অন্যান্য সামাজিক ব্যাধির ন্যায় আত্মহত্যাও একটি সামাজিক ব্যাধি। এটি সমাজে ব্যাপকভাবে দেখা না গেলেও মাঝে মাঝে সংঘটিত হতে দেখা যায়। অনেকে মনে করে যে, এটি কেবল অজ্ঞ ও অশিক্ষিত লোকের মাঝে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে তা প্রমাণিত নয়। দেখা যায়, অনেক উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী, শিল্পপতি, ব্যবসায়ীও এ থেকে মুক্ত নয়। ঢাকার সব দৈনিক সংবাদপত্রে প্রকাশ, গত ২৪ এপ্রিল ২০০৬ তারিখে বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব উচ্চ শিক্ষিত ডক্টর তৌফিক খান মজলিস সিলিংফ্যানের সাথে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন স্ত্রীর সাথে মনোমালিন্যের কারণে। উল্লেখ্য, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত ছাড়াও আত্মহত্যা যেমন যুবক ও প্রৌঢ়দের মধ্যে দেখা যায়, তেমনি তা নারী-পুরুষের মাঝেও দেখা যায়।

মানুষ কেন আত্মহত্যা করে সে বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া যাক। আত্মহত্যার অনেক কারণ আছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য, পিতা-মাতা ও ছেলে-মেয়ের মধ্যে মনোমালিন্য, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, দীর্ঘস্থায়ী রোগ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া, প্রেম-বিরহ, ব্যবসায়ে বারে বারে ব্যর্থ হওয়া, শত্রম্নর কাছে ধরা না দেয়া ইত্যাদি। যখন জ্ঞান-বুদ্ধি-উপলব্ধি-অনুধাবন শক্তি লোপ পায়, নিজকে অসহায়-ভরসাহীন মনে হয়, তখনই মানুষ আত্মহত্যা করে বসে।

ইসলামী দৃষ্টিকোণে বিষয়টি আলোচনা করা যায়। আল্লাহ মানুষকে মরণশীল করে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই মৃত্যু ঘটান। কিন্তু আত্মহত্যার ক্ষেত্রে বান্দা স্বাভাবিক মৃত্যুকে উপেক্ষা করে মৃত্যুকে নিজের হাতে নিয়ে নিজেই নিজকে হত্যা করে ফেলে। এ কারণে এটি একটি গর্হিত কাজ। তাই আলাহ তা মোটেই পছন্দ করেন না। এ কারণে যদিও শরিয়তে আত্মহত্যাকারীর জানাযা হয় তবু রাসূল (সাঃ) তা নিজে পড়াননি। সাহাবী দ্বারা তা পড়ানো হয়। এ সূত্র ধরে আমাদের সমাজেও উচ্চ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আলেমের স্থলে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আলেম দ্বারা আত্মহত্যা কারীর জানাযার নামায পড়ানো হয়।

ক) সাহাবা আবু হোরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজেকে পাহাড়ের ওপর থেকে নিক্ষেপ করে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের মধ্যে সর্বদা ঐভাবে নিজেকে নিক্ষেপ করতে থাকবে। খ) যে ব্যক্তি বিষপান করে আত্মহত্যা করেছে সেও জাহান্নামের মধ্যে সর্বদা ঐভাবে নিজ হাতে বিষপান করতে থাকবে। গ) যে কোন ধারালো অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করেছে তার কাছে জাহান্নামে সে ধারালো অস্ত্র থাকবে যার দ্বারা সে সর্বদা নিজের পেটকে ফুঁড়তে থাকবে। ঘ) রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে সে দোজখে অনুরূপভাবে নিজ হাতে ফাঁসির শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। আর যে বর্শা ইত্যাদির আঘাত দ্বারা আত্মহত্যা করে- দোজখেও সে সেভাবে নিজেকে শাস্তি দেবে। ঙ) হযরত জুনদুব ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের পূর্বেকার এক লোক আহত হয়ে সে ব্যথা সহ্য করতে পারেনি। তাই সে একখানা চাকু দিয়ে নিজের হাত নিজেই কেটে ফেলে। এর পর রক্তক্ষরণে সে মারা যায়। আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা নিজেকে হত্যা করার ব্যাপারে বড় তাড়াহুড়া করে ফেলেছে। তাই আমি তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিলাম।

ওপরের উপস্থাপনা থেকে প্রতিভাত হলো যে ইসলামে আত্ম-হত্যা না জায়েয এবং এর প্রতিফল হলো জাহান্নাম। তাই এ থেকে সতর্ক থাকা প্রতিটি বিশ্বাসি বুদ্ধিমানের কাজ। সূরা বাকারা-আয়াত ৪৫-এ আল্লাহ বলেছেন, “হে বিশ্বাসিগণ। তোমরা সবর ও নামাযের মাধ্যমে আমার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করো। আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন।” তাই আত্ম-হত্যার কথা মনে, আসলে এ বিপদ থেকে রক্ষাকল্পে নফল নামাযে দাঁড়িয়ে যাওয়া এবং সিজদায় গিয়ে বিনীতভাবে আল্লাহর আগ্রহ-দয়া-সাহায্য কামনা করা প্রয়োজন। প্রতি মুহূর্তে ধৈর্য ধারণ করতে হবে।

এ ঘাত-সংঘাতময় জীবনে মাঝে মাঝে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য হবে- এটা তো স্বাভাবিক। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পরিচ্ছদ। একে অপরের শান্তিদাতা ও শান্তিদাত্রী। দোষ-গুণ নিয়েই মানুষ। কারও মাঝে সব গুণের একত্র সমাহার বিরল। স্বামীর যেমন কিছু গুণ থাকে তেমনি কিছু দোষও থাকে। স্ত্রীর ব্যাপারেও একথা সমভাবে প্রযোজ্য। তাই উভয়কে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতে হবে। নিজেদের মধ্যে সংলাপ-সহযোগিতা-সমঝোতা-সহমর্মিতা থাকতে হবে। উভয়কে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। আল্লাহ সূরা ফুরকান আয়াত ৭৪ এ ব্যাপারে দোওয়া শিখিয়ে দিয়েছেন যা হলো “রাব্বানা হাবলানা মিন আগওগানা ও জুর রিয়্যাতেনা কুররাতা আ’য়ুনু অজআলনা লিল মুত্তাকিনা ইমাম।” অর্থ হলোঃ হে আমাদের প্রতিপালক। আমাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদেরকে নয়ন তৃপ্তিকর করে দিন এবং মোত্তাকীদের আমাদের জন্য আদর্শ স্বরূপ করে দিন।

পরীক্ষা এসে গেলে আগে থেকে ছাত্রদের মাঝে মাঝে নফল নামাযে সেজদায় গিয়ে এ দোওয়া করা। হে আল্লাহ। আপনিই তো জ্ঞান-প্রতিভা-মেধা ও ফল দেয়ার মালিক। এগুলো দিয়ে আমাকে অনুগ্রহ করুন যাতে আমি পরীক্ষায় ভাল ফল করতে পারি। কোরআনের ভাষায় এ দোওয়া হলো “রাব্বি জিদনি এলমা।” অর্থ হলো। হে প্রভু। আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।

ব্যবসায় ক্রমাগত ক্ষতি হলে মাঝে মাঝে নফল নামাযে সেজদায় গিয়ে এ দোওয়া পড়াঃ আল্লাহুম্মার জুকনা রিযকান হাসানা। আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবুকা মিনাল ফাকরি অলকিল্লাতি অজজিল্লা”। অর্থ হলোঃ হে আল্লাহ। আমাকে মঙ্গলকর জীবিকা দান করুন। আমি আপনার নিকট গরিবী স্বল্পতা ও হীনতা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। আপনিই তো একমাত্র রিজিকের মালিক এবং দাতা। আপনি সূরা জুমার ৫৩ আয়াতে বলেছেন “ আমার দয়া থেকে নিরাশ হয়ো না”। তাই আমার রুজি বাড়িয়ে দিন।

পিতা-মাতার কাজ হবে ছেলে-মেয়েদের অযথা ধমক না দেয়া, ভর্ৎসনা না করা। এমন মানসিক কষ্ট না দেয়া যাতে তাদেরকে আত্মহত্যার মতো চরম পদক্ষেপ দিতে বাধ্য করে। নামাযের মাধ্যমে এ দোওয়া করা হে রাহমানুর রহিম। আমার সন্তানদের বুঝ জ্ঞান দিন। তাদেরকে সহনশীল ও সবুরকারী করুন। সন্তানদের কর্তব্য হবে পিতা-মাতার উপদেশ মান্য করা। মারাত্মক ও কষ্টদায়ক অসুখে পড়লে নামাযে দাঁড়িয়ে যাওয়া। দাঁড়াতে না পারলে বসে পড়া, তা না পারলে শুয়ে ইশারায় পড়া এবং সেজদায় এ দোওয়া করা। হে আমার রব। আমাকে রোগে কষ্ট দিচ্ছে। আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। আমাকে রোগ-মুক্ত করুন। আইয়ুব (আঃ) তাঁর ভীষণ অসুখে এ দোওয়া পড়েছিলেন (সূরা আম্বিয়া আয়াত ৮৩ “রাব্বি আন্নি মাস্যানিয়াত দুররু ও আনাতা আরহাদুর রাহেমিন”। এ দোওয়া পড়ে রোগমুক্ত হন।

মোট কথা যখনই নিজেকে অসহায় ও আশাহত মনে হয় এবং আত্মহত্যার চিন্তা আসে তখনই মনে করতে হবে এখন শয়তান এসেছে। ইসলামে আত্মহত্যা নাজায়েয এবং তার পরিণতি জাহান্নাম। তাই এ থেকে দূরে থাকা ব্যাঞ্ছ্যনীয়। সাথে সাথে মনে করতে হবে আল্লাহই আমার সহায় এবং আশার আলো। তাই পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামায পড়ার সাথে নফল নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর দয়া ও সাহায্য কামনা করতে হবে। প্রতি মুহূর্তে সবর অর্থাৎ ধৈর্য ধারণ করতে হবে। এতে ইনশাআল্লাহ মন ও হ্নদয় প্রশান্ত থাকবে এবং বিপদ দূরীভূত হবে।

**************************
মো হা ম্ম দ কা শে ম
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৫ এপ্রিল ২০০৮