- Home
- জীবন ও কর্ম
- কায়েদ সাহেব হুজুরঃ আযীযুর রহমান নেছারাবাদী রহ.
- Home
- জীবন ও কর্ম
- অলী-আউলিয়া
- কায়েদ সাহেব হুজুরঃ আযীযুর রহমান নেছারাবাদী রহ.
কায়েদ সাহেব হুজুরঃ আযীযুর রহমান নেছারাবাদী রহ.
- By Article Poster
- Published 05/13/2008
- জীবন ও কর্ম
- Unrated
ছারছীনা দরবারের অন্যতম খাদেম ও মুরব্বি দেশের বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক আলেম হজরত আযীযুর রহমান নেছারাবাদী-কায়েদ সাহেব হুজুর গত ২৮ এপ্রিল ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। হজরত কাযেদ সাহেব হুজুর ছিলেন বহুবিধ যোগ্যতা ও গুণের অধিকারী। শিশুকাল থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত বহুমুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছেন। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সফল ব্যক্তি হিসেবে।
ছাত্রজীবনে গভীর মনোযোগের সঙ্গে পড়ালেখা করে আদর্শ কৃতী শিক্ষার্থীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্হাপন করেছেন। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েও দৃঢ় মনোবল নিয়ে, অনেক কষ্ট স্বীকার করে সফলভাবে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেন। তবে তিনি সারাজীবনই নিজেকে ছাত্র পরিচয় দিতে আনন্দ পেতেন, সুযোগ পেলেই পড়তে থাকতেন, উৎসুক হয়ে মানুষের কাছে নানা বিষয়ে জানতে চাইতেন।
তিনি উপমহাদেশের বিখ্যাত দ্বীনি প্রতিষ্ঠান ছারছীনা দারুচ্ছুন্নাত আলিয়া মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন দক্ষতার সঙ্গে ভাইস প্রিসিপাল ও বোর্ডিং সুপারের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আদর্শ ছাত্র গঠনে নিজেকে নিবেদিত করেন। তার হাতে গড়া শিক্ষার্থীরা আজ দেশ-বিদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসায় অধ্যাপনাসহ অনেক গুরুত্বপুর্ণ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। তার অসংখ্য যোগ্য ছাত্রের মধ্যে রয়েছেন-ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার সাবেক ভাইস চ্যাসেলর ড. মুস্তাফিজুর রহমান, দৈনিক ইনকিলাবের নির্বাহী সম্পাদক কবি রুহুল আমীন খান, অধ্যাপক আখতার ফারুক, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, ড. আ. ব. ম. আলী হায়দার, ড. ফজলুর রহমান প্রমুখ। শিক্ষক জীবনে তার সুশাসন ও তত্ত্বাবধানে প্রতিটি ছাত্র গড়ে উঠেছে সৎ চরিত্রের অধিকারী হয়ে। সুন্দর উপস্হাপনা ও দৃষ্টান্তসহ ক্লাস লেকচার দিয়ে তিনি সহজেই বোঝাতে পারতেন অনেক কঠিন বিষয়।
এই মহান আদর্শ শিক্ষক নিজেকে সমাসীন করেন শিক্ষাগুরুর উচ্চ আসনে। নিজ প্রচেষ্টায় বরিশালসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করেন শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তিনি নারী শিক্ষার ক্ষেত্রেও অনন্য অবদান রেখেছেন। নিজ তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠা করেছেন করেছেন জিনাতুন্নেছা মহিলা মাদ্রাসা।
হজরত কায়েদ সাহেব হুজুর ছিলেন খ্যাতনামা চিন্তাবিদ ও ইসলামী দার্শনিক। বিলাসিতামুক্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। ফকিরি জিন্দেগিতেই তিনি খুশি থাকতেন। নিজের জন্য তিনি কোনো জমি বা সম্পদ অর্জন করেননি। অপরদিকে পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি পুর্ণ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ছিলেন নিজ দায়িত্ব ও অন্যদের অধিকারের ব্যাপারে সদা সচেতন ব্যক্তি। তিনি সমাজমুখী মানুষ ছিলেন। সমাজসেবা, সমাজ সংস্কারের জন্য আজীবন প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে তিনি আদর্শ সমাজ বাস্তবায়ন পরিষদ গঠন করেন।
বহু কবিতা, ইসলামী সঙ্গীত তার মুখস্হ ছিল। এগুলো প্রায়ই আবৃত্তি করতেন বা গেয়ে শোনাতেন। কবি ফররুখ আহমদ, রুহুল আমিন খান, গোলাম মোস্তফা, নজরুল ইসলাম, আল্লামা ইকবাল, আল্লামা রুমীর (রহ.) রচনা ও কাব্যসম্ভার চমৎকারভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে উপস্হাপন করে আত্মার খোরাক জেগাতেন। ছারছীনা শরীফ থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক ‘তাবলীগ’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনি সুলেখক হিসেবে শুধু লেখালেখি করেই ক্ষান্ত হননি, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে অনেক লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সম্পাদক তৈরি করেছেন। হুজুর প্রণীত আজকারে খামছার ছন্দগুলো যুগ যুগ ধরে অমর রুহানি কাব্য হিসেবে সমাদৃত হবে।
হজরত কায়েদ সাহেব হুজুর ছিলেন অলিয়ে কামেল, আশেকে রাসুল (সা.) এবং সুন্নতে নববীর পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসারী। তার মতো মুখলেছ মানুষ বর্তমান যুগে বিরল। তিনি ছারছীনা শরীফের মরহুম শাহ নেছারুদ্দীন আহমদের (রহ.) মানসপুত্র এবং আবু জাফর মোহাম্মদ ছালেহর (রহ.) ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ছারছীনাসহ আরো অনেক হক্কানি দরবার ও হক্কানি পীরের কাছ থেকে তিনি ফায়েজ গ্রহণ করেছেন। ইলমে মারেফাতে গভীরতা অর্জন করে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন পরিশুদ্ধ মানুষে। তার লেখা ‘ইসলাম ও তাসাওফ’ কিতাবখানি পড়লে এক্ষেত্রে তার অবস্হান কিছুটা আঁচ করা সম্ভব।
হজরত কায়েদ হুজুর ছিলেন সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, বিপ্লবী বীর ও সংগ্রামী মুজাহিদ। বিদয়াতি কর্মকান্ড উচ্ছেদ করেছেন। সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া, বেপর্দেগি, বেহায়ায়ি ও অশ্লীলতার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। নির্যাতিত-মজলুম মানুষের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি সফল নেতৃত্বের সব গুণাবলি অর্জন করে অসাধারণ নেতার ভুমিকা পালন করেছেন। সাংগঠনিক যোগ্যতা দিয়ে হয়েছেন সুসংগঠক। জমিয়তে হিজবুল্লাহ, জমিয়তুল মুসলেহীন তারই হাতে গড়া সংগঠন। যে কোনো আন্দোলন, সংগ্রাম বা কর্মসুচি হাতে নিয়ে অনুসারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলেছেন। সুপ্রশিক্ষক হিসেবে তিনি প্রশিক্ষিত জনসম্পদ গড়ার প্রতি গুরুত্ব দিতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন-আমি কোয়ান্টিটি (সংখ্যা) চাই না, আমি চাই কোয়ালিটি (গুণ)।
তিনি ছিলেন সাম্যের মুর্ত প্রতীক। নিজেকে কখনোই সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা মনে করতেন না। তিনি ছিলেন মস্তবড় আলেমে দ্বীন এবং বহু বিখ্যাত আলেমের প্রিয় উস্তাদ। ইসলামী জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে পরিভ্রমণ করেছেন। তবে হুজুর কখনোই নিজেকে বড় ভেবে অন্যকে হেয় জ্ঞান করতেন না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। তিনি ছিলেন মিশুক ও সদালাপী। তিনি রসিকতা করতে পছন্দ করতেন। তিনি অনেক সময় নিষ্পাপ-নিষ্কলুষ শিশুর মতো আচরণ করতেন। তিনি সমস্যা জর্জরিত মানুষের কথা খুব মনোযোগের সঙ্গে শুনতেন এবং সুপরামর্শ দিতেন। নিজ হাতে অতি সাধারণ কাজ করতেও দ্বিধা করতেন না। তিনি বলতেন-‘ওগো মুসলমানের ছেলে, কাজ করিলে মান যাবে তোর কোন হাদিসে পেলে?’ তার প্রিয় শ্লোগান ছিল-‘হাতে কাজ করতে হবে, সোনার বাংলা গড়তে হবে।’ ব্যবসায়-বাণিজ্যসহ হালাল কাজে, ভালো কাজে তিনি উৎসাহিত করতেন।
তার মেহমানদারি ভোলার মতো নয়। তালিমি জলসা, মাহফিল ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে আগত মেহমানদের জন্য আবাসন, খাবার ব্যবস্হাসহ যতটুকু খেদমত সম্ভব তা করা হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হয়েই শান্ত হতেন।
তিনি সব সময় সন্ত্রাস, উগ্রতা, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দৃপ্তকণ্ঠে আওয়াজ তুলেছেন। তার সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে-সন্ত্রাসী কর্মকান্ড দিয়ে কখনো ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে না, বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিন ছিলেন শান্তির প্রতীক, জনদরদী এবং মানবতাবাদী। তিনি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাজনীতি সচেতন নাগরিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ইসলামী রাজনীতির সফল ব্যাখ্যাকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন সাহসী ও কৌশলী। ধর্মীয় আবেগে তিনি কখনো যুক্তিযুক্ত ও বাস্তবধর্মী সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে পিছপা হতেন না।
বহু কারামতের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও হুজুর কখনো নিজেকে জাহির করতেন না। তিনি ছিলেন আত্মপ্রচারবিমুখ ইনসানে কামেল।
আরবি, উর্দু ও ফার্সি ভাষায় ছিল তার অগাধ পান্ডিত্য। তিনি বহু গ্রন্হ প্রণয়ন করেছেন, প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রকাশনা বিভাগ। তিনি বহুমুখী ইসলামী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। খোদ নেছারাবাদেই চল্লিশোর্ধ্ব প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়েছেন ইসলামী কমপ্লেক্স। হুজুর প্রচলিত ধারার ওয়ায়েজ ছিলেন না, তিনি ছিলেন গঠনমুলক আলোচক।
**************************
শহীদুল হক
দৈনিক আমার দেশ, ১০ মে ২০০৮