অহংকার মানুষকে ধ্বংস করে। ঘৃণিত করে। সমাজে তার ওজন কমিয়ে দেয়। ভালো বুদ্ধি, যুক্তি ও চিন্তা সে গ্রহণ করতে পারে না। পাশাপাশি যিনি নিরহংকার তিনি সবার কাছে সম্মানিত, তাকে সবাই ভালোবাসে। আপন করে নেয়। তাছাড়া যিনি সুশিক্ষিত, মার্জিত ও জ্ঞানে টইটম্বুর তিনি ব্যবহারে প্রোজ্বল। তিনি কাউকে খাটো করে দেখেন না। অন্যের সৃষ্টি, যোগ্যতা ও চেষ্টাকে মূল্যায়ন করেন ন্যায় যুক্তির আলোকে। আমাদের সমাজের অহংকারী মানুষের প্রচণ্ড প্রতাপ। পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম অহংকার ও দাম্ভিকতা প্রদর্শন করেছে শয়তান। কোরআনের ভাষায় তার বক্তব্য হল-  আমি (আদম আ•) তার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। কারণ আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদা দিয়ে। (সূরাঃ আরাফ, আয়াত-১২)। শয়তানের এ ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তির পর মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, তুমি এখান থেকে বেরিয়ে যাও। এখানে অহংকার করার অধিকার তোমার নেই। অতএব তুমি যাও। তুমি অধমদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরাঃ আরাফ, আয়াত-১৩)। অহংকারীদের কেউই পছন্দ করে না। আর মহান আল্লাহতায়ালা তো অহংকারমুক্ত জীবন গঠনের আহ্বান জানিয়ে ঘোষণাই করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা অহংকারী ও দাম্ভিককে পছন্দ করেন না।’ (সূরাঃ নিসা, আয়াত-৩৬)।

আমরা যদি অহংকারমুক্ত জীবন গঠন করতে পারি তাহলে আমরা হব সমাজের সুন্দর। মানুষ, পশুপাখি এমনকি জমিন পর্য- আমাদের আচরণে কষ্ট পাবে না। সূরা লুকমানের আঠার নম্বর আয়াতে মহানআল্লাহ কী সুন্দর বলেছেন, ‘অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না। আর পৃথিবীতে ঔদ্ধত্যভাবে বিচরণ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন ঔদ্ধত্য, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ একজন সুশীল ও চিন্তাশীল মানুষ কখনও অহংকারী হতে পারে না। অহংকারীরা কোন দিন জান্নাতেও যাবে না। আমাদের প্রিয় নবীজী বলেছেন, এমন কোন ব্যক্তি দোজখে প্রবেশ করবে না যার হৃদয়ে সরিষা পরিমাণ ঈমান থাকবে। পক্ষান্তরে এমন কোন ব্যক্তিও বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না যার অন্তরে সরিষা পরিমাণ অহংকার থাকবে। (মুসলিম)। মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে নবীজী বলেছেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে তিনি বেহেশতে প্রবেশ করবেন না। তখন এক ব্যক্তি বললেন, প্রত্যেকেই তো এটি পছন্দ করে তার কাপড় সুন্দর হোক এবং জুতা সুন্দর হোক। এটাও কি অহংকারের অন্তর্ভুক্ত? জবাবে নবীজী বললেন, আল্লাহতায়ালা নিজেও সুন্দর এবং সুন্দরকে পছন্দ করেন (কাজেই সুন্দর পোশাক এবং সুন্দর জুতা অহংকারের অন্তর্ভুক্ত নয়)। বাস্তবে অহংকার হল দম্ভের সঙ্গে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে হেয় ও তুচ্ছজ্ঞান করা। বিশিষ্ট দার্শনিক ইমাম গাজ্জালী (রহ•) বলেছেন, মুসলমানদের নির্ধারিত যে চরিত্র রয়েছে তা হল বেহেশতের দরজা। কিন্তু অহংকার এসব দরজাকে বন্ধ করে দেয়। তাই অহংকারী বেহেশতে যেতে পারবে না। (সীরাতুননবী)।

নিজেকে সংযত রেখে সুন্দর জীবন গঠন করার জন্য অহংকারমুক্ত জীবন গঠন খুবই জরুরি। হাদিসে আছে, দোজখের মধ্যে ‘হাবহাব’ নামক এক উপত্যকা রয়েছে যেখানে অহংকারী ও দাম্ভিক লোকদের স্থান দেয়াই সমীচীন। আমরা সাধারণত বংশ, ধনদৌলত, রূপলাবণ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, সন্তান-সন্ততি, নিজের কর্ম ইত্যাদির ওপর অহংকার করে থাকি। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের ভাষ্যমতে, এসব কোন দাবি ও অহংকারের উপকরণ হতে পারে না। জাহেলি যুগের এ প্রবণতাকে ঈমান ও ইসলামের সৌন্দর্য দিয়ে ধূলিসাৎ করে দিতে পারি। তাহলেই আমরা প্রকৃত মুমিন বান্দা ও সমাজের একজন নিষ্ঠাবান সুন্দর মানুষে পরিণত হতে পারব। আসুন আমরা দাম্ভিকতা পরিহার করি।

**************************
মা স উ দু ল কা দি র
যুগান্তর, ০৯ মে ২০০৮