- Home
- জীবন ও কর্ম
- দার্শনিক ইবনে রুশদ
- Home
- জীবন ও কর্ম
- স্মরণীয় ব্যাক্তিত্ব
- দার্শনিক ইবনে রুশদ
দার্শনিক ইবনে রুশদ
- By Article Poster
- Published 04/18/2008
- জীবন ও কর্ম
- Unrated
মুসলিম মনীষীদের মধ্যে যার প্রভাব পাশ্চাত্যে সর্বাধিক তিনি হলেন ইবনে রুশদ। তাঁর পুরো নাম আবু ওলিদ মোহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে মোহাম্মদ ইবনে রুশদ। ইউরোপে তিনি Averroes নামে পরিচিত। ইবনে রুশদ ১১২৬ খ্রিষ্টাব্দে স্পেনের কর্ডোভার নগরে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিক দিক দিয়ে স্পেনে তাঁদের ব্যাপক সম্মান ছিল। তাঁর পিতা এবং পিতামহ উভয়ই কর্ডোভার বিচারক ছিলেন। ইবনে রুশদ এর শিক্ষা জীবন নিজ জন্মস্থান কর্ডোভারেই শুরু হয়। শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধা ও মননশীলতার পরিচয় দেন। তিনি আরবি ভাষা ছাড়াও গ্রীক ও হিব্রু ভাষাতে দক্ষ ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষা সমাপ্ত করার পর তিনি একাধারে কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ফিকাহ্, ইতিহাস, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন ও চিকিৎসা বিদ্যাসহ বহু বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তবে একজন চিকিৎসাবিদ ও দার্শনিক হিসেবেই তিনি সবচেয়ে বেশি সুনাম ও সম্মান লাভ করেন।
১১৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ইবনে রুশদ মরক্কোতে অবস্থান করেন। সেখানে তিনি ইবনে তুফায়েলের আহবানে গিয়েছিলেন। ইবনে তুফায়েল তাঁকে মুওয়াহহিদপন্থী খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফের সাথে পরিচয় করে দেন। ইবনে তুফায়েলই ইবনে রুশদকে অ্যারিস্টটলের ভাষ্য লেখার পরামর্শ দেন। ১১৬৯ সালে ইবনে রুশদ সেভিল শহরের এবং তার দুই বছর পরে কার্ডোভার কাজী নিযুক্ত হন। এ সময়ে নানা ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সর্বাপেক্ষা অমূল্য রচনাবলি প্রণয়নে হাত দেন। ১১৮২ সালে তিনি খলিফা আবু ইয়াকুবের ব্যক্তিগত চিকিৎসক নিযুক্ত হন। তার কিছুদিন পর আবু ইয়াকুব তাঁকে প্রধান কাজীর পদে সমাসীন করে আবার কর্ডোভায় প্রেরণ করেন। কিন্তু নেতৃস্থানীয় কিছু আলেমদের বিরোধীতার ফলে তিনি নিন্দিত হয়ে পড়েন এবং নাস্তিকতার অভিযোগে তাঁকে কর্ডোভার নিকটবর্তী Lucena নামক স্থানে নির্বাসিত করা হয়। এ সময় খলিফা হুকুম দিলেন, “চিকিৎসাবিদ্যা, অংকশাস্ত্র এবং প্রাথমিক জ্যোর্তিবিদ্যা বিষয়ক পুস্তক ছাড়া তাঁর দর্শনের সমস্ত পুস্তক পুড়ে ফেলা হউক।” পরে খলিফা তার নিজের ভুল ধরতে পেরে ইবনে রুশদকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতিও অনেক হয়েছিল এবং তাঁর শরীরও ভেঙ্গে পড়েছিল।
আসলে প্রাচ্যে ইসলামী দেশসমূহে প্রথম হতেই দার্শনিক মতবাদের প্রতি বিরূপ মনোভাবের পরিচয় দেন। যা ১৩শ শতাব্দীতে প্যারিস, অক্সফোর্ড এবং ক্যান্টাবারির আর্চবিশপগণের সাথে তুলনা করা যায়। মুসলিম দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে ইবনে রুশদের মতো আল কিন্দি, আর -ফারাবী, ইবনে সীনা, ইবনে খালদুন, ইবনে বাজ্জা প্রমুখ মনীষীদেরকেও বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।
যে সমস্ত দার্শনিক মতবাদের জন্য ইবনে রুশদকে প্রগতিশীল ধারার দার্শনিক বলা হয়- তা হচ্ছে বিশ্বের চিরন্তনতা ও আল্লাহর অস্তিত্ব এবং জ্ঞানের স্বরূপ, তাঁর গায়েবের জ্ঞান, জীবাত্মা ও জ্ঞানের সম্পূর্ণতা এবং পরকাল। এ সমস্ত বিষয়ে তিনি প্রতিষ্ঠিত ধর্মমত সমূহের প্রতি অবিশ্বাসী ছিলেন না। কিন্তু তৎকালীন আলেম সমাজ তাঁর প্রগতিশীলতার অগ্রসর, মনন ও মেধার সৃজনশীলতাকেই নাস্তিকতা বলে অভিহিত করেছেন। উদাহরণ স্বরূপ বিশ্ব চিরন্তনতার প্রশ্নে তিনি বিশ্বের সৃজনতত্ত্বকে অস্বীকার করেননি। তিনি কেবল এটাকে ধর্মীয় ব্যাখ্যার দৃষ্টিভঙ্গি হতে পৃথক করেছেন। তাঁর মতে কোনোব‘ই অনস্তিত্ব হতে একবারমাত্র সৃষ্টি হয়েই চিরস্থায়ী হতে পারে না; বরং প্রতি মুহূর্ত এটা নব নব রূপ পরিগ্রহ করে। এর ফলে দুনিয়া স্থায়ী হয় আর পৃথিবী পরিবর্তনশীল হয়। অন্যদিকে, আল্লাহ-তত্ত্ব বিষয়ে ইবনে রুশদ ‘আদি কারণ কেবল নিজ অস্তিত্ব সম্বন্ধেই সচেতন” এই মতবাদেরই পুনরাবৃত্তি করেছেন। সহজ কথায়,
ইবনে রুশদের দর্শনচিন্তার মূল কথা হলো-ব‘বাদী চিন্তাধারা। তিনি বলেন, ব‘ স্থায়ী আর আত্মা দেহের মতোই নশ্বর। ব‘ ও গতির কোনো স্রষ্টা নেই। তাঁর ধারণায় সত্য দুই ধরনেরঃ দর্শন ও বিজ্ঞানের সত্য এবং ধর্ম বিশ্বাসের সত্য। দর্শন ও বিজ্ঞানের সত্য যেমন কর্ম স্বীকার করে না; তেমনি ব‘ বিশ্ব সম্পর্কে ধর্মীয় ব্যাখ্যায় বিজ্ঞান ও দর্শনের পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি অ্যারিস্টটলের দর্শনের বিভিন্ন দিক বিশেস্নষণ করে যে কয়টি বই লিখেছেন সেগুলো ইউরোপে বিশেষভাবে সমাদৃত। তাঁর বহু গ্রন্থ ল্যাটিন, হিব্রু, ইংরেজি, ফরাসী ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইবনে রুশদের অপমান, নির্যাতন ও নির্বাসনের মূল কারণই হলো ধর্ম ও দর্শনের বিরোধ। তবু তিনি তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করেন নি। মুসলমান ও খ্রিষ্টান রক্ষণশীলদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও রুশদ কখনও পিছু হটেননি। এমনকি ইমাম গাজ্জালি(রঃ) এর ধর্মীয় রহস্যবাদের তীব্র সমালোচনা করতেও তিনি দ্বিধা বোধ করেন নি।
পরবর্তী কয়েক শতকের দর্শন চিন্তায় ইবনে রুশদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর ৭ খন্ডে লেখা “বিশ্বকোষ” সমকালের বিচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রচনা। ইবনে রুশদ ছিলেন অ্যারিস্টটলের শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছেঃ “তাহাফুতুত তাহাফুত” (আল গাজ্জালির প্রসিদ্ধ তাহাফুতুল ফালাসিফার প্রত্যুত্তর): অ্যারিস্টটলের Poetics এবং Rhetorics- এর ভাষ্য; অ্যারিস্টটলের দর্শন পুস্তক সম্বন্ধে Alexander Afrodici কৃত ল্যাটিন রচনার ভাষ্য; কিতাবুল জাওয়ামি (অ্যারিস্টটলের বিভিন্ন নির্বাচিত প্রবন্ধ) ইত্যাদি। আসলে ইবনে রুশদের মূল আরবি রচনাবলির বৃহৎ অংশ নষ্ট কিংবা পুড়ে ফেলা হয়েছে। তাছাড়া যা পাওয়া সমকালীন বিচারে এখনও বিশ্ব সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। ইবনে রুশদ ১১৯৮ খ্রিষ্টাব্দে মরক্কোতে ইন্তিকাল করেন। মরক্কো শহরের নিকটেই তাঁকে দাফন করা হয়।
**************************
শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান
দৈনিক ইত্তেফাক, ১৮ এপ্রিল ২০০৮