মুসলিম সমাজে জুমার খুতবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। জুমার সালাত সাপ্তাহিক হওয়ায় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে লোকজন এতে উপস্থিত হন। জুমার দিনকে শ্রেষ্ঠ অভিহিত করা হয়। এ দিনটিতে দু’টি বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়। এক. সালাতুল জুমা, দুই. খুতবাতুল জুমা। সালাত সাধারণ নিয়মে আদায় করতে হয় বলে এতে ইমামের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার খুব একটা মূল্যায়ন করা হয় না। কিন্তু খোতবা বা ভাষণ সময়োপযোগী ও তথ্যপূর্ণ হওয়া চাই। এ বিবেচনা থেকেই জুমার খতিব হিসেবে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেয়ার চিন্তা করা হয়।
ইদানীং দেখা যায় বিভিন্ন জামে মসজিদে স্বতন্ত্রভাবে খতিব নিয়োগ করার প্রবণতা চালু হয়েছে। যার দায়িত্ব হলো জুমার খুতবা দান ও ইমামতি করা। বিশিষ্ট ‘আলিমগণকে এ পদে নিয়োগ করা হয়। একটি স্থানে অবস্থান করে যাদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে ইমামতি করা সম্ভব নয়, সপ্তাহে এক দিন হয় বলে তারা অনায়াসে এ দায়িত্ব পালন করতে দ্বিধাবোধ করেন না। এটি একটি ভালো উদ্যোগ। সুদূর আরব দেশগুলোতেও এ সিস্টেম চালু হয়েছে। এতে আমি একটি বিষয়ের প্রতি সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যে, গুরুত্বপূর্ণ মসজিদগুলোতে একাধিক খতিব হলে মুসলিম জনগণ উপকৃত হবেন। রাষ্ট্র ও সমাজ অনেক দিকনির্দেশনা লাভ করবে। কারণ সব মানুষের মধ্যে একটি সীমাবদ্ধতা কাজ করে। সবার প্রতিভাও সমান নয়। দৃষ্টিভঙ্গিতেও বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। একজন একটা কিছু ভাবেন তো অন্যজন অন্য কিছু ভাবেন। একজন একটা বিষয়ের প্রতি জোর দেন, তো অন্যজন তাকিদ করেন অন্য কিছুর প্রতি। অথচ সবই ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক জুমায় একজন একটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করলে অপর জুমায় অন্যজন অন্য বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেবেন। এতে নানা বিষয়ে মুসল্লিরা সচেতন হওয়ার সুযোগ পাবেন। কেউ ভাবেন সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে, কেউ ভাবেন অর্থনীতি নিয়ে, কেউ চান মানুষের ঈমান-আকিদা ঠিক হোক, আবার কেউ চান আমল-আখলাক সংশোধিত হোক। এক ব্যক্তি কিন্তু সব বিষয়ে অভিজ্ঞ হন না কেউ হন আল-কুরআনের তাফসির বিশেষজ্ঞ, কেউ হন হাদিসবিশারদ, কেউ তার মেধাকে ফিকহ শাস্ত্রের গবেষণায় নিবদ্ধ করেন। কিন্তু সবাই বক্তব্য উপস্থাপন করেন নিজস্ব ভাবভঙ্গিতে। সমাজে যার কাছে যা অতীব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় তিনি সেই আলোকেই কথা বলেন। ফলে একাধিক খতিব জুমায় নিয়োজিত থাকলে সমাজ ও রাষ্ট্র নানা দিক দিয়ে দিকনির্দেশনা পাবে। এ বাস্তবতার কারণেই মসজিদুল হারাম ও মসজিদুল নববিতে সম্ভবত একাধিক খতিব নিয়োজিত আছেন।
বাংলাদেশের কিছু ঐতিহ্যবাহী মসজিদে একাধিক খতিব রয়েছেন। যারা পালাক্রমে মসজিদে এসে খুতবা দিয়ে থাকেন। এ যদি হয় বাস্তবতা তাহলে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমে একাধিক খতিব নিয়োগ দিতে বাধা কোথায়?
পালাক্রমে খুতবা দানের কারণে দায়িত্বশীল খতিবের মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে খুতবায় নতুনত্বের অবতারণা করার প্রয়াস পেতেন। এতে মুসল্লিদের মাঝে নতুনত্বের স্বাদ গ্রহণ করার আগ্রহও সৃষ্টি হবে। একক খতিব হলে তার মাঝে একধরনের জড়তা দেখা যায়। একই বিষয় সব দিনের খুতবায় বারবার আওড়াতেও দেখা যায়। সচেতন মহলে তা অত্যন্ত শ্রুতিকটু হিসেবে বিবেচিত হয়। মুসলিম জনতা আশা করে গবেষণাসমৃদ্ধ সারগর্ভ খুতবা। কিন্তু একই ব্যক্তির কাছে প্রতিটি খুতবার দায়িত্ব থাকায় মুসলিম সমাজ বঞ্চিত হচ্ছে গবেষণার খোরাক থেকে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের প্রতি অনুরোধ এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে ভেবে দেখবেন। সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে সচেতন, কুরআন ও হাদিস বিষয়ে অভিজ্ঞ, বিশ্বপরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন এ ধরনের একদল নিবেদিতপ্রাণ খতিবকে জাতীয় মসজিদে নিয়োজিত করার প্রতি আমরা বিনয়ের সাথে আহ্বান জানাচ্ছি।
**************************
ফয়সল আহমদ জালালী
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৫ এপ্রিল ২০০৮