- Home
- ইসলাম ও নারী
- নারী অধিকার ও ইসলাম
নারী অধিকার ও ইসলাম
- By Article Poster
- Published 04/18/2008
- ইসলাম ও নারী
-
Rating:




এ কথা অনস্বীকার্য যে, নারীর প্রতি সদয় অথবা নিষ্ঠুর আচরণে এক জাতির সাথে আরেক জাতির এবং এক আইনের সাথে আরেক আইনের যতই পার্থক্য ও বৈপরীত্য থাকুক না কেন, ইসলামের অভ্যুদয়ের আগে নারী কখনো কোনো সমাজে তার যথাযোগ্য সামাজিক ও আইনগত মর্যাদা লাভ করেনি। সভ্যতা সমৃদ্ধ প্রাচীন গ্রিক, রোমান, পারস্য, মিসরীয়, চৈনিক, হিন্দু, ইহুদি ও খ্রিষ্ট সমাজের চিত্র ছিল এ ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন, গ্রিক সমাজে নারীরা এত ঘৃণিত ছিল যে, তাদেরকে শয়তানের নোংরা চেলাচামুণ্ডা মনে করা হতো। রোমান সাম্রাজ্যে পরিবার প্রধান নিজের সন্তানদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা বিক্রি করে দিতে পারত দাসদাসীর মতো। কন্যাসন্তান হলে তো কোনো কথাই নেই। হিন্দু ধর্ম মতে পিতা, স্বামী অথবা নিজ পুত্রের কতৃêত্ব থেকে নারীর স্বাধীন হওয়ার কোনো অধিকারই নেই। এমনকি এক সময় স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর বেঁচে থাকার অধিকারও ছিল না। তাকে স্বামীর সাথে একই চিতায় জীবন্ত পুড়ে মরতে হতো। ১৭০০ শতাব্দীতে আইন করে এই বর্বর প্রথাকে বিলুপ্ত করা হয়। চীনাদের প্রবাদই ছিল ‘তোমরা স্ত্রীর কথা শোন, তবে বিশ্বাস করো না।’ ইহুদি ও খ্রিষ্টানরাই তো নারীকে রীতিমতো অভিশাপ মনে করে থাকে। কারণ নারীই না কি আদমকে বিপথগামী করেছিল। তাওরাতে বলা হয়েছে, ‘স্ত্রীলোক মৃত্যুর চেয়েও মারাত্মক।’ বোস্তাম নামক জনৈক খ্রিষ্টান যাজক বলেন, ‘নারী এক অনিবার্য আপদ, এক লোভনীয় আপদ, পরিবার ও সংসারের জন্য হুমকি, মোহনীয় মোড়কে আবৃত বিভীষিকা।’ আরবদের অবস্থা তো ছিল আরো সঙ্গীন। কন্যাসন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়াকে তারা ভীষণ অশুভ ঘটনা বিবেচনা করত। কোনো কোনো গোত্র নবজাতক মেয়েকে আভিজাত্যের কলঙ্ক ভেবে এবং কেউবা খাদ্য জোগাতে পারবে না এই আশঙ্কায় জ্যান্ত মাটিতে পুতে ফেলত।
এই যখন নারীর অবস্থা, তখন বিশ্বমানবতার মুক্তির মহা পয়গাম কুরআনুল করিম ঘোষণা দেয় ‘নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো’ (সূরা নিসাঃ ১৯) রাসূলে আরবির কণ্ঠে ধ্বনিত হলো ‘নারীগণ পুরুষদেরই সহোদরা’ (আহমদ, আবু দাউদ) এভাবেই ইসলাম সর্বপ্রথম নারীদেরকে সমাজ্যে স্বাধীন, সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার প্রদান করে। এমনকি সূরা নিসা নামে পবিত্র কুরআনের একটি পূর্ণাঙ্গ সূরাই নাজিল হয় নারীর যাবতীয় অধিকারের বার্তা নিয়ে। ইসলামের নবীই নারীকে একজন মা হিসেবে সম্মান ও মর্যাদার সুউচ্চ আসনে সমাসীন করেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত’ (মুসনাদে আহমদ) কিন্তু দুঃখের বিষয়, যে ইসলাম নারীকে যথার্থ সম্মান ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তার আইনসম্মত অধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করেছে, যাবতীয় নিপীড়ন ও নির্যাতন, শোষণ ও বঞ্চনা থেকে তাকে মুক্তির পয়গাম শুনিয়েছে সেই ইসলামকেই আজ নারী স্বাধীনতার অন্তরায়, নারীর উন্নয়নের চরম প্রতিবন্ধক হিসেবে চিত্রিত করার অপপ্রয়াস চলছে। ইসলামের নীতিকে ত্রুটিপূর্ণ ও অযৌক্তিক প্রমাণ করতে ইসলামের শত্রুরা আজ আদাজল খেয়ে নেমেছে। ইসলামি আইনকে অবিচার অন্যায় ও বৈষম্যমূলক প্রমাণ করতে এদের নিরন্তন প্রচেষ্টা খুবই লক্ষণীয়।
বিগত ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০০৮’ নামে ঘোষণা করেন এক বিতর্কিত নীতিমালা, এতে নারীর সার্বিক উন্নয়ন ও অধিকার সংরক্ষণের ধুয়া তুলে মানবজীবনের সব ক্ষেত্রে, এমনকি সব স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকারের প্রস্তাব পেশ করা হয়। জনসমক্ষে প্রকাশের আগে থেকেই তার বিষয়বস্তু সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল। নীতির কপি জনগণের হস্তগত হওয়ার পর দেখা যায়, তাদের সন্দেহ ও আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
স্বাভাবিক কারণেই দেশের সর্বস্তরের মানুষ এ ধরনের অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে। আল্লাহপাক নারী ও পুরুষকে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। যা একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নারী ও পুরুষ মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে সামান হলেও ক্ষেত্রবিশেষে তাদের অধিকার ও দায়িত্বে পার্থক্য ও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। যেমন নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের প্রশ্নে কুরআনের বক্তব্য হচ্ছে, ‘পুরুষ নারীর ওপর কর্তৃত্বশীল। এ কারণে যে, আল্লাহ তায়ালা কতকের ওপর কতককে মর্যাদা দান করেছেন। এবং এ কারণে যে, পুরুষ তার মাল ব্যয় করে।’ (সূরা নিসা, ৩৪)। ৯.১৩ ধারায় অত্যন্ত আপত্তিকর শব্দের মাধ্যমে আরো স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জরুরি বিষয়াদি যথা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, জীবনব্যাপী শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, উপার্জনের সুযোগ, সম্পদ, ঋণ, প্রযুক্তি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে সমান সুযোগ এবং নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয়া। এবং সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন করা।’ এসব নীতিমালায় সরাসরি ইসলামের উত্তরাধিকার আইনের বিরোধিতা বা কুরআন সুন্নাহসংক্রান্ত কোনো শব্দ ব্যবহার না করে সুকৌশলে নতুন নতুন নীতির কথা বলে কুরআন-সুন্নাহর আইনের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া হয়েছে। কারণ নারীর উত্তরাধিকারের প্রশ্নে কুরআনের বক্তব্য হচ্ছে এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান। কিন্তু কেবল কন্যাসন্তান দু’য়ের অধিক থাকলে তাদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ। আর মাত্র এক কন্যা থাকলে তার জন্য অর্ধাংশ। (সূরা নিসা, আয়াত-১১)
উত্তরাধিকারসংক্রান্ত এরূপ অন্যান্য আয়াতগুলোর দিকে লক্ষ করলে এ কথা প্রতিভাত হয় যে, বোন, মাতা ও স্ত্রী পর্যায়ক্রমে ভাই, পিতা ও স্বামীর তুলনায় অর্ধেক পাচ্ছে। এখানে দৃশ্যত নারী-পুরুষের মধ্যে ওয়ারিসি সম্পত্তির বণ্টনের ব্যাপারে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও উভয়ের ব্যয় খাতগুলো একটু খতিয়ে দেখলে ইসলামের উত্তরাধিকার আইনকে মোটেও বৈষম্যমূলক বলে মনে হবে না। ইসলাম মোটামুটিভাবে একজন পুরুষকে চার খাতে তার সম্পদ ব্যয় করার নির্দেশ দেয়। পক্ষান্তরে একজন নারী এসব খাতের কোনো একটিতেও তার সম্পদ ব্যয় করতে বাধ্য নয়। এই অনস্বীকার্য বাস্তবতার দিকে লক্ষ করলে একজন নারীর অংশকে পুরুষের তুলনায় কোনোভাবেই কম বলার যুক্তি থাকে না।
অনুরূপভাবে তৃতীয় অধ্যায়ের ৩.৫ ধারায় বলা হয়েছে, ‘স্থানীয় বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো ধর্মের কোনো অনুশাসনের ভুল ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নারী স্বার্থের পরিপন্থী এবং প্রচলিত আইন বিরোধী কোনো বক্তব্য বা অনুরূপ কাজ করা বা কোনো উদ্যোগ না নেয়া।’ এই ধারার মাধ্যমে আলেম বা মুফতিগণের ইসলামী আইনের ব্যাখ্যা বা ফতোয়া দেয়ার অধিকার খর্ব করারই নীতি গ্রহণ করা হয়েছে পরোক্ষভাবে।
এভাবে ১.৩ ও ৩.২ ধারায় জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক প্রণীত- Convention on the Elimination of all forms of Discrimination Against Women (CEDAW) তথা নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ সনদ (সিডও) বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ় অঙ্গীকার ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এই সনদের ধারা-২ হলো মূলনীতি বিষয়ক বিধান, যাতে নারী-পুরুষের সব ক্ষেত্রে সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এই ধারা মেনে নিলে কুরআনে আল্লাহ প্রদত্ত মিরাস বা উত্তরাধিকার আইন বাতিল করতে হয়। তা ছাড়া এই সনদের ১৩(এ) এবং ১৬-১ (সি) ধারা দু’টি ইসলামী বিশ্বাসের পরিপন্থী হওয়ায় ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাতে স্বাক্ষর করেছিল আপত্তি ও লিখিত শর্ত দিয়ে। অথচ এই নীতিমালায় সেসব আপত্তি ও শর্তের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে নিঃশর্তভাবে তা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
অতএব দেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রাণের দাবির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সরকারকে অবশ্যই এ নীতিমালার কুরআন-বিরোধী ধারাগুলো বাদ দিতে হবে। সমঅধিকারের স্থলে ‘ন্যায্য অধিকার’ শব্দটি প্রয়োগ করা হোক। কারণ ইসলাম প্রকৃতপক্ষেই নারীর ন্যায্য অধিকারের কথা বলে। পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকসহ সব ক্ষেত্রে ইসলাম নারীর ন্যায্য অধিকার সুনিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশের জনগণ শত শত বছর ধরে নারী সমাজের প্রতি ইসলামের প্রদত্ত অধিকারগুলো নিশ্চিন্তে ও নিঃসঙ্কোচে গ্রহণ করে আসছে। এর দ্বারা তারা কখনোই অপরিতৃপ্তিবোধ করেনি।
**************************
মাওলানা মুহাম্মদ জুনায়েদ
মুহাদ্দিস, দারুল উলুম
হাটহাজারী, চট্টগ্রাম
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৮ এপ্রিল ২০০৮