- Home
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
- পারিবারিক জীবন দায়িত্ব ও কর্তব্য
পারিবারিক জীবন দায়িত্ব ও কর্তব্য
- By Article Poster
- Published 12/4/2007
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
- Unrated
মনের ও দেহের সুসমন্বিত সৃষ্টি মানুষ। সমাজ সংসার তথা বিশ্বব্যাপী মানবিক শ্রেষ্ঠত্বের চালিকাশক্তি হল জ্ঞান ও বিবেকবোধ। প্রাণিজ অনুভূতি, আত্মার প্রেরণা, বিবেকের নির্দেশনা এবং জ্ঞানের আলোকে পরিপূর্ণ মানবিক পরিচিতি তখনই সার্থক হয়, যখন এ গুণ ও বৈশিষ্ট্য মহান আল্লাহর বিধান মোতাবেক পরিচালিত হয়।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অন্যান্য প্রাণির মতই মানুষেরও দৈহিক এবং জৈবিক চাহিদা রয়েছে। সৃষ্টিগত এ স্বাভাবিক চেতনা মানুষের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আসক্তি সৃষ্টি করে। যার সাধারণ প্রকাশ হল কামনা বা কামাসক্তি। কিন্তু মানুষের আহার-বিহারে, যেমন বৈধ-অবৈধ, কল্যাণ-অকল্যাণ বিবেচনা করা হয় তেমনই মানুষ তার জৈবিক তৃষ্ণা যেনতেন প্রকারেন পূরণ করতে পারে না এবং করেও না। কেননা বিবেক, সমাজ ইত্যাদি এখানে অদৃশ্য অথচ সুদৃঢ় দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় এরই নাম মনুষত্ব।
জৈবিক পরিতৃপ্তি, বংশবৃদ্ধি, মানুষিক প্রশান্তি এবং নারী-পুরুষের পারস্পরিক স্বীকৃতি, সম্মান ও দায়িত্ব-কর্তব্যের সুসমন্বিত অংশীদারিত্ব হল দাম্পত্য জীবন। দেশকালের বাস্তবতায় দাম্পত্য জীবন মানুষের যাপিত জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ, অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। নবী রাসুল তথা সকল মহামানবের ক্ষেত্রেও এ ব্যাপক ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জীবনের নিত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। কেননা দাম্পত্য জীবন হল মনুষত্বের পূর্ণতা ও শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষী। বন্ধুত্ব, প্রেম ও ভালবাসার সমন্বিত সম্পর্ক হলো দাম্পত্য জীবন। এ জীবনের সূচনা ও স্বীকৃত পন্থা হল বৈবাহিক বন্ধন। দেশ-কাল ভেদে বিয়ের বিভিন্ন রীতি বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ে এক প্রকারের চুক্তিবিশেষ। পাত্র-পাত্রীর স্বেচ্ছা ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রস্তাবনা এবং সমর্থনের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হয়। পরিভাষায় যাকে বলে “ইযাব-কবুল” (প্রস্তাব সমর্থন)।
ইসলামের স্বতঃসিদ্ধ রীতিতে বিয়ে একটি আবশ্যক কর্তব্য বা ফরজ। কেননা মহান আল্লহ বলেন, তবে তোমরা বিয়ে করবে নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে, দুই, তিন অথবা চার জন।” (নিসাঃ ০৩)
আয়াতে উল্লেখিত সংখ্যা প্রসঙ্গটি বাস্তবতা এবং শর্তের সাথে সম্পৃক্ত। তবে এখানে বিধানগত দিকটি অত্যন্ত স্পষ্ট। মহান আল্লাহ আরো বলেন, তোমাদের মধ্যকার জুটিহীনদের বিয়ে দিয়ে দাও। (সুরা নুরঃ ৩৩)।
নারী-পুরুষের দেহ ও আত্মার জুটি বন্ধন হল দাম্পত্য জীবন। পারস্পরিক “বৈধ ও পবিত্র” পন্থায় সুখানুভূতির জন্য বিয়ের মাধ্যমেই পারিবারিক জীবনের যাত্রা শুরু হয়। দুটি মনের যুগল বাঁধনের সার্থক পরিণতি সন্তান-সন্তুতি নিয়ে সুখের সংসার। সুখের দাম্পত্য জীবনই হল জীবন্ত স্বর্গ -পারিবারিক পরিমন্ডলে একজন পুরম্নষ ০৪টি ভিন্ন চরিত্র ও পরিচিতিতে দায়িত্বশীল। যথা- পিতা, পুত্র, ভাই, স্বামী। অনুরূপভাবে একজন নারী ও কন্যা, জায়া, জননী অথবা ভগ্নিরূপে কখনো স্নেহময়ী, মমতাময়ী, দরদী অথবা প্রেমময়ীরূপে জীবন নাট্যমঞ্চের নিপুণা শিল্পি, আদর্শ কুশীলব। এ পটভূমিতে পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে মহান আল্লাহ বলেন -
"ওহে যারা ঈমান এনেছো। তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও।" (তাহরীম-০২)
মুসলিম পারিবারিক কাঠামো পিতৃতান্ত্রিক হলেও বাস্তবে নারী-পুরুষ যেন একই বৃক্ষমূলের দুটি শাখা। মহান আল্লহ বলেন-
"আল্লহ তোমাদের জন্য তোমাদের ঘরকে শান্তির আবাসস্থল বানিয়েছেন।" (নাহল-৮০)
অন্যদিকে আদর্শ পরিবার গঠনে মহান আলস্নাহর সাহায্য প্রার্থনার বাণী ও মহান আলস্নাহই শিখিয়েছেন- "হে আমাদের প্রতিপালক। আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতিদের আমাদের জন্য নয়ন জুড়ানো করে দিন।" (ফুরকান-৭৪)
পারিবারিক জীবনের পূর্ণতা আসে সন্তানের জন্ম ও লালন-পালনের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গের দায়িত্ব ও কর্তব্য সচেতনতার নির্দেশ দিয়ে প্রিয় নবী (সাঃ) বলেন, "কারো সন্তান হলে তার উত্তম নাম রাখবে, উত্তম শিক্ষা দিবে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে বিয়ে দিবে।" (বায়হাকী) এ প্রসঙ্গে প্রিয় নবী (সাঃ) আরো বলেন, "তোমরা সন্তানের বিপক্ষে কখনো বদ-দু’আ করো না।" (মুসলিম)
পারিবারিক জীবনে মাতার ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যমন্ডিত। সন্তান গর্ভে ধারণ ও লালন-পালনের সামগ্রিক দায়িত্ব মাতার একার ওপর নির্ভরশীল। মহান আল্লাহ বলেন- "মাতা সন্তানকে অতি কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেন এবং প্রসব করেন।" (লুকমান-১৫) এখানেই শেষ নয়। মায়ের দায়িত্ব প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, "মা সন্তানকে পূর্ণ দু’বৎসর মাতৃদুগ্ধ দান করবে।" (বাকারা-২৩৩)
ইসলামী পরিবার ব্যবস্থা দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য চেতনায় সুসমন্বিত। এখানে ভাইবোন পারস্পরিক সম্পর্কেও অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এজন্যই হাদীসে আছে- "ছোট ভাইদের ওপর বড় ভাই-এর অধিকার ঠিক তেমন যেমন সন্তানের ওপর পিতার।" (বায়হাকী) অন্যদিকে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার গুরুত্ব প্রসঙ্গে প্রিয় নবী (সাঃ) এর বিখ্যাত বাণী- "যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমার দলভুক্ত নয়।"
বস্তুতঃ পারিরবারিক জীবন দর্শন মানবিক পূর্ণতা ও শ্রেষ্ঠত্বের অনুপম নিদর্শন। আর ইসলাম এ ব্যবস্থাকে আদর্শ শিক্ষায় করেছে পবিত্রতম। মহান আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামী আদর্শ সমুন্নত রাখার শক্তি দান করুন। আমীন।
**************************
লেখকঃ অধ্যাপক মোঃ আলী এরশাদ হোসেন আজাদ
উৎসঃ দৈনিক ইত্তেফাক, ৩০শে নভেম্বর ২০০৭