কোনো প্রকার রাখঢাক আর ভূমিকার অবতারণা না করেই জীবনবিধান আল কুরআন একাধিক আয়াতে ধনীর অর্জিত, প্রাপ্ত সম্পত্তিতে গরিব, নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্তদের ন্যায্য অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান করেছে। আশির চেয়েও বেশি বার জাকাত প্রদানের নির্দেশ করেছেন আল্লাহ পাক আল কুরআনে। এ ব্যাপারে আল কুরআনের আদেশের ভাষাও অকাট্য ও কঠোর যেমন ‘ওদের সম্পদ ও সম্পত্তিতে ভিখারি আর নিঃস্বদের হক অবশ্যই রয়ে গেছে।’ আবার আরো একধাপ অগ্রসর হয়ে আল কুরআন স্বাভাবিক দান খয়রাত, সাহায্য সহযোগিতার হাত এমন ব্যক্তির দিকে বাড়ানোর নির্দেশ দিয়ে বলেছে, যে অভাবগ্রস্ত, মাঝপথে আটকে যাওয়া লাজুক মানুষটি যে কারো কাছে হাত পাতে না আবার তার চালচলনে অভাব অনটনের তেমন ছাপ লক্ষিতও হয় না অথচ সত্যিকার অর্থে সে দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত, তাকে দান করাই মানবিক কর্তব্য।
আল কুরআনের প্রথম সূরার প্রথম অধ্যায়েই দান করাকে (ক্ষমতানুযায়ী) ঈমানের জন্য অবশ্য কর্তব্য বলে অভিহিত করা হয়েছে। যেমনভাবে করা হয়েছে নামাজ আদায় করাকে। ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তির কঠোর নিন্দা জানিয়েছে। ভিক্ষাবৃত্তি মানুষের মানবিক গুণগুলোকে ধ্বংস করে আলস্যের দুয়ার খুলে দেয়। তাই জীবনবিধান আল কুরআন যেখানেই নামাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে সাথে সাথেই সেখানে জাকাতের নির্দেশও প্রদান করেছে। তা ছাড়া আল কুরআন উৎসাহ প্রদান করেছে বিভিন্ন ধরনের দানে। যেমন রোজার কাজাস্বরূপ গরিব-দুঃখীদের খাদ্য বিতরণ। মহানবী মুহাম্মাদ সাঃ বলেছেন, ছদকা (বিশেষ দান) বিপদ সঙ্কটকে দূর করে, দাতার আয়ু বৃদ্ধি করে ইত্যাদি।
এক দিকে মহানবী সাঃ বায়তুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) প্রতিষ্ঠা তথা তার মাধ্যমে জাকাত-উশর ইত্যাদির বাস্তবায়ন করেছেন তেমনি সমাজের উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ভেঙে নামাজের জামাতের সারিতে সবাইকে সমমর্যাদার অধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সদা তৎপর ছিলেন। অন্য দিকে কাউকে ভিক্ষা করতে দেখলে তাকে কাজে লাগিয়ে দিতেন, কাজের পরামর্শ প্রদান করতেন। একবার এক ব্যক্তিকে ভিক্ষা করতে দেখে, তাকে কাছে ডেকে জানতে চাইলেন তার ঘরে কী কী জিনিস আছে। লোকটি তার উত্তরে জানাল যে তার শুধু একটি কম্বল আছে। তিনি তা সংগ্রহ করে বিক্রয় করিয়ে তার মূল্যের কিছু টাকা দিয়ে কুড়াল কিনে দিয়ে বললেন পাহাড় থেকে কাঠ কেটে তা বাজারে বিক্রয় করে পেট চালাও এবং যেদিন তা পারবে না সে দিনের জন্যও কিছু টাকা তার হাতে গুঁজে দিলেন।
আমাদের অনেকে সত্যকে জানতে ভালোবাসেন, কিন্তু যে সত্য বিকৃত ধর্মবিশ্বাসের বাহন হয় তার প্রকাশ করা আমরা বরদাস্ত করি না। ইতিহাস বড়ই নির্মম, নিষ্ঠুর, কঠোর তা তার একান্ত ভক্তজনকেও রেহাই দেয় না।
আমাদের বিশ্বাস, মহানবী সাঃ-এর সাহাবিরা লক্ষ্য ও চরিত্রের দিক থেকে উন্নত এবং মানবিক গুণসম্পন্ন ছিলেন। কেউ কেউ মানবিক দুর্বলতার শিকারও ছিলেন। সৃষ্টিগত কারণে তারাও ক্ষুৎপিপাসার অধীন ছিলেন, এমনকি যৌনতা যা মানুষের জৈবিক চাহিদা তা তাদের প্রাকৃতিক কারণে বেশিই ছিল কারণ তারা ছিলেন গোশতভোজী। মহানবী সাঃ বলেছিলেন যে, দোহাই তোমরা আমার সাহাবিদের দোষ অনুসন্ধান করো না, তা কিন্তু ছিল ঐচ্ছিক নির্দেশ। যাই হোক মহানবীর একজন সাহাবি। যার নাম ছিল কিরকিরা। একবার চুরির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে গেলে তাকে মহানবীর সম্মুখে উপস্থিত করা হলে তিনি আল্লাহর কিতাব আল কুরআনের আদেশ কার্যকর করলেন। বললেন, ওর দু’হাত কেটে দাও। ওকে হাত কাটতে নিয়ে যাওয়া হলে আদেশদাতাকে কাঁদতে দেখা গেল। সাহাবিরা তার কারণ জানতে চেয়ে বললেন, আপনি তো ওকে হাত কাটার নির্দেশ না দিয়ে বরং দোয়া করে ওর পাপ মোচন করিয়ে নিতে পারতেন। মহানবীর উত্তর ছিল বড়ই গভীর তিনি সে দিন বলেছিলেন, আমি ওর জন্য কাঁদছি না, বরং আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবছি যে, তোমাদেরই জামাতের, মিল্লাতের একজন চৌর্যবৃত্তিতে পা দেয়ার অবস্থায় উপনীত হলো, অথচ তোমরা তা বুঝতে পারলে না... আমি কী ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করলাম? মহানবী সাঃ বলেছিলেন, ‘এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই’। আরো বলেছিলেন ‘তোমরা একটি দেয়ালের গাঁথুনি করা ইটের মতো একটু হেলে পড়লে আস্ত দেয়ালটিই ভেঙে যেতে বাধ্য।’ আরো বলেছিলেন, ‘তোমরা পরস্পর একটি হাতের পাঁচটি আঙুলের মতোই সম্পর্কযুক্ত। একটি আঙুল কাটলে অপরটিতেও বেদনা সঞ্চারিত হয়।’
একজন মুসলমান বিপদগ্রস্ত হলে অপরজন বুঝতে, জানতে পারতেন অবশ্যই। কিন্তু আজ! মসজিদের জামাতের সারিতে দিনে পাঁচবার উপস্থিতি অবশ্যই বাড়ছে, মানুষের মাথাপিছু আয়ও বাড়ছে তবু কেন পেটের দায়ে কিছু লোককে ভিক্ষা করতে দেখা যায়? পেটের দায়ে নারীদের অনেকে আজ বেশ্যালয়ের পথে পা দিচ্ছেন? আমরা যথাসম্ভব দান করি, মুষ্টিভিক্ষাও দিই কিন্তু ওদের এ দুরবস্থার স্থায়ী উন্নতি বিধানের কোনো চিন্তাই করি না। বরং উল্টো ওদের এ দুরবস্থার জন্য ওদের চারিত্রিক কোনো দুর্বলতার দিক দায়ী করি।
সৃষ্টিকর্তা খালিক ও মালিক, দয়াবান, মেহেরবান আল্লাহ পাক তার একান্ত ও নিজস্ব বাণীতে বলেছেন, মানুষ ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ অর্থাৎ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। তাই সৃষ্টির এক অংশ অন্য অংশের কাছে হাত পাতবে, এতে মানবতা আর ইনছানিয়াতেরই অবমাননা, তাই ইসলামে ভিক্ষাবৃত্তির কোনো স্থানই নেই।
প্রকৃতিগত কারণে বিপদগ্রস্ত, পঙ্গু রোগীদের জন্য রেখে দিয়েছেন ধনী বিবেকবান মানবসমাজ, যাদের বলে দেয়া হয়েছে ‘সৃষ্টির সেবা মানেই স্রষ্টার সেবা’। কবি এ রূপই বলে গেলেন ‘জীবে প্রেম করে যে জন, সে জন সেবিছে ঈশ্বর’। ইসলাম, জীবনবিধান আল ইসলাম বিভিন্নভাবে সমাজেরই এসব পক্ষাঘাতিক জনদের দৃষ্টিতে রাখার ব্যবস্থা করেছিল যা আজ শুধু কথার ফানুস। ‘চল্লিশ বাড়ির ভেতরে যে কেউ উপোস করলে আর তুমি উদরপূর্তি করে খেলে তুমি কখনো মুমিন হতে পারবে না’। (আল হাদিস)
রাষ্ট্রীয়ভাবে হুকুমাতে ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠিত বায়তুলমাল, জাকাত, উশর প্রভৃতির মাধ্যমে সমাজে সৃষ্ট উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ভেঙে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন মহানবী সাঃ। আজকের মসজিদের প্রতিষ্ঠিত জামাতগুলো তারই অনুপূরক ছিল। সেগুলো আজ শুধু খোলসেই জীবিত। ত্রিশ পারা কুরআন শরিফের ৬৬৬৬টি আয়াত মানবজীবনকেই সুপথে সাম্যে পরিচালিত প্রতিষ্ঠিতকরণেরই এক জীবন্ত ও যুগান্তকারী ব্যবস্থাপত্র ছিল। যা আজ দুনিয়ার আলো-বাতাস থেকে সরে গিয়ে লোহা-তামার কবচে দুরারোগ্য শিশু আর রোগীর গলার মালা হয়ে শোভা বর্ধন করছে। জীবিতকে নয় মৃতের আত্মার সদগতির জন্যই পঠিত হচ্ছে মাত্র।
জীবনবিধান আল কুরআনে নামাজের পরপরই যতবার নামাজের নির্দেশ এসেছে প্রায় ততবারই জাকাতের নির্দেশ রয়েছে। বিশ্বের এ যাবৎকালের প্রতিটি ধর্মগ্রন্থের তুলনামূলক অধ্যয়নে জানা যায়, একমাত্র জাকাত বিধানের জন্যই আল কুরআন অন্য সব ধর্মগ্রন্থ থেকে আলাদা ও অনন্য মর্যাদার অধিকারী! তা ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন প্রকার দান খয়রাত। এত সবের পরও বলতে বাধা নেই, কোনো লজ্জাও নেই, দ্বিধা-সঙ্কোচ যে মুসলিম মিল্লাতেই ভিক্ষুকের এত ছড়াছড়ি। ধর্মগ্রন্থগুলোতে শুধু বিধান থাকলেই চলবে না প্রথমত এগুলোকে বুঝতে ভুল হয়, বাঁকা অর্থ গ্রহণ করা হয় কোথাও বা অবজ্ঞাও করা হয়।
মহানবী সাঃ-কে একজন সাহাবি বলেছিলেন ইসলামকে জানার পথ কী? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছিলেন, ‘কুরআন পড়ো। তাতেও যদি না বুঝ তবে আমি কী বলি তা শোন তাও যদি না বুঝ, তবে আমি কী করি তা দেখে নাও।’
আল্লাহর কিতাব বান্দাহদের যেসব অধিকার প্রদান করেছিল, বেশধারী ব্যক্তিরা সেসব বঞ্চিত-পীড়িত, মজলুম, মাহরুম জনতাদের তা পাইয়ে না দিয়ে ওরা নিজেদের প্রভাব আর অধিকারই ওদের ওপর বিস্তার করতে উদ্যোগী।
**************************
আফতাব চৌধুরী
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ০৯ মে ২০০৮