স্বাবলম্বী হওয়াকেই মূলত স্বনির্ভতা বলে। সে-ই একজন সুখী মানুষ যে নিজের পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো পূরণে সম্পূর্ণ সক্ষম। সাংসারিক ব্যয়, সন্তানের শিক্ষাদীক্ষা ও চিকিৎসাসহ মৌলিক প্রয়োজনাদি মিটিয়ে একজন গৃহস্বামী যদি সচ্ছল জীবনযাপন করতে পারে তবেই সে পার্থিবজীবনে একজন সুখী মানুষ। আর আল্লাহর কাছেও প্রিয় বান্দা হিসেবে পরিগণিত হবে যদি জীবনের সব কিছুকে সে ইবাদতের নিয়তে আল্লাহর বিধানানুযায়ী সম্পন্ন করতে পারে।
স্বনির্ভরতা তথা সচ্ছলভাবে জীবনযাপনকে ইসলাম যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ সংসারে সর্বদা অভাব-অনটন লেগে থাকলে খালেসভাবে নামাজ, রোজা তসবিহ-তাহালীল তথা ইবাদত-বন্দেগিতে মন বসে না। পরিবার-পরিজনের চাহিদা, সন্তানের আহাজারি হৃদয় মনকে বারবার বিষণ্ন করে তোলে। যার কারণে জীবনযাত্রার স্বাভাবিক ধারায় বিব্রতকর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। ভবিষ্যৎ বংশধরের জন্য তা অনিশ্চয়তার ভয়াবহ ইঙ্গিত বহন করে।
মহান আল্লাহপাক কুরআন মজিদের সূরা আন-নিসার ৯ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘এইরূপ লোকদের ভয় করা উচিত যারা পশ্চাতে একদল অসহায় সন্তান রেখে মারা যায় এবং সেই সন্তানদের জন্য তাদের আশঙ্কা থেকে যায়।’ তাদের উচিত আল্লাহকে ভয় করা ও সঠিক সঙ্গত কথা বলা’ (আল কুরআন)। সুতরাং ধনসম্পদবিহীন অসহায় সন্তানাদি রেখে যাওয়া একটি অসঙ্গত কাজ। বস্তুত চেষ্টা, সাধ্য ও পরিশ্রম করে ধনসম্পদ আয় করা উত্তম ইবাদত। এ জন্য প্রয়োজন জীবনের সবকিছুকেই পরিকল্পিত উপায়ে সাজানো। অপরিকল্পিত জীবন কাণ্ডারিহীন তরীর মতো। বিবাহ করার আগেই একজন স্বামীকে ভেবে দেখতে হবে সে তার স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণে সক্ষম কি না। যদি তিনি সক্ষম না হন তবে অবশ্যই তাকে স্বাবলম্বী বা স্বনির্ভরতা অর্জন করার জন্য চেষ্টা করতে হবে।
আমাদের এ কথা ভালোভাবেই অনুধাবন করতে হবে যে মানুষ যেমন একটি পেট নিয়ে জন্মগ্রহণ করে তেমনি তাকে আল্লাহতায়ালা দুটো হাত ও দুটো পা দিয়েছেন, যা দিয়ে সে বৈধভাবে জীবিকা অর্জন করে চলতে পারে। রিজিকের মালিক আল্লাহ। কিন্তু তা সংগ্রহের দায়িত্ব মানুষের। মানুষ চেষ্টা করে যতটুকু সংগ্রহ ও সঞ্চয় করতে পারবে সে ঠিক ততটুকুই ভোগ করতে পারবে। চেষ্টা করার এ দায়িত্ব যদি সে এড়িয়ে যায় তবে তার ভাগ্যবিপর্যয় দেখা দেয়াই স্বাভাবিক। আল্লাহপাক পবিত্র কুরআন মজীদে সূরা আর-রায়াদের ১১ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন নিশ্চয়ই আল্লাহপাক কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যে পর্যন্ত না তারা নিজেরাই নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করে।
আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ নিজ হাতে সাংসারিক যাবতীয় কাজ করেছেন। স্ত্রীদের কাজে সহযোগিতা করেছেন। নিজ হাতে মাটি কেটেছেন। কূপ থেকে পানি তুলে জীবিকা অর্জন করেছেন। একবার হুজুর সাঃ-এর কাছে এক দরিদ্র ব্যক্তি হতাশাগ্রস্ত মন নিয়ে উপস্থিত হলে হুজুর সাঃ তাকে প্রশ্ন করেন তোমার কি কোনো সম্বল আছে? লোকটি জবাব দিলো শুধু একখানা কম্বল ছাড়া আমার আর কোনো সম্বল নেই। নবীজি সেই কম্বলখানা নিয়ে আসতে বললেন। লোকটি তাই করল। অতঃপর হুজুর সাঃ তা বিক্রি করে নগদ খাদ্য ক্রয়ের জন্য যা আবশ্যক তা রেখে দিয়ে বাকি অর্থ দিয়ে তাকে একখানা কুঠার কিনে গাছ কেটে তা বিক্রি করে জীবিকা অর্জনের পরামর্শ দিলেন। লোকটি নবীজির কথামতো তা-ই করল। অবশেষে দেখা গেল তার আর অভাব থাকল না। তার জীবনে স্বনির্ভরতা ফিরে এলো। মানুষের জীবনে রোগব্যাধি ও নানা ধরনের বিপদ-আপদ আসতে পারে। পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহপাক মানুষকে এগুলো দিয়ে থাকেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের ভুলের জন্য তা ঘটে যায়। যে কারণেই হোক না কেন এ অবস্থায় হতাশাগ্রস্ত না হয়ে দৃঢ় মনোভাব নিয়ে বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য এক দিকে আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে, অন্য দিকে এ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালাতে হবে।
আমাদের দেশে মাঝে মধ্যে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। যা একটি বিপর্যয়কর ঘটনা। আমাদের উচিত বন্যা-পরবর্তী অবস্থায় সহানুভূতির মনোভাব নিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং যার যেটুকু সম্পদ থাকে তা নিয়ে চেষ্টা ও শ্রমের মাধ্যমে আবার স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসা। শুধু অপরের সাহায্যের ওপর নির্ভর না করে নিজ প্রচেষ্টায় স্বনির্ভর হওয়ার গুরুত্ব অনেক বেশি। অবশ্য সচ্ছল ব্যক্তিদেরও দায়িত্ব হলো এ ব্যাপারে বিপন্ন মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা। বিপদে-আপদে ধৈর্যহীনতা মুমিন ব্যক্তির জন্য শোভনীয় নয়। আল্লাহপাক কুরআনুল কারীমে ঘোষণা করেন -
নিশ্চয়ই বিপদের সাথে রয়েছে আসানি বা স্বস্তি। সুতরাং আমাদের জীবনে যখনই কোনো সমস্যা আসে তা সমাধানের জন্য নিজস্ব সম্পদ দিয়ে ধৈর্যসহকারে সমাধানের প্রচেষ্টা চালানো এবং আল্লাহপাকের কাছে নিজ ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে। তবেই আমরা ইনশাআল্লাহ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে অগ্রসর হতে সক্ষম হবো। মহান আল্লাহপাক আমাদের এ তৌফিক দান করুন।
**************************
মাওলানা মাকসুদুর রহমান মাহফুজী
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৫ এপ্রিল ২০০৮