- Home
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
- ধৈর্যের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
ধৈর্যের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
- By Article Poster
- Published 05/9/2008
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
-
Rating:




মানবজীবনে সবরের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনস্বীকার্য। চাই সে মুসলিম কিংবা অমুসলিম হোক। সবর শব্দটি আরবি। এটি একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বাধা দেয়া, বিরত রাখা, বেঁধে রাখা, ধৈর্য-সহ্য, সহিষ্ণুতা মেজাজের ভারসাম্যতা, আত্মসংযম, অটল-অবিচল থাকা ইত্যাদি। আর পারিভাষিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবরের অর্থ হচ্ছে যুগের পরবর্তিত পরিবেশে নিজের মন-মেজাজের ভারসাম্য রক্ষা করে চলা, সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজের মন-মেজাজকে পরিবর্তন না করে বরং সর্বাবস্থায়ই এক সুস্থ ও যুক্তিসঙ্গত আচরণ রক্ষা করে চলা। (কুরআন ও হাদীস সঞ্চয়নঃ মাওঃ আতিকুর রহমান)
উদ্বেগ ও মনস্তাপহীনভাবে হৃষ্টচিত্তে সহ্য করা, অনাকাঙিক্ষত বস্তুর কারণে উদ্বেগ না করে ধৈর্য ধারণ করা, কাঙিক্ষত বস্তু হারানোর দরুন ব্যথিত না হয়ে ধৈর্য ধরা (কুরআনের পরিভাষাঃ ড• মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান)
এক কথায় কাঙিক্ষত কোন কিছু পাওয়ার নিমিত্ত ব্যথিত কিংবা হা-হুতাশ না করে একটা চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে অপেক্ষা করার নামই হচ্ছে ধৈর্য। তবে কোন অবাস্তব কিংবা যা পাওয়া দুঃসাধ্য তা পাওয়ার প্রচেষ্টা চালানো উচিত নয়। যা হবার নয় তা পাওয়ার জন্য কষ্ট করলে তা বৃথা যাবে। ধৈর্যেরও বাঁধ ভাঙবে। সুতরাং এমন চেষ্টা চালানো উচিত নয় যা মানুষকে কষ্টেই নিপতিত করবে। শুধু দুঃখই বয়ে আনবে, তবু কাঙিক্ষত বস্তু অর্জিত হবে না।
সবর শব্দটি কুরআনুল কারীমে বিভিন্নভাবে এসেছে। যার যোগফল দাঁড়ায় ১০২। অর্থাৎ ১০২ বার সবর শব্দটি পবিত্র কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে। মহান আল্লাহর একটি অন্যতম নাম সাবূর; এর অর্থ কুদরত থাকা সত্ত্বেও বান্দার পাপের শাস্তিদানে ত্বরাকারী নন। (কুরআনের পরিভাষাঃ ১৪০ পৃঃ) সূরা ফাতাহতে এ সবূর শব্দের ব্যবহার রয়েছে।
আল কুরআনে সবরের গুরুত্বের কথা বলতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন- তুমি কেবল তাই অনুসরণ করো, যা অহীর সাহায্যে তোমার কাছে পাঠানো হয়েছে। আর সবর অবলম্বন করতে থাকো, যতক্ষণ না আল্লাহ চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেন। (সূরা ইউনুসঃ ১০৯)
অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে-অতএব তোমার রবের ফয়সালা আসা পর্যন্ত সবর অবলম্বন করো এবং মাছওয়ালা ইউনুসের মতো (অধৈর্য) হয়ো না। (আল কলমঃ৪৮)
সামাজিক জীবনে কাজকর্মে বিভিন্ন বাধা-প্রতিবন্ধকতা আসতেই পারে সে কাজটি যদি হয় মহৎ, তাহলে সকল বাধা ডিঙ্গিয়ে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মহান আল্লাহ এ সকল প্রচেষ্টাকারীদের একদিন বিজয়ী করবেন। যার প্রমাণ বাকারার ২৪৯ নং আয়াত। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- এমন ঘটনা বহু নবীর রয়েছে যে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে একটি ক্ষুদ্রতম দল একটি বৃহৎ দলের ওপর বিজয়ী হয়েছে। মূলতঃ আল্লাহ সাবিরদের সাথেই রয়েছেন। যারা মুসলমান তাদের সবর অবলম্বন করার নীতি শিক্ষা দিয়ে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন। সালাতের কথা এজন্য বলা হয়েছে, কারণ সালাতের সময়ই আল্লাহ বান্দার অতি নিকটবর্তী হয়।
আজকের সমাজে নানারকম অশান্তি, বিশৃঙ্খলা, বিপর্যয় একটার পর একটা লেগেই আছে। অভাব-অনটনে মানুষ দিশেহারা। সূর্যের তীর্যক আলোক রশ্মিতে মানুষের দেহ-মন পুড়ে ছারখার হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির অভাবে ডায়রিয়াসহ নানারোগের প্রাদুর্ভাব হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবন নাভীশ্বাস। এ সময় আমাদের ধৈর্য ধরে একটা ভাল পরিণতির জন্য প্রচেষ্টা চালানোর মাধ্যমে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কীবা করার আছে। মারামারি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, বিশৃঙ্খলা শুধু অশান্তিই ডেকে আনে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী, দুশমন সমাজের, দুশমন মানুষের, দুশমন আল্লাহর। মহান আল্লাহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের উদ্দেশ্য করে বলেন- যারা আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ফাসাদ করে বেড়ায় তাদের শাস্তি হল তাদের হত্যা করা অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা, অথবা বিপরীত দিক হতে তাদের হাত ও পা কেটে দেয়া অথবা দেশান্তরিত করা। (সুরা মায়েদাঃ ৩৩) অন্য আয়াতে আছে- তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালবাসেন না। ক্ষুধা, দারিদ্র্য যখন তুঙ্গে সেদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন- আমি অবশ্যই তোমাদের ভয় ও ক্ষুধা দিয়ে এবং তোমাদের জান, মাল ও শস্যেরহানি করে পরীক্ষা করব। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুখবর দিন। (সুরা বাকারাঃ ১৫৫) কবি বলেন- ‘মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।’ মহান আল্লাহ তো বহু আগেই ঘোষণা করেন-দুঃখের পরে সুখ আসে। (সুরা আলাম নাশরাহ) দুঃখের পর যে সুখ আসে তার বাস্তব প্রমাণ আজকের সারাদেশের বোরো ধানের বাম্পার ফলন। এখন এগুলো আমাদের যথাযথভাবে হিফাযত করলেই হয়। ধৈর্যধারীদের সুফল একদিন আসবেই। এটি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি। ব্যক্তি কিংবা সামাজিক জীবনে সফলতা পেতে হলে ধৈর্যের বিকল্প নেই।
ধৈর্যধারণের ফযিলত, তাৎপর্য বা পরিণতিও অনেক। ধৈর্যধারণে যেমন দুনিয়ায় বয়ে আনে কল্যাণ অনুরূপ অনন্ত আখিরাতেও। সুরা আছরের সার অর্থ হচ্ছে মানুষের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত। তবে যারা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং ধৈর্যধারণ করে তারা ব্যতীত।
কোন ব্যক্তি কারো ওপর অন্যায়ের কারণে প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হবার পরও তাদের ক্ষমা করে দেয় তারাই বড় বীর। রাসূল (সাঃ)-এর বিভিন্ন হাদিস সে কথারই ইঙ্গিত করে। মহান আল্লাহ বলেন- যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করে এবং ক্ষমা করে দেয় তা তার সাহসিকতার পরিচায়ক। (সুরা শুরাঃ ৪৩) ইতিহাস কিংবা সীরাতে নববীর দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাই মক্কা বিজয়ের পর রাসূল (সাঃ) সকল দুশমনদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে উদার মনের পরিচয় দিয়েছেন। যেসব লোক তায়েফের মাটিতে রাসূলকে মেরে রক্তে রঞ্জিত করেছে, নামাযের সিজদায় ঘাড়ের ওপর উটের নাড়ীভূঁড়ি চাপিয়ে দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ইচ্ছে করলে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু রাসূল (সাঃ) তা করেননি। ক্ষমার মাঝে কোন হিন্দু-মুসলমান নেই। নেই কোন শ্রেণী বিন্যাস। ‘ধৈর্যধারীদের অগণিত পুরস্কার পূর্ণভাবে দেয়া হবে’ বলে সুরা যুমারে ঘোষিত হয়েছে।
হযরত আনাস (রাঃ) রাসূল (সাঃ)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন-কিয়ামতের দিন ইনসাফের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে। অতঃপর বালা-মুসিবতে সবরকারীরা আগমন করলে তাদের জন্য কোন ওজন ও মাপ হবে না। বরং অগণিত ও অপরিমিত সওয়াব তাদের দেয়া হবে। আল্লাহ তা’য়ালাও বলেন-যারা সবরকারী, তাদের জন্য রয়েছে অগণিত পুরস্কার (সুরা যুমারঃ ১০) তাফসীরে মাআরেফুল কুরআনঃ ১১৭৫ মুফতি শফী (রহঃ)
আমাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে সফলতার জন্য সবর একটি উত্তম হাতিয়ার। কোন কাজে হঠাৎ ফল পাওয়ার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। কথাটি বলেছেন একজন বিখ্যাত দার্শনিক মুফাসসির (রাঃ)। পরিশেষে কুরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে এই প্রবন্ধের ইতি টানতে চাই- আল্লাহ বলেন, সবর অবলম্বন কর। আল্লাহ মুহসিনদের কর্মফল বিনষ্ট করেন না। সুরা হুদঃ ১১৫
আর যদি সবর না ধরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করি তাহলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। ধৈর্যের বিপরীত অধৈর্য কিংবা বিশৃঙ্খলা। মহান আল্লাহ বলেন-মানুষের কৃতকর্মের দরুন জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে। সুরা রুমঃ ৪১
আমরা চাই ধৈর্যের মাধ্যমে কাঙিক্ষত সফলতা হস্তগত করতে।
**************************
হু সা ই ন আ ল জা ও য়া দ
দৈনিক ইত্তেফাক, ০৯ মে ২০০৮