নারী-পুরুষের ইহকাল ও পরকালের সুখ-শান্তি পাওয়ার, ন্যায্য অধিকার পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে আল্লাহপাকের পবিত্র কালাম ও রাসূলে (স·)-এর নির্দেশিত জীবন বিধান। সুতরাং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি সদস্য যখন বিভিন্ন ধর্ম, গোত্র জাতির প্রচলিত নারী অধিকার নিয়ে পর্যালোচনা করবে, তখন বিশ্বমানবতার শান্তির দূত ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার মহানায়ক হজরত মুহাম্মদ (স·)-এর মতো সেও বলবে- ‘নারীর ওপর পুরুষের যেমন অধিকার রয়েছে, পুরুষের ওপরও নারীর তেমন অধিকার রয়েছে।’ অধিকার বলতে এখানে প্রত্যেকের প্রাপ্য ন্যায্য অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কোরআন-হাদিসের মাধ্যমে নারী ও পুরুষের অধিকারসমূহ সুন্দর সুষ্ঠু ও নির্ভুলভাবে বিন্য- করা হয়েছে। একজন নারী সব ধরনের অর্থনৈতিক দায়িত্ব থেকে মুক্ত। তা সত্ত্বেও নারীকে সম্পদ লাভের ক্ষেত্রে অন্যান্য ধর্মের চেয়ে ইসলাম ধর্ম অনেক বেশি সুযোগ করে দিয়েছে।
অন্যান্য ধর্মে নারীদের অধিকার সম্পর্কে কী রয়েছে? আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত। ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠের হিন্দু ধর্মে নারীদের স্বাধীনতা একটি অন্যতম বিষয়। অথচ! সেখানে উত্তরাধিকারী আইন অনুপস্থিত। দায়ভাগ আইন মৃত ব্যক্তির অন্যান্য উত্তরাধিকারী জীবিত থাকলে কন্যারা কোন অংশ পায় না।
বৌদ্ধদের পৃথক কোন উত্তরাধিকার আইন নেই। তবে বাংলাদেশের বৌদ্ধরা ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন দ্বারা শাসিত। ইহুদি ধর্মে নারীকে সব পাপের কারণ এবং পুরুষের সঙ্গে প্রতারণাকারী বলা হয়েছে।
কাজেই এ ধর্মে নারী উপেক্ষার পাত্রী। ইহুদি ধর্মে পিতা নিজ কন্যাকে বিক্রয় করে দিতে পারত এবং তার কোন উত্তরাধিকার স্বত্ব স্বীকৃত ছিল না। পৃথক কোন উত্তরাধিকার আইন ছিল না। তবে পরে কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে।
খ্রিস্ট ধর্মের উত্তরাধিকার আইনে স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, পিতা, মাতা প্রত্যেকেই কমবেশি উত্তরাধিকার স্বত্ব লাভ করবে, কিন্’ নির্দিষ্ট অংশের উল্লেখ নেই।
মহানবী (সা·) এর আগমনের আগে নারীর অধিকার বলতে যা বুঝায় তদানী-ন আরব সমাজে তার কোন অস্বি-ই ছিল না। নারীদের অবস্থা ছিল অত্য- শোচনীয়। লোকজন তাদের কন্যা সন্তানকে জীব- করব দিত। এ প্রসঙ্গে কোরআন মাজিদে আল্লাহপাক এরশাদ করেন- ‘তাদর কাউকে যখন কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয় তখন তাদর মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেয়া হয়, তার গ্লানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় থেকে আত্মগোপন করে। সে চিন্তা করে, হীনতা সত্ত্বেও সে তাকে রেখে দিবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে। সাবধান! তারা যা সিদ্ধা- করে তা কত নিকৃষ্ট।’ (সূরা নাহলঃ ৫৮-৫৯) মানবতার নবী হজরত মুহাম্মদ মো-ফা (স·) সর্বপ্রথম নারীর এই অসহায়ত্ব অনুধাবন করেন, তিনি সমাজ কতৃêক নারীর প্রতি এ জঘন্য আচরণ দেখে অত্য- মর্মাহত হন। নির্যাতিত নারী জাতিকে নিষ্ঠুর জালিমদের কবল থেকে উদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। লুণ্ঠিত নারীর মর্যাদাকে জনসমক্ষে তিনি তুলে ধরেন, সমাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীরও মর্যাদা এবং ব্যক্তিত্ব রয়েছে, তা পর্যায়ক্রমে বর্ণনা করেন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর যে অধিকার রয়েছে, তা কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিশ্ববাসীর কাছে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। অতঃপর পুরুষের পাশাপাশি নারী সমাজের যেসব অধিকার রয়েছে সেসব অধিকার পূর্ণরূপে সংরক্ষণ ফরজ বলে ঘোষণা দেন।
এভাবেই মহানবী (স·) অবহেলিত অধঃপতিত নারী জাতিকে মানবেতর অবস্থা থেকে উদ্ধার করেন। নারী এই সর্বপ্রথম নির্যাতনমুক্ত হন। অন-কাল ধরে তার প্রতি যে নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ চলছিল, তার পরিসমাপ্তি ঘটান। মহানবী (স·)-এর বিশ্বস্বীকৃত চির-ন অবদানের ফলে নারীরা সমাজে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের সুযোগ পান।
নারীর প্রতি মহানবী (স·)-এর সর্বকালের সর্বযুগের চির-ন অবদানগুলো বলে বা লিখে শেষ করা যাবে না, যেহেতু সমাজের লাঞ্ছিত এই নারীকে জীবনের প্রতিটি ধাপে ধাপে তার আল্লাহ প্রদত্ত ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেন। কোরআন ও হাদিসের মাধ্যমে সম্পত্তিতে নারীর প্রাপ্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেন। কোরআন মাজিদে ঘোষিত মৃতের পরিত্যক্ত সম্পদে উত্তরাধিকার লাভকারীদের ৬টি অংশ বর্ণিত হয়েছে। এই ছয় প্রকার অংশের জন্য কোরআন মাজিদের মৃতের স্বত্ব লাভকারীদের সংখ্যাঃ ১২ জন বলা হয়েছে। এদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৪ জন এবং নারীর সংখ্যা ৮ জন।
ইসলামে মিরাসি আইনে পিতা-মাতার পরিত্যক্ত সম্পদে নারীদেরকে পুরুষের অর্ধেক পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। যেহেতু নারী সব অর্থনৈতিক ব্যয় থেকে মুক্ত। অথচ বর্তমানে দেশে ‘উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারী-পুরুষ সমঅধিকার’ বিধান করে ইসলামী আইন তথা কোরআন-হাদিসকে অস্বীকার করছে।
সুতরাং ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা-২০০৮’ অনুমোদন করেছে যা আল-কোরআনের সূরা আল নিসার ১১নং আয়াতে বর্ণিত বিধানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কেউ এই বিধান অস্বীকার করলে সে নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করার অধিকার রাখে না। যারা কোরআনের উক্ত বিধান পরিবর্তন করার দরকার মনে করেন বা কোরআনের বিপরীত আইন তৈরিতে লোগান দেন, তারা কি কোরআনকে অস্বীকার করেন না? যদি কোরআন ও হাদিসকে কেউ অস্বীকার করেন তাহলে সে মুসলমান হিসেবে মৃত্যুবরণ করবেন না অমুসলিম বা কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবেন?
অতএব আসুন, এহেন পরিস্থিতিতে কোরআন-সুন্নাহ পর্যালোচনা করে সে অনুযায়ী নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করি এবং কোরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী আইন বাতিল করতে ঐকমত্য পোষণ করি। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন।
**************************
মা ও লা না মো হাঃ ও ম র ফা রু ক
যুগান্তর, ১৮ এপ্রিল ২০০৮