসলমানদের পক্ষ নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে।’ হোযায়ফা (রা·) বললেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য শুধু হুজুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। তোমাদের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধে অংশ নিব না। এই প্রতিশ্রুতি শুনে আবু জেহেল তার পথ ছেড়ে দিল। হযরত হোযায়ফা (রা·) মদীনার উদ্দেশ্যে ছুটে চললেন। ওদিকে হযরত নবী করীম (সা·) সাথী-সঙ্গীদের নিয়ে কাফেরদের মোকাবিলা করার জন্য মদীনা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। পথেই হুজুর (স·)-এর সঙ্গে হযরত হোযায়ফা (রা·)-এর দেখা। হোযায়ফা (রা·) হযরত নবীজীর (সা·)-এর খেদমতে পথের ঘটনা খুলে বললেন। এরপর যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি চেয়ে বললেন, আবু জেহেলকে আমি যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছি, তা ছিল প্রাণ রক্ষার জন্য। এমন প্রতিশ্রুতি না দিলে সে আমাকে আসতেই দিত না। এমনকি প্রাণ নিয়েও আমার আর ফেরা হতো না।

কিন্তু হযরত নবী করীম (সা·) হযরত হোযায়ফা (রা·)-এর আবেদনের জবাবে বললেন- হোযায়ফা! তা হতে পারে না। কেন না, তুমি ওয়াদা করে এসেছ আর তোমাকে এ শর্তেই মুক্তি দেয়া হয়েছে যে, মদীনায় এসে তুমি শুধু আমার সঙ্গে দেখা করবে, যুদ্ধে শরীক হবে না। কাজেই আমি তোমাকে যুদ্ধে শরীক হবার অনুমতি দিতে পারি না। যে প্রতিশ্রুতি তুমি আবু জেহেলকে দিয়ে এসেছ, তা ভঙ্গ করার কোন উপায় নেই। এ যুদ্ধ রাজ্য জয় করার যুদ্ধও নয় বা ক্ষমতা লাভ করার যুদ্ধও নয়। এ যুদ্ধ হচ্ছে সত্য ও ন্যায়ের বাণীকে সমুন্নত রাখার যুদ্ধ। সত্যকে পদদলিত করে, অন্যায় ও পাপাচারের পথে চলে আল্লাহর দ্বীন জিন্দা হয় না। অতএব, তুমি সবর কর।

আজকের দুনিয়ায় মুসলমানদের সমস্ত চেষ্টা-মেহনত শুধু এ কারণেই ব্যর্থ হচ্ছে যে, তাদের মনের স্বচ্ছতা কমে এসেছে। মনগড়া নানা ব্যাখ্যা-অপব্যাখ্যায় মুসলমান নিয়তে পাপাচার করে চলেছে। কিন্তু হযরত সাহাবায়ে কেরামের লক্ষ্য ছিল, কেবল আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জন করা। রাজ্য জয় করা বা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা নয়। সেদিন মদীনায় সদ্য আগত হযরত হোযায়ফা (রা·) ও তার পিতার জন্য যেহেতু আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি তাদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করার মধ্যেই নিহিত ছিল, তাই তাকে ও তার পিতা হযরত ইয়ামান (রা·)কে বদর যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি।

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা একটি জঘন্য পাপ- একথা জেনেও আমরা অহরহ এ কাজ করে চলেছি। সজ্ঞানে এমনসব কর্মকাণ্ডে আমরা লিপ্ত হচ্ছি যে, এর মাধ্যমে যে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হচ্ছে তা মোটেও ভাবছি না। মনে রাখতে হবে, প্রতিশ্রুতি শুধু মৌখিকই হয় না, কার্যতও হতে পারে। কেউ যখন কোন দেশে বসবাস করে তখন সে কার্যত সে দেশের রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন মেনে চলার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সে অবস্থায় তার জন্য উক্ত রাষ্ট্রের শরীয়ত পরিপন্থী নয় এমন সব আইন-কানুন মেনে চলা ওয়াজিব। শরীয়তের খেলাপ কোন আইন মেনে চলা অবশ্য কারো জন্য সঙ্গত নয়। এ সম্পর্কে হযরত নবী করীম (সা·)-এর স্পষ্ট বক্তব্য হলো- আল্লাহপাকের অবাধ্যতা হয় এমন কোন বিষয়ে কারো আনুগত্য করা বৈধ নয়। সুতরাং আল্লাহপাকের অবাধ্যতামূলক আইন ছাড়া অন্য সব আইন মেনে চলা সকল নাগরিকের জন্যই ওয়াজিব। তদ্রূপ কোন দেশের ভিসা গ্রহণ করা হলে সে দেশের আইন-কানুন মেনে চলার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। চাই তা কোন অমুসলিম দেশই হোক না কেন। সুতরাং সে দেশের যেসব আইন ইসলামের দৃষ্টিতে অবৈধ নয়, তা মেনে চলা সে ব্যক্তির জন্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।

ঠিক এমনিভাবে ট্রাফিক আইন বা নগর কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত অন্যান্য কানুন মেনে চলাও শরীয়তের দৃষ্টিতে নাগরিকদের দায়িত্ব। কারণ নগরবাসী হিসেবে আমরা নগর কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের আইন মেনে চলার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কাজেই ট্রাফিক আইন বা সিটিকোড ভঙ্গ করে আমরা শুধু যে নগর কর্তৃপক্ষের কাছে অপরাধী সাব্যস্ত হচ্ছি তা নয়; বরং আল্লাহপাকের দরবারেও আমরা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকছি। এভাবে জীবনের বহু ক্ষেত্রেই আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আছি, যা রক্ষা করে চলা আমাদের অপরিহার্য কর্তব্য। আর সেসব প্রতিশ্রুতি রক্ষার মাধ্যমে নেমে আসতে পারে আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও নাগরিক জীবনে শান্তির অমীয়ধারা। আল্লাহ সকলকে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।

**************************
হেলালুদ্দিন আহমাদ
দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ এপ্রিল ২০০৮