- Home
- জীবন ও কর্ম
- নবী ও রাসুল
- মানবতার মুক্তিদুত
- Home
- ঈদ উৎসব
- ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী
- মানবতার মুক্তিদুত
মানবতার মুক্তিদুত
- By Article Poster
- Published 04/14/2008
- নবী ও রাসুল
- Unrated
রাসুলুল্লাহর (সা.) জীবন এমন এক মহান সমুদ্র যে, লাখ লাখ লোকের আলোচনা সত্ত্বেও এ আলোচনা শেষ হবে না। তাই এ মহামানবের শিক্ষা ও আদর্শ সম্পর্কে এবং তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক ও ঘটনা নিয়ে এত গবেষণা হওয়ার পরও নতুন কিছু বলার থেকেই যায়। হজরত আয়েশা (রা.) সাহাবাদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘কোরআনই তাঁর চরিত্র।’ আল-কোরআনে যে নির্দেশাবলী এসেছে, রাসুলুল্লাহের (সা.) চরিত্রে তার বাস্তব রুপ ফুটে উঠেছে।
মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল। তিনি খাতামুন্নাবিয়িন ও সাইয়েদুল মুরসালিন অর্থাৎ সর্বশেষ নবী ও রাসুল এবং সব নবী-রাসুলের নেতা। আল্লাহতায়ালা হচ্ছেন সর্বজাহানের রব বা রাব্বুল আলামিন এবং মুহাম্মদ (সা.) হচ্ছেন রাহমাতুল্লিল আলামিন বা সারা জাহানের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতস্বরুপ। তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর মনোনীত রাসুল। আল্লাহতায়ালা তাঁকে সারা বিশ্বে আদর্শরুপে প্রেরণ করেছেন। তিনি সমগ্র মানবজাতির আদর্শ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁকে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ মানবীয় গুণাবলি দান করেছেন। নবুওয়াত-পুর্ব ও পরবর্তী জীবনে আমরা তাঁর অসাধারণ গুণাবলি প্রত্যক্ষ করি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও তিনি মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক। মুহাম্মদ (সা.) জীবনের সর্বক্ষেত্রে ও বিভাগে আমাদের সর্বোত্তম আদর্শ রেখে গেছেন।
আল-কোরআনে রাসুল (সা.) সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তোমাকে মানুষের জন্য রাসুলরুপে পাঠিয়েছি-তুমি বল, হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সবার জন্য আল্লাহর প্রেরিত রাসুল।’ কোরআনে আরো বলা হয়েছে, ‘নিঃসন্দেহে আমি তোমাকে বিশ্ব জাহানের জন্য করুণাস্বরুপ প্রেরণ করেছি’ (সুরা আম্বিয়া-১০৭)। ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল এবং সব নবীর শেষ নবী’ (সুরা আহজাব-২১ ও ৪০)। ‘হে নবী! আমি তোমাকে সাক্ষীরুপে ও সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারীরুপে পাঠিয়েছি’ (সুরা সাবা-২৮)। এছাড়াও আল-কোরআনে রাসুল (সা.) সম্পর্কে বহু বর্ণনা রয়েছে। বিস্তারিত বর্ণনায় না গিয়েও নির্দ্বিধায় বলা যায়, তিনি বিশ্ব চরাচরের জন্য আল্লাহর রহমতস্বরুপ।
পৃথিবীতে মানব জাতির ইতিহাসে যত মহাপুরুষ, মহামনীষী ও মহাজ্ঞানী এসেছেন তারা সম্মিলিতভাবে যে কাজ করতে পারেননি, মুহাম্মদ (সা.) তার চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি কাজ সম্পন্ন করে গেছেন। তিনি যে জাহেলি সমাজ ও প্রতিকুল পরিবেশে কাজ করেছেন, যে সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও উপায়-উপকরণ নিয়ে যে মহান কার্য সম্পন্ন করেছেন, তা আজো মানব জাতির কাছে মহাবিস্ময়। মানব জাতির প্রতিটি দিক ও বিভাগে মুহাম্মদ (সা.) সর্বোত্তম আদর্শ স্হাপন করে গেছেন। আর একটা সম্ভব হয়েছে আল্লাহতায়ালা আল-কোরআনের মতো একটা মহাবিস্ময়কর গ্রন্হ তাঁকে দান করেছেন বলে। মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন এই কোরআনের জীবন্ত ও বাস্তব নমুনা। তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ মানব জাতির জন্য আদর্শ ও অনুকরণীয়-অনুসরণীয়। মানব জাতির আদর্শ হওয়ার জন্য যে ধরনের নিখুঁত ও নির্ভেজাল জীবনাদর্শের প্রয়োজন, একমাত্র রাসুল (সা.) হচ্ছেন সে ধরনের বিশুদ্ধ ও অনুপম আদর্শের অধিকারী।
তাঁর চরিত্রের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে নিম্নোক্তগুলো উল্লেখযোগ্যঃ ১. তিনি ছিলেন জ্ঞানে সর্বশ্রেষ্ঠ, ২. পরিজনের কাছে সবচেয়ে ভালো মানুষ, ৩. দরিদ্র ও অসহায়দের বন্ধু, ৪. তিনি আদর্শ পিতা ও আদর্শ স্বামী ছিলেন, ৫. জ্ঞানীদের প্রতি তাঁর আন্তরিক ভালোবাসা ছিল, ৬. কখনো কখনো তিনি হাস্যরসিকতা করতেন, ৭. আত্মীয়দের দাবি সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন, ৮. তিনি ছিলেন সর্বাপেক্ষা দাতা, সর্বাপেক্ষা বড় বীর, ৯. আবার সর্বাধিক খোদাভীরু পরহেজগার ছিলেন, ১০. তিনি প্রাচুর্যের প্রতি ছিলেন বিরাগী, ১১. যে বিছানায় তিনি ঘুমাতেন তা ছিল চামড়ার ও খেজুরের পাতার আঁশে তৈরি, ১২. তাঁর খাদ্য ছিল অতি সাধারণ মানের, ১৩. তিনি ছিলেন মানবতার মুর্ত প্রতীক, ১৪. বিদায় হজের তাঁর ভাষণ ছিল বিশ্ব মানবতায় (ঐঁসধহ জরমযঃং) পুর্ণ। তাঁর চরিত্র মাধুর্য তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন এভাবে-“ঐশী জ্ঞান আমার মুলধন, বিবেক আমার দ্বীনের মুলনীতি, প্রেম এবং ভালোবাসা আমার ভিত্তিমুল, আকাঙ্ক্ষা আমার সওয়ারি, জিকরুল্লাহ আমার প্রিয় সঙ্গী, বিশ্বস্ততা আমার ধনভান্ডার, ভিত্তিমুলক চিন্তা আমার বন্ধু, জ্ঞান আমার মুলধন, সহিষ্ণুতা আমার আবরণ, সন্তুষ্টি আমার প্রতি আল্লাহর দান, দারিদ্র্য আমার গৌরব, প্রাচুর্যের প্রতি বিরাগ আমার নৈপুণ্য, দৃঢ়বিশ্বাস আমার প্রত্যয়, সত্যবাদিতা আমার বন্ধু, ইবাদত আমার আভিজাত্য, জিহাদ আমার প্রকৃতি, আর মালাতেই আমার চোখের শীতলতা।”
তাঁর ৬৩ বছরব্যাপী জীবনে ওই কাজগুলো মণি-মুক্তার মতো দেদীপ্যমান। বিশ্ব মানব সমাজ তাঁর জীবনে এর ব্যতিক্রম কখনো দেখতে পায়নি। চল্লিশ বছর বয়সে নবুওয়ত পাওয়ার আগেও তাঁর জীবনে যেসব সদগুণের প্রকাশ পেয়েছে তাও প্রণিধানযোগ্য। তিনি ছিলেন ছোটবেলা থেকে সত্যবাদী, বিনয়ী ও পুর্ণমাত্রায় বিশ্বাসী এবং আমানতদার। তিনি সবসময় আত্মীয়ের হক রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। তিনি এতিম ও অনাথদের বোঝা বহনকারী। বেকার লোকের কাজের ব্যবস্হা করে দিতেন। যাবতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে দুস্হ জনগণের সেবার জন্য তিনি ছিলেন জীবন উৎসর্গকারী।
বিখ্যাত ইংরেজ ঐতিহাসিক ও গবেষক মাইকেল মাসকারান হার্ট তার বিখ্যাত বই ঞঐঊ ঐটঘউজঊউ গ্রন্হে বিগত কয়েক হাজার বছরে মানব জাতির ইতিহাসে সর্বাধিক প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তিত্বের তালিকায় নির্দ্বিধায় ও নিঃসংকোচে মুহাম্মদকে (সা.) বইয়ের প্রথমে স্হান দিতে বাধ্য হয়েছেন। হার্টের ভাষায়, মুহাম্মদ (সা.) একাধারে একটি ধর্ম, রাষ্ট্র ও সমাজ মানব জাতিকে উপহার দিয়েছেন। তিনি বইয়ের শুরু করেন এভাবে-“যে মহামানবের সৃষ্টি না হলে এ ভুপৃষ্ঠের কোনো কিছুই সৃষ্টি হতো না, যাঁর পদচারণায় পৃথিবী ধন্য হয়েছে, আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা, অন্তরের পবিত্রতা, আত্মার মহত্ত্ব, ধৈর্য ও ক্ষমা, সততা ও নম্রতা, বদান্যতা, মিতাচার, আমানতদারি, যুক্তিপুর্ণ মনোভাব, ন্যায়পরায়ণতা, উদারতা ও কঠোর কর্তব্যনিষ্ঠা ছিল যাঁর চরিত্রের ভুষণ; যিনি ছিলেন একাধারে ইয়াতিম হিসেবে স্নেহের পাত্র, স্বামী হিসেবে প্রেমময়, পিতা হিসেবে স্নেহের আধার, সঙ্গী হিসেবে বিশ্বস্ত; যিনি ছিলেন সফল ব্যবসায়ী, দুরদর্শী সংস্কারক, ন্যায়বিচারক, মহৎ রাজনীতিবিদ এবং সফল রাষ্ট্রনায়ক। তিনি হলেন সর্বকালের, সর্বযুগের এবং সর্বশেষ মহামানব বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি এমন এক সময় পৃথিবীতে আগমন করেন যখন আরবের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্হা অধঃপতনের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল।” তিনি ওই গ্রন্হে আরো বলেছেন, ‘বর্তমান বিশ্বে যাঁর নাম প্রতি মুহুর্তে সর্বাধিকবার উচ্চারিত হচ্ছে তিনি হজরত মুহাম্মদ (সা.)।’ হার্টের এ সাহসী উচ্চারণে পাশ্চাত্য জগতে এক প্রচন্ড আলোড়নের সৃষ্টি হয়। অনেক চিন্তাশীল, জ্ঞানী ও যুক্তিবাদী লোককে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বইটি যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে ও উৎসাহ যুগিয়েছে।
ড. মরিস বুকাইলি নামের ফ্রাসের বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও দার্শনিক আল-কোরআনের ওপর গবেষণা করে ইসলাম, কোরআন ও মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে তার নিজের ভ্রান্ত ধারণা দুর করেন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তার রচিত বিখ্যাত এ বাইবেল, কোরআন ও মুহাম্মদ (সা.) গ্রন্হে আল-কোরআন ও বাইবেলের তুলনামুলক আলোচনা করে তিনি আল-কোরআনকে আল্লাহর প্রেরিত কিতাব এবং তা আজতক সম্পুর্ণরুপে অবিকৃত অবস্হায় আমাদের কাছে আছে সে সত্য তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি পাশ্চাত্য জগৎ বাইবেলকে কিভাবে বিকৃত করেছে তার ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেছেন, মুহাম্মদ (সা.) একজন নিরক্ষর রাসুল ছিলেন। কিন্তু তাঁর উপস্হাপিত জীবনাদর্শ, আল ইসলাম ও আল-কোরআন আল্লাহ প্রদত্ত এবং অবিকৃত অবস্হায় সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে মানব সমাজে সংরক্ষিত আছে। মুহাম্মদ আসাদ বিগত শতাব্দীর একজন বিখ্যাত মুসলিম চিন্তাবিদ ও দার্শনিক ছিলেন। তিনি ইহুদি ধর্মাবলম্বী একজন সাংবাদিক ছিলেন। মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে তিনি ইসলামের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। মুসলিম সমাজ ও আল-কোরআনের কি কি বিষয় তাকে ইসলাম গ্রহণে আকৃষ্ট করেছে তার চিত্তাকর্ষক বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তার বিখ্যাত বই জঙঅউ ঞঙ গঊঈঈঅ গ্রন্হে।
**************************
প্রকৌশলী এসএম ফজলে আলী
সাবেক চেয়ারম্যান, পুরকৌশল বিভাগ ও লাইফ ফেলো, আইইবি ও পানি বিশেষজ্ঞ
আমার দেশ, ১২ এপ্রিল ২০০৮