কোনো কিছু করা বা না করার লিখিত বা মৌখিক অঙ্গীকারকে প্রতিশ্রুতি বলা হয়। আর এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে- কথা দেওয়া, অঙ্গীকার করা, প্রতিজ্ঞা করা, মুচলেকা, ওয়াদা, আমানত ইত্যাদি।
পৃথিবীতে মানুষ একাকী চলতে পারে না। জীবনের নিরাপত্তা ও জীবিকার জন্য তার অপরের সাহায্য ও সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। এই সাহায্য ও সহযোগিতা আপনা-আপনি হয় না। এজন্য তাকে নগদ কিছু দিতে হয়, অথবা দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করতে হয়। কিছু নিতে হলে, কিছু দিতে হয়। এভাবে দেওয়া-নেওয়ার প্রতিজ্ঞা চলছে মানব জীবন ও এর গতি প্রবাহ। এই দেয়া নেয়ার প্রতিজ্ঞা চলছে মানুষের পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক, আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রসহ সর্বত্র।
মানুষের জীবন যুদ্ধে প্রতিশ্রুতি যতক্ষণ অটুট থাকে ততক্ষণ সবকিছু ঠিকঠাক চলে। আর এর ব্যত্যয় হলেই দেখা দেয় গোলমাল, অরাজকতা, নানা ধরনের সমস্যা। মানুষের পারিবারিক জীবনের গোড়াপত্তন হয় বিবাহ নামক একটি আকদ বা চুক্তির মাধ্যমে। এই চুক্তিতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কিছু লিখিত, কিছু অলিখিত, কিছু নৈতিক, কিছু মনস্তাত্ত্বিক, কিছু পরিবেশ-পরিস্থিতিগত প্রতিশ্রুতি থাকে। এসব প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে একজন আরেকজনকে বিশ্বাস করবে, ভালবাসবে, যৌন-জীবনকে হেফাযত করবে, বহির্মুখী হবে না। স্বামী স্ত্রীর ভরণ-পোষণ দেবে, তার জৈবিক মানসিক ও আত্মিক চাহিদা পূরণ করবে। স্ত্রী স্বামীর ধন-সম্পদের হেফাযত করবে, সন্তান-সন্ততি লালন পালন করবে। এগুলো হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অঘোষিত প্রতিশ্রুতি। বিবাহ বন্ধানে আবদ্ধ হওয়ার সাথে সাথেই তা কার্যকর হয়ে যায়। আর কিছু আছে ঘোষিত প্রতিশ্রুতি যেমন স্বামী কতৃêক স্ত্রীকে প্রদত্ত নির্ধারিত মোহরানা কিংবা বিবাহের শর্ত হিসাবে অন্যান্য প্রতিশ্রুতি। যতক্ষণ পর্যন্ত এসব ঘোষিত-অঘোষিত প্রতিশ্রুতি মেনে চলা হয়, ততক্ষণ এ ধরনের দম্পতির জীবনে কোনোরূপ অশান্তি বা ভাঙ্গন সৃষ্টি হয় না। এর ব্যত্যয় হলেই দেখা দেয় বিপত্তি।
অনুরূপভাবে পারিবারিক জীবনে পিতা-মাতা সন্তানের সাথে, সন্তান পিতা-মাতার সাথে, ভাই ভাইয়ের সাথে, বোন বোনের সাথে বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয়। পারিবারিক সুখ শান্তির জন্য সব ধরনের প্রতিশ্রুতি মেনে চলা আবশ্যক। যেসব প্রতিশ্রুতি পালন করা যাবে না, সেসব প্রতিশ্রুতি থেকে বিরত থাকতে হবে। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি যতো ছোটই হোক না কেন তা পরিহার করতে হবে। সন্তান যতো ছোটই হোক না কেন তার সাথে কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে তা যথাযথভাবে পালন করতে হবে। অন্যতায় প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শিক্ষা সন্তান তার পিতা-মাতার কাছ থেকেই লাভ করবে। যা কোনো পিতা-মাতার কাম্য নয়।
সমাজে চলতে গিয়ে মানুষকে বহু লোকের সাথে মিশতে হয়, কথা বলতে হয়, ওয়াদা করতে হয়। কর্মক্ষেত্রে বহু কাজ করা, না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য চলে প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে। রাজনীতিবিদরা জনগণের জন্য কত কিছু করার প্রতিজ্ঞা করেন, প্রতিশ্রুতি দেন। নির্বাচনের সময় তো এর সীমা-পরিসীমা থাকে না। বাস্তবে এসব প্রতিশ্রুতির অতি ক্ষুদ্র অংশ বাস্তবায়িত হয়। অধিকাংশই মিথ্যায় পর্যবসিত হয়। যা বাস্তবায়ন করা যাবে না তা জেনেও করার অঙ্গীকার করা শিষ্টাচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী- মিথ্যাচার। ইসলামে তা হারাম বা নিষিদ্ধ।
অঙ্গীকার রক্ষা করা আবশ্যক। তা সত্যবাদিতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে প্রতিশ্রুতি পালনকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছেঃ “এবং তোমরা প্রতিশ্রুতি পালন করবে, প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে তোমাদের নিকট কৈফিয়ৎ তলব করা হবে”। (১৭ : ৩৪) কুরআন মজীদের অন্য আয়াতে আল্লাহ্তা’আলা প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তির পরিচয় ও গুণাবলী উল্লেখপূর্বক বলেনঃ “এবং যারা নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে”। (২৩ : ৮) নেক আমল ও নেক বান্দাদের আলোচনা প্রসঙ্গে আল্লাহ্তা’আলা বলেনঃ “এবং প্রতিশ্রুতি দিলে তারা তা পূর্ণ করে”। (২ : ১৭৭)
মহনবী (সাঃ) বলেছেন, “ যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না দীন ইসলামে তার কোনো অংশ নেই। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা মুনাফিকের লক্ষণ।” এই প্রসঙ্গে মহানবী (সা) আরো বলেছেন, “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটিঃ ১· যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, ২· ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে এবং ৩· আমানত রাখলে খিয়ানত করে।”
প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা যেহেতু কুরআন-হাদীসে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং তা রক্ষা না করাকে মিথ্যা বলা ও মুনাফেকির লক্ষণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে সেহেতু কোনো বিষয়ে অকাট্য প্রতিশ্রুতি না করাই উত্তম। মহনবী (সাঃ) কাকেও কোনো কথা দেবার সময় বলতেন, “এটা করা আমার পক্ষে সম্ভব বলে মনে হয়।”
মানুষ সবচেয়ে বেশি ওয়াদা করে লেদদেনের ক্ষেত্রে। এর মধ্যে আছে টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত আদান-প্রদানের ওয়াদা আর দেয়া নেয়া ও এর পরিশোধের ওয়াদা। ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্রয়-বিক্রয়সহ প্রায় সমগ্র অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে বিশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে । এর মধ্যে কেউ যদি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, অপর পক্ষ হয়ে যায় নিঃস্ব-পথের কাঙ্গাল। এজন্য ইসলাম প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও আমানত-খেয়ানতকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছে এবং এসবকে মর্মন্তুদ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে।
মহানবী (সাঃ) বলেছেন, “তুমি তোমার ভাইয়ের সাথে ঝগড়া-বিবাদ করো না, তাকে নিয়ে কোনোরূপ ঠাট্টা-উপহাস করো না, আর তার সাথে এমন ওয়াদা করো না, যা তুমি ভঙ্গ করবে।”
ইসলাম মানুষকে যেসব অনুশাসন বা বিধি-বিধান অনুশীলন বা পালন করতে বলেছে তা দুই প্রকার। এক· মঙ্গল বিধানে নানারূপ প্রচেষ্টা, দুই· অমঙ্গল বিনাশে নানারূপ প্রয়াস। যাকে কুরআন মজীদে আমরি বিল মারূফ ওয়া নিহিস আনিল মুনকার অর্থাৎ সৎকাজে উৎসাহদান আর খারাপ কাজে বাধা প্রদান করতে বলা হয়েছে। প্রতিশ্রুতি পালন সৎকাজ, আর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ অসৎকাজ। আমানতদারী ও প্রতিশ্রুতি পালন মানুষের কল্যাণমুখী গুণগুলোর মধ্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। সত্য কথা বলা যেমন ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণের উপাদান, তেমনি প্রতিশ্রুতি পালনও কল্যাণের উপাদান এবং অবশ্য পালনীয় ধমীয় কর্ম। নবী করীম (সাঃ) বলেছেন- “লা ঈমানা লিমান লা আমানাতা লাহু ওয়ালা দীনা লিমান লা আহাদালাহু” অর্থাৎ যে আমানত প্রত্যর্পণ করে না, তার ঈমান নেই। আর যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না, তার কোনো ধর্মই নেই। সুতরাং আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা ঈমান ও ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহের অন্যতম।
আমরা অনেকেই বড় বড় কথা বলি, ওয়াদা করি, নেতা ও বড় কর্মকর্তা হলেতো কথাই নেই। কিন্তু তা রক্ষা করি না। বরং মনে করি এগুলো কোন দোষের নয়। অথচ আল্লাহতা’আলার নিকট ওয়াদা ভঙ্গ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে[ “আউফু বিল আহদে ইন্নাল আহদা কানা মাসউলা”- তোমাদের অঙ্গীকার পূরণ কর, নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্বন্ধে তোমাদের জিজ্ঞাসা করা হবে। নবী করীম (সাঃ) একবার প্রতিশ্রতি রক্ষার জন্য এক স্থানে একজন লোকের জন্য তিন দিন অপেক্ষা করেছিলেন। সুতরাং কথায় কথায় ওয়াদা করা, আর তা ভঙ্গ করার ফ্যাশন থেকে প্রতিটি মানুষের বিরত থাকা আবশ্যক। আর একজন আদর্শবান মুসলিমেরতো এর কোনো বিকল্পই নেই। ০
**************************
এম আ ব দু র র ব
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৫ এপ্রিল ২০০৮