Islamic Article Archive - http://articles.ourislam.org
ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকের মজুরি দাও
http://articles.ourislam.org/articles/181/1/aaa-aaaaaaaa-aaaa-aaaaaaaa-aaaaa-aaa/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 04/18/2008
 
কাজের মর্যাদা মানেই ব্যক্তির মর্যাদা, শ্রমের মর্যাদা মানেই শ্রমিকের মর্যাদা এবং দেশ ও দশের মর্যাদা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং দেশের উন্নয়নে মেধা ও শ্রমের বিকল্প নেই। কাজেই শ্রমজীবী, কর্মমুখী মানুষের যেমন মর্যাদা, সম্মানবোধ রয়েছে- তেমনি তাদেরও রয়েছে দায়িত্ব, কর্তব্য, নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ পরিপূর্ণ করা।

ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকের মজুরি দাও

কাজের মর্যাদা মানেই ব্যক্তির মর্যাদা, শ্রমের মর্যাদা মানেই শ্রমিকের মর্যাদা এবং দেশ ও দশের মর্যাদা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং দেশের উন্নয়নে মেধা ও শ্রমের বিকল্প নেই। কাজেই শ্রমজীবী, কর্মমুখী মানুষের যেমন মর্যাদা, সম্মানবোধ রয়েছে-  তেমনি তাদেরও রয়েছে দায়িত্ব, কর্তব্য, নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ পরিপূর্ণ করা।

আমাদের দেশে প্রচলিত একটি প্রবচন আছে, তা হল-  মুখ দিয়েছেন যিনি, আহার দিবেন তিন। এই প্রবচনটির প্রতি অগাধ বিশ্বাস স্থাপন করে অনেকেই নিজের রুজি-রোজগারের কথা ভাবেন না-  আলস্যে দিন কাটিয়ে এক সময় অভাবের তাড়নায় অনুচিত কাজে লিপ্ত হন। শ্রমের প্রতি তাদের বিমুখতা কাজের প্রতি তাদের অবহেলা তথা জীবনের সর্ব-রে তাদের অলসতার দরুন কোন উন্নতি সাধিত হয় না। অথচ আমাদের মহানবী হজরত রাসূলে করীম (স·) সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন-  নামাজের পরে তোমরা রুজি-রোজগার অর্জনে বেরিয়ে পড়। আল্লাহর রাসূলের চেষ্টা, কষ্ট এবং পরিশ্রমের প্রতি তার এই মূল্যবান তাগিদ ও বাণীকে স্মরণে রেখে শ্রমের প্রতি যত্নবান হয়ে আলস্যকে দূরে সরিয়ে দিয়ে আপন আপন বৈধ কর্মক্ষেত্রে আত্মনিয়োগে মনোনিবেশ করলে সফলতার দরজা খুলে যাবে। ইসলাম সর্বকালের একটি সর্বপোযোগী সমাজ ব্যবস্থা। তাই ভূমণ্ডলের সর্বপ্রকার সংকট-সমস্যার সমাধান এই ইসলামী নীতিমালায় পূর্ণাঙ্গরূপে রয়েছে। ইসলাম তার প্রতিষ্ঠাকাল থেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ পৃথিবী গঠন করতে আমাদের শিক্ষা দিয়ে আসছে। আর ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হল, সুসংহত অর্থ এবং সম্পদ অর্জনে সুন্দরতম ব্যবস্থার সন্ধান দেয় এবং শ্রমিক-মজুরদের মর্যাদাকে পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

ইসলামের দৃষ্টিতে একজন শ্রমিক মালিকের কাজের দায়িত্ব নিয়ে এমন এক চুক্তিতে আবদ্ধ, যা শুধু তার সংসার নির্বাহের ক্ষেত্রে নয়-  আখেরাতের সফলতা অর্জন করার এই দায়িত্ব বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তাই ইসলামে মালিক ও শ্রমিকের ওপর আবশ্যক বিধিমালা উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করেছে। কেননা পারস্পারিক সমঝোতার মাধ্যমেই যে কোন বিষয়ে যে কোন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। শ্রমিকদের সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেছেন, সর্বোত্তম শ্রমিক সেই ব্যক্তি যে শক্তিশালী এবং দায়িত্বশীল হয়, আর হজরত রাসূলে করীম (স·) বলেছেন, যার মধ্যে আমানতদারী নেই, তার মধ্যে ঈমানও নেই। সুতরাং শ্রমিকদের উচিত তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব বিশ্ব-তার সঙ্গে প্রতিপালন করা।

ইসলামে মানবিক মর্যাদা মূল্যেবোধ অপরিসীম। পৃথিবীর অন্য কোন ধর্মে এমনিভাবে মানুষকে এত মর্যাদা প্রদান করা হয়নি। ইসলামের দৃষ্টিতে আর্থিক সঙ্গতিসম্পন্ন মানুষকে কোন প্রকার সমাজের উচ্চস্থান দেয়ার আদৌ সমর্থন করেনি। বরং প্রত্যেক সৎ কর্মশীল ও পরহেজগার ব্যক্তিই আপন কর্মকাণ্ডের জন্য সমাজে বেশি সম্মান-মর্যাদা লাভ করতে পারেন। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, কোন শ্রমিক জন্মগত বা পেশাগত দিক থেকে যত নিচুমানের হোক না কেন, সে আপন কর্মের দ্বারাই শুধু সমাজে স্বীয় মর্যাদা লাভ করতে পারে। পবিত্র ইসলামের এই মৌলিক সত্যটির দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, তোমাদের মধ্যে তারাই বেশি মর্যাদাবান, যারা অধিক আল্লাহভীরু এবং পরহেজগার। পেশায় শ্রমিক-মজুর বলে তার সম্মান, মর্যাদা এতটুকু ক্ষুণ্ন হওয়ার আশংকা নেই। কেননা ইসলাম তার মর্যাদা অত্য- সতর্কতার সঙ্গে সংরক্ষণ করেছে। এ কথা মনে রাখতে হবে, মহান স্রষ্টা রাব্বুল আলামীনের কাছে মনিব-চাকর, উঁচু-নিচু, ধনী-গরিব সবাই সমান। যার মধ্যে আদৌ কারও কোন পার্থক্য নেই। শ্রমিকদের মর্যাদা সম্পর্কে তিনি আরও বলেছেন, এমনও হতে পারে খাদেম তার মনিব অপেক্ষা উত্তম এবং এও বিচিত্র নয় যে, আল্লাহ রহমানুর রহমানের দরবারে খাদেমের কর্মই অধিকতর পছন্দনীয় ও গ্রহণযোগ্য (কবুলিয়াত) প্রাপ্ত হবে। আমরা জানি আমাদের পূর্ববর্তী সব নবী এবং আমাদের প্রিয় নবী মোহাম্মদ (সা·) একজন শ্রমজীবী মানুষ ছিলেন। অনেক দিন পর্য- তিনি নিজের শ্রম বিনিয়োগের মাধ্যমে লাভের অংশীদার হিসেবে হজরত খাদিজার (রা·) ব্যবসায় খেটেছেন।

ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় আমরা দেখি একজন শ্রমিক তথা মজুরও দেশের কর্ণধার হতে পারেন। হজরত আবু হোরায়রা (রা·) এর প্রকৃত উদাহরণ। তিনি মদিনার গভর্নর হয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে আমরা আরও দেখি, হযরত রাসূলে করীম (স·) এর বংশধর অভিজাত শ্রেষ্ঠ হজরত ইমাম জয়নুল আবদীন নিজের এক দাস শ্রমিককে স্বাধীন করে দিয়ে তার ঔরসজাত কন্যাকে তার সঙ্গে বিয়ে দিতে এতটুকু কুণ্ঠাবোধ বা দ্বিধা করেননি। ঠিক এমনিভাবে নিজেও এক মেয়ে দাস শ্রমিককে স্বাধীন করে আপন স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিলেন। এছাড়া শ্রমিকদের মজুরি-মর্যাদা সম্পর্কে হজরত আবু হোরায়রা (রা·) থেকে বর্ণিত আছে, হজরত রাসূলে পাক (স·) বলেছেন, আল্লাহ বলেন, আমি রোজ হাশরে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হব-  যে ব্যক্তি আমার নামে ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি) করেছে অথচ তা রক্ষা করেনি। যে ব্যক্তি স্বাধীন লোককে বিক্রয় করে তার মূল্য ভোগ করেছে। আবার যে ব্যক্তি স্বাধীন মজুরের দ্বারা সম্পূর্ণ কাজ করিয়ে তার মজুরি প্রদান করেনি। এতদ্ব্যতীত মহানবী হজরত রাসূলে করীম (স·) পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই মজুরি প্রদান করিও। তিনি আরও বলেছেন, তোমরা যা খাবে দাসদাসিদেরও (শ্রমিক-ভৃত্য) তাই খাওয়াতে হবে। তোমরা যা পরবে, তাদেরকেও তাই পরতে দেবে। কোন প্রকার তারতম্য করতে পারবে না। শ্রমিক-মজুরের প্রতি সম্মান মর্যাদা প্রদর্শনের এক প্রামাণ্য দৃষ্টা- দেখতে পাই হজরত ওমর (রা·)-এর জীবনে। তিনি বিশাল সাম্রাজ্যের অধিশ্বর বা খলিফা হয়েও নিজের শ্রমিককে উটের পিঠে চড়িয়ে তার মর্যাদা দিতে এতটুকু ভোলেননি-  কার্পণ্য করেননি। শ্রমিকের প্রতি কি মর্যাদাবোধ! দেখলে অবাক হতে হয়।

অতএব দেখুন, ইসলাম সামাজিক আচার-ব্যবহারের ক্ষেত্রেও মালিক-শ্রমিকের ব্যবধান দূর করেছে-  শ্রমিকদের মর্যাদাহানিকর কোন শব্দ ব্যবহার হোক বা সম্বোধন করুক, ইসলাম তাও বরদাশত করেনি। এমনকি তৎকালে ইসলামী নীতিমালায় কোন দাস-শ্রমিককে দাস বলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হজরত রাসূলে পাক (স·) বলেছেন, তোমরা মুনিবকে রাব বলতে কঠোরভাবে নিষেধ করছি-  কারণ মুনিব-শ্রমিক তোমরা ছোট-বড়, উঁচু-নিচু সবাই একমাত্র মহান আল্লাহর গোলাম। ইসলাম সে শুধু বড় বড় বুলি আউড়িয়ে বসে থাকেনি-  এমনকি সর্বস্বহারাদের কল্যণে শুধু মায়াকান্নাই কাঁদেনি বরং তাদের অধিকার রক্ষায় বা-বভিত্তিক পদক্ষেপ নিয়েছে, দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তি আদৌ পছন্দ করে না। কারণ কোন কোন লোক শ্রমের প্রতি বিমুখতার কারণে ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে। ধিক্‌! কি মানুষের মন মানসিকতা। এসব ভিক্ষাবৃত্তিতে লিপ্তদের কর্মজীবী, শ্রমজীবী করে তুলতে হবে। তাদের প্রত্যেককে কাজের প্রতি, শ্রমের প্রতি পারস্পারিক সহমর্মিতা তথা মর্যাদা বোধের পরিচয় দিতে হবে। কাজের মর্যাদা মানেই ব্যক্তির মর্যাদা, শ্রমের মর্যাদা মানেই শ্রমিকের মর্যাদা এবং দেশ ও দশের মর্যাদা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং দেশের উন্নয়নে মেধা ও শ্রমের বিকল্প নেই। কাজেই শ্রমজীবী, কর্মমুখী মানুষের যেমন মর্যাদা, সম্মানবোধ রয়েছে-  তেমনি তাদেরও রয়েছে দায়িত্ব, কর্তব্য, নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ পরিপূর্ণ করা।

**************************
মা ও লা না শা হ আ ব দু স সা ত্তা র
যুগান্তর, ১৮ এপ্রিল ২০০৮