কুতুবুল আলম, বেলায়াতের প্রজ্ঞাদাতা, আউলিয়াকুল শিরোমণি শায়খ আবদুল কাদের জিলানীর (রহ·) এই সংক্ষিপ্ত জীবনী আলোকপাত করার উদ্দেশ্য হল- ‘তানাজজালুর রাহমাতি ইন্নাদজিকরিছ ছালেহীন’, আউলিয়াকেরাম মুমিন বান্দাদের জীবন আলোচনাকালে আল্লাহর রহমত ও বরকত নাজিল হয়। রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখের ইছালে সওয়াব মিলাদ মাহফিলকে ফাতেহায়ে ইয়াজদাহম বলে।
‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর অলি তাদের কোন ভয় নেই। এমনকি তারা কোন বিষয়ে চিন্তাযুক্তও হবে না।’ এসব অলিআল্লাহ ও মুমিন বান্দারাই বেলায়াতের বরকতে আধ্যাত্মিক জগৎ শাসন করে থাকেন। এসব অলিআল্লাহ’র মধ্যে সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ অলি গাউছে পাক আবদুল কাদের জিলানী বোগদাদি (রহ·)। যার সম্মান ও মর্তবা সম্পর্কে পাক-ভারত উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ মোহাদ্দেস শাহ আবদুল হক মোহাদ্দেসে দেহলভী (রহ·) ‘যুবদাতুল আসরার’ নামক কিতাবে লিখেছেন- শায়খুল হারামাইন আবদুল্লাহ ইয়াফেরি (রহ·) বলেছেন, গাউছে পাক আবদুল কাদের জিলানীর (রহ·) ফজিলত ও মর্তবা এত অধিক যে, পৃথিবীতে যত গাছ আছে, সব গাছের পাতাগুলো যদি কাগজ হয়, শাখাগুলো যদি কলম হয়, সমুদ্রের পানিগুলো কালি হয়, তবুও তার ফজিলত লিখে শেষ করা যাবে না।
হজরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রহ·) ৪৭০ খ্রি· বা ৭১ হিজরি সালের মাহে রমজানের প্রথম তারিখে ইরাকের জিলান শহরে জন্মলাভ করেন। তখন তার মায়ের বয়স ছিল ৬০/৬১ বছর। তার পিতার নাম আবু ছালেহ জঙ্গি মুছা, মায়ের নাম উম্মুল খায়ের ফাতেমা। তিনি মাতা-পিতা উভয় দিক থেকে রাসূলুল্লাহর (সা·) বংশধর। তিনি মায়ের দিক থেকে হোসাইন (রা·) এবং পিতার দিক থেকে হাসানের (রা·) বংশধর। এ কারণে তাকে আল হাসানি ওয়াল হোসাইনি বলা হয়। তিনি যখন মায়ের গর্ভে এক মাসের, তখন এক রাতে মা হাওয়া (আ·) তার মাকে স্বপ্নযোগে বললেন, হে ফাতেমা! তোমার গর্ভে অলিকুল শিরোমণি গাউছুল আজম বড়পীর হজরত আবদুল কাদের অবস্থান করছে। উম্মুল খায়ের ফাতেমা বলেন, আমার সন্তান আবদুল কাদের জন্ম হয়েই রোজা পালন শুরু করে। সে মাহে রমজানের সম্মানে দিনের বেলা দুধ পান করত না। সূর্যাস্তের পর থেকে সুবহে সাদিকের আগ পর্য- দুধ পান করত। গাউছে পাকের মা বলেন, যেদিন আমার ছেলে জন্মলাভ করে, সে রাতে আমার স্বামী আবু ছালেহ স্বপ্নে দেখেন, মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা·) প্রধান সাহাবিদেরসহ আমার ঘরে তাশরিফ এনে আমার স্বামীকে বলছেন, হে আবু ছালেহ! মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাকে যে পুত্রসন্তানটি দান করেছেন সে আমারও প্রিয়, আল্লাহ তায়ালারও প্রিয়। সে সব কুতুবের নেতা, যেমন আমি সব নবী-রাসূলের নেতা। গাউছে পাকের ৫ বছর বয়সের সময় তার পিতা তাকে মক্তবে ভর্তি করিয়ে দিলে মক্তবের ওস্তাদ তাকে আউযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ পড়িয়ে দিয়ে সবক দিতে বললে গাউছে পাক সূরা ফাতেহা থেকে শুরু করে ১৫ থেকে ১৮ পারা কোরআন পাক পাঠ করে শুনিয়ে দেন। কথিত আছে, তার মা উম্মুল খায়ের ১৮ পারা কোরআনে পাকের হাফেজ ছিলেন। তিনি ছিলেন মাদারজাত অলি।
তার ১৭ বছর বয়সে একবার আরাফার দিন ৯ জিলহজ বিকালে তিনি ঘরের ছাদে উঠে দেখেন, সেই দূরপ্রান্তে আরাফার ময়দানে হাজী সাহেবরা তালবিয়া পাঠ করছেন। এ অবস্থা দেখে তার মনে লেখাপড়ার স্পৃহা জাগে। তা তার মায়ের কাছে বললে মা তার লেখাপড়ার জন্য বিদেশ গমনের সব ব্যবস্থা করে ৪০টি স্বর্ণমুদ্রা গোপনে সংরক্ষণ করে দিয়ে বললেন, বাবা আবদুল কাদের! বিপদ যতই কঠিন হোক না কেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে। আর কখনও মিথ্যা কথা বলবে না। তিনি বাগদাদের উদ্দেশে বণিক কাফেলার সঙ্গে পথ চললেন। এক পর্যায়ে বণিক কাফেলা ডাকাত দ্বারা আক্রা- হলে সব মালপত্র লুণ্ঠিত হয়। ডাকাত সরদার তার সত্যবাদিতার পরিচয় পেয়ে সবার মালামাল ফিরিয়ে দেয় এবং তার হাতে মুসলমান হয়। বর্ণিত আছে, ডাকাতের সংখ্যা ছিল ৪০। পরবর্তী সময়ে সবাই যুগশ্রেষ্ঠ অলি হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করে। কিতাবে বর্ণিত আছে, তিনি যে বছর জন্মলাভ করেন ওই বছর জিলান এলাকায় প্রায় ১ হাজার ১০০ সন্তান জন্মলাভ করে। ওই ১ হাজার ১০০ সন্তান সবাই ছেলে ছিল। আর এরাও পরবর্তী সময়ে বিখ্যাত অলিআল্লাহ হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেন। সাওয়ানে ওমরি কিতাবে বর্ণিত, তিনি পবিত্র মাহে রমজান মাসেও ৬১ খতম কোরআন পাক তেলাওয়াত করতেন।
বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রহ·) শৈশবে একবার ধাত্রীর কোল থেকে উড়ে গিয়ে প্রখর সূর্য কিরণের সঙ্গে মিলিত হন। আর ধাত্রী অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর অনায়াসে ধাত্রীর কোলে চলে আসেন। তিনি মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় একবার এক ফকির তাদের বাড়িতে এসে ভিক্ষা চাইলে বাড়িতে অন্য কেউ না থাকায় ফকির উম্মুল খায়ের ফাতেমার ওপর আক্রমণ করতে চাইলে গাউছে পাক আল্লাহর কুদরতে মায়ের গর্ভ থেকে বেরিয়ে বাঘের রূপ ধারণ করে ফকিরের প্রাণ সংহার করে উধাও হয়ে যান। তিনি যখন বাগদাদে নিজামিয়া মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেন, তখন ওস্তাদদের মধ্যে বিশেষ করে আবু সাঈদ (রহ·) তার বিশেষ খেয়াল রাখেন। একদিন ওস্তাদ আবু সাঈদ মোবারক (রহ·) বলেন, ‘আবদুল কাদের সে দিনটি অতি নিকটে, যেদিন তোমার আস্তানা হবে সারা বিশ্ববাসীর বেলায়াতের কেন্দ্রস্থল। আর তুমিই মহানবীর (সা·) ধর্মকে নতুন জীবন দান করবে। যার ফলে তোমার উপাধি হবে মহিউদ্দীন। আর তুমি আল্লাহর সব সৃষ্টির প্রতি ফয়েজ বিতরণ করবে। এই মহামানবের হাদিসের ওস্তাদরা বলতেন, ‘হে আবদুল কাদের! আমরা তো তোমাকে হাদিসের শব্দের সনদ দিয়েছি মাত্র। তবে হাদিসের সারাংশ আমরা তোমার থেকে উপকৃত হয়েছি। তিনি এলমে লাদুনির জ্ঞান অর্জনের জন্য বায়াত গ্রহণ করেন সেই যুগের শ্রেষ্ঠ সাধক শায়খুল মাশায়েখ আল্লামা শায়খ আবু সাঈদ মোবারক মাখসুমীর (রহ·) কাছে। সাফিনাতুল আউলিয়া নামক কিতাবে বর্ণিত, শায়খ আবু সাঈদ মাখসুমী (রহ·) যখন গাউছে পাককে (রহ·) বেলায়াতের খেরকা পরান তখন বললেন, হে আবদুল কাদের! এটা ওই খেরকা যা হজরত মোহাম্মদ মো-ফা (সা·) হজরত আলীকে (রা·) দান করেছিলেন। তা হাত কা হাত আমার কাছে পৌঁছেছে। আমি তা তোমাকে দান করছি। গাউছে পাকের পীর আবু সাঈদ মাখসুমী (রহ·) ৫১৩ হিজরি সনের পহেলা মহররম তারিখে ইন্তেকাল করেন। ইে-কালের আগেই নিজ প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার ভার আবদুল কাদেরের হাতে সোপর্দ করে যান। মাওলানা আবুল খায়ের (রহ·) বলেন, ‘একবার আমি গাউছে পাকের এক মাহফিলে উপস্থিত ছিলাম। তার ওয়াজ শুনে শ্রোতারা যখন এশকে এলাহির মত্ততায় নাচছিল, তখন তিনি বলে উঠলেন, আজ আমার কাছে যে যা চাইবে সে তা-ই পাবে।’ তিনি আরও বললেন, ‘কাদামি হাজা আলা রাকাবাতিকুল্লি ওয়ালিইল্লাহ’, আমার এই কদম সব অলির ঘাড়ের ওপর। তৎক্ষণাৎ শায়খ হজরত আলী হাববী (রহ·) গাউছে পাকের কদম মোবারক নিজ চোখে লাগায়ে বরকত লাভ করলেন। আর উপস্থিত-অনুপস্থিত সব অলি তাদের ঘাড় নত করে দিলেন।’
বড়পীর নিজে বলেন, মেরাজের রাতে রাসূল (সা·) যখন সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছলেন তখন জিবরাইল (আ·) সামনে অগ্রসর হওয়ার অপারগতা প্রকাশ করে বললেন, ‘আগার ছারে মোয়ে বরতর পরাম, ফোরেগে তাজাল্লি বোসুযাদ পরাম’ হে রাসুল! আমার ওপরে ওঠার শেষ সীমানা এখান পর্য-ই শেষ। এর ওপরে ওঠা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি আমি তা অতিক্রম করার চেষ্টা করি, তবে আমার ৬০০ নূরের পাখা জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। তখন মহান আল্লাহতায়ালা আমি আবদুল কাদেরের রুহকে ডেকে রাসূলের (সা·) সামনে হাজির হতে আদেশ করলেন। আমি বোরাকের আকৃতিতে রাসূলের (সা·) সামনে হাজির হলে রাসূল (সা·) আমার পিঠে আরোহণ করে আমার ললাটের কেশ ধরে বললেন, ‘হে আমার বৎস আবদুল কাদের! আজ যেমন আমি তোমার ঘাড়ে পা রাখলাম, আগামীকাল আল্লাহর সব অলির ঘাড়ের ওপর তোমার পা থাকবে’। সাওয়ানে ওমরি গাউছে পাক বলেন, ৫২১ হিজরির ১৬ শাওয়াল মঙ্গলবার রাসূল (সা·) আমাকে বলেন, হে বৎস! তুমি কেন ওয়াজ-নছিহত কর না? আমি বললাম- হুজুর, আমি ওয়াজ জানি না। তখন রাসূল (সা·) বললেন, তোমার মুখ খোল। আমি মুখ খুললে রাসূল (সা·) আমার মুখে ফুঁ দিলেন এবং বললেন, মানুষকে হেকমতের সঙ্গে নছিহত করে তোমার প্রভুর দিকে আহ্বান করতে থাক। বাহজাতুল আবরার কিতাবে বর্ণিত, এই স্বপ্ন দেখার পর থেকেই তিনি ওয়াজ-নছিহত করতে শুরু করেন। তিনি এমন ওয়াজ করতেন যে, এমন কোন মজলিশ বাদ ছিল না, ২-৪ জন মানুষ তার ওয়াজ শুনে মারা না যেত।
এই মহান বেলায়াতের প্রজ্ঞাদাতা ৫৭১ হিজরিতে ৯১ বছর বয়সে রবিউস সানি মাসে রোজ সোমবার সুবহে সাদিকের সময় ইহকাল ত্যাগ করে পরকালে চলে যান। ইরাকের বাগদাদ নগরে তার পবিত্র সমাধি অবস্থিত।
কুতুবুল আলম, বেলায়াতের প্রজ্ঞাদাতা, আউলিয়াকুল শিরোমণি শায়খ আবদুল কাদের জিলানীর (রহ·) এই সংক্ষিপ্ত জীবনী আলোকপাত করার উদ্দেশ্য হল- ‘তানাজজালুর রাহমাতি ইন্নাদজিকরিছ ছালেহীন’, আউলিয়াকেরাম মুমিন বান্দাদের জীবন আলোচনাকালে আল্লাহর রহমত ও বরকত নাজিল হয়। রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখের ইছালে সওয়াব মিলাদ মাহফিলকে ফাতেহায়ে ইয়াজদাহম বলে।
**************************
মা ও লা না মোঃ আ বু ল হো সা ই ন পা ট ও য়া রী
যুগান্তর, ১৮ এপ্রিল ২০০৮