আল্লাহ পাক নারীকে মায়ের মর্যাদা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। মা তার মাতৃত্বের কারণে শ্রদ্ধা, সম্মান ও সুন্দর আচরণ পাওয়ার হকদার। তাই ‘মা’ নারী ও পুরুষ সবার কাছে মর্যাদার স্বর্ণশিখরে অধিষ্ঠিত। এ নিখিল বিশ্বে মায়ের কোল হচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। মাতৃস্নেহ এক জান্নাতি নিয়ামত। ‘মা’ স্নেহের পরশ দিয়ে সন্তানাদির হৃদয়কোণে স্বস্তি, সান্ত্বনা ও প্রশান্তি উপহার দেয়। সন্তানকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। নয় মাস গর্ভে ধারণ করে ‘মা’ তার কলিজার টুকরোকে হৃদয়ের তন্ত্রী ছিঁড়ে অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করে জীবন-মরণের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে প্রসব বেদনার অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে এ উন্মুক্ত পৃথিবীতে ভূমিষ্ট করেন। জন্মের দু’বছর ধরে বুকের মধুময় পিযুশ পান করিয়ে তিল তিল করে বড় করে তোলেন। মায়ের এ কষ্ট তাকে নিজেকে বহন করতে হয়। কোনো পুরুষ এ কষ্টের ভাগীদার হতে চাইলেও সম্ভব নয়। তাই মায়ের সম্মান, ইজ্জত ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিতকল্পে ইসলাম চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে বলেছে ‘মায়ের পদতলে পুরুষ জাতির বেহেশত’। মায়ের মর্যাদার এ সুমহান স্লোগান ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম বা মতাদর্শ প্রদান করেনি। তাই সর্বাগ্রে আল্লাহর ইবাদত, এরপর মায়ের খিদমত। এটা আসমানি বিধান।
আল্লাহপাক বলেছেন
‘তোমার রব সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত কোরো না। আর তোমার মা-বাবার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের মধ্যে একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না বরং তাদের সাথে ভদ্রোচিত কথা বলো’।
আল্লাহপাক অন্যত্র বলেছেন ‘আর ইবাদত করো আল্লাহর, শরিক কোরো না তার সাথে অপর কাউকে। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার করো’। পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ প্রসঙ্গে হাদিস শরিফে এসেছে
‘হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ বলেন, আমি রাসূল সাঃ-কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা পছন্দনীয় আমল কি? তিনি বললেনঃ সময়মতো নামাজ পড়া। আমি বললাম, তারপর কি? তিনি বললেনঃ পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করা। আমি বললামঃ অতঃপর কোন আমল? তিনি বললেনঃ আল্লাহর পথে জিহাদ করা’।
রাসূল সাঃ আরো বলেছেন
‘হজরত মুয়াবিয়া ইবনে জাহিমা সালামী রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূল সাঃ-এর কাছে এসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার সাথে জিহাদে শরিক হতে চাই, যাতে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের মঙ্গল লাভ করব। তিনি বললেনঃ আফসোস তোমার জন্য, তোমার কি মা জীবিত আছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ ফিরে যাও, গিয়ে তার খিদমত করো... আফসোস তোমার জন্য। তার পায়ের কাছে পড়ে থাকো, সেখানেই জান্নাত’।
‘হজরত মা’আয ইবনে জাবাল রাঃ বলেন, ‘রাসূল সাঃ দশটি অসিয়ত করেছিলেন। তন্মধ্যে ১. আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না, যদি তোমাদের সে জন্য হত্যা কিংবা অগ্নিদগ্ধ করা হয়। ২. নিজের পিতা-মাতার নাফরমানি কিংবা তাদের মনে কষ্ট দেবে না, যদি তারা এমন নির্দেশও দিয়ে দেন যে, তোমরা তোমাদের পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ ত্যাগ করো’।
হজরত আবু উমামা রাঃ থেকে বর্ণিত। ‘এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সন্তানের ওপর পিতা-মাতার কি হক রয়েছে? উত্তরে তিনি বললেন, তারা দু’জন তোমার জান্নাত ও জাহান্নাম’।
‘রাসূল সাঃ বলেছেন, যে পুত্র স্বীয় পিতা-মাতার অনুগত, সে যখনই নিজের পিতা-মাতার প্রতি সম্মান ও মহব্বতের দৃষ্টিতে তাকায়, তখন প্রতিটি দৃষ্টিতে সে একটি করে কবুল হজের সাওয়াবপ্রাপ্ত হয়’।
পিতা-মাতার খুশি ও অখুশির সাথে আল্লাহ পাকের খুশি-অখুশি জড়িত। এ প্রসঙ্গে রাসূল সাঃ বলেছেন ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির মধ্যেই নিহিত’।
ইসলাম মায়ের মর্যাদাকে বাবার মর্যাদার সমান করেনি; বরং মায়ের মর্যাদা বাবার মর্যাদার চেয়ে তিন গুণ বেশি বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ প্রত্যেক মা বাবার চেয়ে তিনটি বিষয়ে কষ্ট বেশি করে থাকেন। ১. গর্ভে ধারণ করে নিজ শরীর ক্ষয় করে সন্তানের দেহাকৃতি দান করেন। ২. মৃত্যুসম কষ্ট সহ্য করে সন্তান প্রসব করেন। ৩. নিজ শরীরের রক্ত-গোশত গলানো বুকের অমৃত সুধা পান করিয়ে সন্তানকে প্রতিপালন করেন।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাক বলেছেন
‘আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টসহকারে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্টসহকারে প্রসব করেছে। তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও দুধ ছাড়তে সময় লেগেছে ত্রিশ মাস’।
হাদিসে এসেছে ‘হজরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি (মুয়াবিয়া ইবনে হীদা আল-কুরাইশী) রাসূল সাঃ-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার উত্তম আচরণ পাওয়ার অধিক হকদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি বললেন, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। অতঃপর লোকটি বললেন তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। অতঃপর লোকটি বললেন তারপর কে? তিনি বললেন তোমার বাবা’। এখানে বাবার মর্যাদার চেয়ে মায়ের মর্যাদা তিন পয়েন্ট বেশি বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ইসলাম মায়ের জাতকে কতখানি মর্যাদা দিয়েছে তার প্রমাণ রাসূল সাঃ-এর ওই বাণীতে পাওয়া যায়। ‘এক ব্যক্তি রাসূল সাঃ-এর কাছে গিয়ে বললেন হে আল্লাহর রাসূল, আমি একটি বড় পাপ করেছি। আমার কি তওবার কোনো সুযোগ আছে? রাসূল সাঃ বললেন, তোমার কি মা আছে? লোকটি বললেনঃ না। রাসূল সাঃ আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার কি খালা আছে? লোকটি বললেনঃ হ্যাঁ, আছে। রাসূল সাঃ বললেন, তোমার তওবা আল্লাহর কাছে কবুল করার জন্য তোমার খালার সেবা করো’।
এ প্রসঙ্গে আরো একটি বর্ণনা আছে ‘এক ব্যক্তি রাসূল সাঃ-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! জিহাদে যেতে চাই, এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী? রাসূল সাঃ বললেন, তোমার কি মা আছে? উত্তরে লোকটি বললেন, হ্যাঁ আছে। তখন রাসূল সাঃ বললেন তাহলে তুমি তোমার মায়ের সেবা করো। কেননা মায়ের পায়ের নিচেই জান্নাত’।
সুতরাং প্রমাণিত হলো পুরুষ জাতির তুলনায় নারী জাতির মর্যাদা ইসলাম কত বেশি ঘোষণা করেছে। এ পৃথিবীতে ‘মা’ ডাকের ন্যায় মিষ্টি মধুর ডাক আর দ্বিতীয়টি নেই। ‘মা’ ডাকে যত তৃপ্তি, যত প্রশান্তি পৃথিবীজুড়ে তা আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই মায়ের অধিকার আদায় করা সন্তানের ওপর ফরজ। এ অধিকার আদায়ে অবহেলা করা কবিরা গোনাহ।
প্রত্যেক মা-ই নারী। কিন্তু প্রত্যেক নারী ‘মা’ নন। মা হওয়া আল্লাহ-প্রদত্ত অনুগ্রহ। তাই এর শুকরিয়া আদায়ের লক্ষ্যে তার দায়িত্বানুভূতির আলোকে স্বীয় কর্তব্য পালনে এগিয়ে আসতে হবে। মায়ের যেমন মর্যাদা বেশি, তেমনি মায়ের দায়িত্বও বেশি। মায়ের কাজ হলো মানব বাগানে ফুল প্রস্ফুটিত করা, মানব বংশ সম্প্রসারণ সংরক্ষণ ও প্রসূত সন্তানের জীবনকে সুন্দর পরিপাটি ও পরিমার্জিত করে গড়ে তোলা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সাচ্চা মুসলিম, সচ্চরিত্রবান, সৎ ও যোগ্যতম সুনাগরিক এবং আদর্শ দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তোলা। একটি শিশুর সুষ্ঠু প্রতিপালনের ওপর নির্ভর করে তার ভবিষ্যৎ। যে প্রজন্মের ওপর রাষ্ট্রভার থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি গুরুদায়িত্ব অর্পিত হবে, তাদের লালন-পালন যদি সুষ্ঠু, সুন্দর ও আদর্শিক না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মই শুধু বিনষ্ট নয়, সুখী-সমৃদ্ধশালী ও কল্যাণকর সমাজ উপহার দেয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।
কাজেই আল্লাহর সৃষ্টির উদ্দেশ্য সার্থক করতে ‘মা’ তার দায়িত্ব পালন করবেন। আর সন্তানরা মায়ের অধিকার আদায়ে তার ভরণ-পোষণ, সেবা-যত্ন, দেখাশোনাসহ যাবতীয় হক আদায়ে দিবানিশি সজাগ দৃষ্টি পালন করবেন। জীবিত অবস্থায় যেমন তার সুখী জীবন ও কল্যাণ কামনা করতে হবে, তেমনি তার মৃত্যুর পরও সুখী জীবন ও কল্যাণ কামনার দোয়া করতে হবে। আল্লাহপাক এ দোয়ার পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়ে বলেছেন বলুন! ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগিরা’। হে প্রভু! তাদের (পিতা-মাতা) উভয়ের প্রতি রহম করো, যেমন তারা আমাকে শিশুকালে লালন-পালন করেছেন।’
**************************
মাওলানা মিনহাজুল ইসলাম
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ০৯ মে ২০০৮