জুমার খুতবা
- By Article Poster
- Published 05/16/2008
- নামায
-
Rating:




রাসূল (সা·)-এর নবুয়ত প্রাপ্তির পর আল্লাহর একেশ্বরবাদ যখন জারি হল, তখন আরব দেশে প্রচলিত ছিল বহু দেব-দেবীর মূর্তিপূজা। পৌত্তলিকরা ছিল অর্থবিত্তে, সামাজিক মর্যাদায় এবং প্রভাব প্রতিপত্তিতে সমাজের অত্যন্ত প্রতাপশালী ব্যক্তি। বহু দেব-দেবীর প্রতিমা পূজাকে বাতিল ঘোষণা করে, সেই জায়গায় ইসলামের একেশ্বরবাদ প্রচার করা রাসূল (সা·)-এর জন্য ছিল যথেষ্ট ঝুঁকির কাজ।
এমতাবস্থায় নবুয়তের পর তিন বছর ধরে রাসূল (সা·) একেশ্বরবাদের বাণী কারও কাছে ব্যক্ত করেননি, চুপচাপ ছিলেন। বিষয়টি শুধু তার পরিবারের সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনরাই অবগত ছিলেন। এ তিন বছরের মধ্যে স্ত্রী খাদিজা (রা·), চাচাতো ভাই আলী (রা·) এবং বাল্যবন্ধু আবু বকর (রা·)সহ ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যের মাত্র ৫/৬ জন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ৩ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর, প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার করার জন্য মোহাম্মদ (সা·)কে আল্লাহ আদেশ প্রদান করেন (১৫:৯৪)। রাসূল (সা·) প্রকাশ্যে প্রচার কাজ শুরু করলেন। তাঁর আহ্বানে যে স্বল্পসংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাদের ওপর পৌত্তলিকরা নানাবিধ অনাচার, অত্যাচার আরম্ভ করল। কোন ইবাদতের হুকুম তখন পর্যাপ্ত জারি হয়নি। নবুয়তের ৫ম/৬ষ্ঠ বর্ষে শুধু নামাজ পড়ার নির্দেশ ঘোষণা করা হয় এবং সে নামাজও সংগোপনে কারও গৃহে পড়া হতো, সবাই একত্রে সমবেত হয়ে, জামাতে। নামাজ পড়ার কারণে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন আরও বেড়ে যায়। মক্কার এই তিক্ত পরিস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূল (সা·) পরিশেষে মদিনায় হিজরত (প্রস্থান) করলেন। মদিনাতে হিজরতের ১ম বর্ষে, মতান্তরে ২য় বর্ষে জুমার নামাজ পড়ার নির্দেশ জারি হয়। এই নামাজ, শুক্রবার ৪ রাকাত জোহরের নামাজের পরিবর্তে ২ রাকাত জুমার নামাজ, মসজিদে জামাতে পড়ার নামাজ। জুমার নামাজ পড়া ফরজ, মসজিদে পড়া ফরজ (গৃহে একাকী পড়ার বিধান নেই) এবং জামাতে পড়া ফরজ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ফরজ, মসজিদে পড়া ফরজ নয়, জামাতে পড়া ফরজ নয়। তবে মসজিদে জামাতে পড়ার সওয়াব অধিক বিধায় মসজিদে জামাতে পড়া উত্তম। জামাতে পড়ার অন্যান্য সুফলও রয়েছে। জুমার নামাজের আগে রয়েছে খুতবা। খুতবা ধর্মোপদেশ, খতিব কর্তৃক মুসল্লিদের উদ্দেশে প্রদত্ত বক্তৃতা। মক্কার অস্থির পরিস্থিতিতে মুসলমানদের শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সমবেত করে ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা ও জ্ঞানদান, ইসলামসম্মত জীবন ও সমাজ গড়া, পরস্পরের মধ্যে সংহতি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয়ে প্রয়োজনীয় আদেশ-উপদেশ প্রদান করার সময়-সুযোগ ছিল না মক্কাতে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই জুমার নামাজে খুতবার প্রবর্তন। রাসূল (সা·) এবং খলিফারা প্রতি শুক্রবারে জুমার নামাজে ধর্মীয় বিষয়সহ সমাজের বিদ্যমান পরিস্থিতির আলোকে প্রয়োজনীয় আদেশ-উপদেশ সংবলিত মৌখিক খুতবা পেশ করতেন মুসল্লিদের উদ্দেশে, যাতে মুসল্লিরা জ্ঞান লাভ করতে পারে, প্রদত্ত খুতবা বুঝতে পারে এবং তদানুযায়ী আমল করতে পারে। রাসূল (সা·)-এর রীতি ও পদ্ধতি অনুসরণে এবং খুতবা দানের অভীষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সমুন্নত রাখার প্রতি দৃষ্টি রেখে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মসজিদগুলোতে, বাংলাদেশের বহু মসজিদেও, সাপ্তাহিক জুমার নামাজে কোরআনের কিয়দংশ পাঠ দ্বারা খুতবা আরম্ভ করার পর খুতবার মধ্যেই কোরআন-হাদিসের প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি দিয়ে মুসল্লিদের বোধগম্য (মাতৃভাষায়) ভাষায় বক্তৃতা দেয়া হয়, যাতে মুসল্লিরা তা বুঝতে পারে এবং তদানুযায়ী আমল করতে পারে এবং পরিশেষে আরবিতে দোয়া সংবলিত কোরআনের কিছু আয়াত পাঠ দ্বারা খুতবা শেষ করা হয়। এরূপ খুতবা দ্বারা খুতবা দানের প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জিত হয়। এই খুতবা অর্থবহ, ফলপ্রদ। এরূপ খুতবা সুন্নতসম্মত। তোতা পাখির মুখস্থ বুলির খুতবা নিরর্থক-নিষ্ফল। খুতবার আগে একটি পৃথক বক্তৃতার ব্যবস্থাও একটি নিষ্প্রয়োজন নতুন সংযোজন। সময়ের অপচয় বটে। খুতবা দান এবং জামাতের নামাজ ছোট করার জন্য রাসূল (সা·)-এর পরামর্শ রয়েছে। কারণ জামাতে উপস্থিত মুসল্লিদের মধ্যে কেউ অসুস্থ, বয়োবৃদ্ধ এবং নামাজের পরে কারও জরুরি কাজ থাকতে পারে। এমতাবস্থায়, জুমার নামাজের খুতবা পাঠের মধ্যেই মুসল্লিদের বোধগম্য ভাষায় বক্তৃতাসহ খুতবা দানের ব্যবস্থা করার জন্য সম্মানিত খতিবদের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সশ্রদ্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি।
**************************
এম কে দে ও য়া ন
দৈনিক যুগান্তর, ১৬ মে ২০০৮
এমতাবস্থায় নবুয়তের পর তিন বছর ধরে রাসূল (সা·) একেশ্বরবাদের বাণী কারও কাছে ব্যক্ত করেননি, চুপচাপ ছিলেন। বিষয়টি শুধু তার পরিবারের সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনরাই অবগত ছিলেন। এ তিন বছরের মধ্যে স্ত্রী খাদিজা (রা·), চাচাতো ভাই আলী (রা·) এবং বাল্যবন্ধু আবু বকর (রা·)সহ ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যের মাত্র ৫/৬ জন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ৩ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর, প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার করার জন্য মোহাম্মদ (সা·)কে আল্লাহ আদেশ প্রদান করেন (১৫:৯৪)। রাসূল (সা·) প্রকাশ্যে প্রচার কাজ শুরু করলেন। তাঁর আহ্বানে যে স্বল্পসংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাদের ওপর পৌত্তলিকরা নানাবিধ অনাচার, অত্যাচার আরম্ভ করল। কোন ইবাদতের হুকুম তখন পর্যাপ্ত জারি হয়নি। নবুয়তের ৫ম/৬ষ্ঠ বর্ষে শুধু নামাজ পড়ার নির্দেশ ঘোষণা করা হয় এবং সে নামাজও সংগোপনে কারও গৃহে পড়া হতো, সবাই একত্রে সমবেত হয়ে, জামাতে। নামাজ পড়ার কারণে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন আরও বেড়ে যায়। মক্কার এই তিক্ত পরিস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূল (সা·) পরিশেষে মদিনায় হিজরত (প্রস্থান) করলেন। মদিনাতে হিজরতের ১ম বর্ষে, মতান্তরে ২য় বর্ষে জুমার নামাজ পড়ার নির্দেশ জারি হয়। এই নামাজ, শুক্রবার ৪ রাকাত জোহরের নামাজের পরিবর্তে ২ রাকাত জুমার নামাজ, মসজিদে জামাতে পড়ার নামাজ। জুমার নামাজ পড়া ফরজ, মসজিদে পড়া ফরজ (গৃহে একাকী পড়ার বিধান নেই) এবং জামাতে পড়া ফরজ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ফরজ, মসজিদে পড়া ফরজ নয়, জামাতে পড়া ফরজ নয়। তবে মসজিদে জামাতে পড়ার সওয়াব অধিক বিধায় মসজিদে জামাতে পড়া উত্তম। জামাতে পড়ার অন্যান্য সুফলও রয়েছে। জুমার নামাজের আগে রয়েছে খুতবা। খুতবা ধর্মোপদেশ, খতিব কর্তৃক মুসল্লিদের উদ্দেশে প্রদত্ত বক্তৃতা। মক্কার অস্থির পরিস্থিতিতে মুসলমানদের শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সমবেত করে ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা ও জ্ঞানদান, ইসলামসম্মত জীবন ও সমাজ গড়া, পরস্পরের মধ্যে সংহতি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয়ে প্রয়োজনীয় আদেশ-উপদেশ প্রদান করার সময়-সুযোগ ছিল না মক্কাতে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই জুমার নামাজে খুতবার প্রবর্তন। রাসূল (সা·) এবং খলিফারা প্রতি শুক্রবারে জুমার নামাজে ধর্মীয় বিষয়সহ সমাজের বিদ্যমান পরিস্থিতির আলোকে প্রয়োজনীয় আদেশ-উপদেশ সংবলিত মৌখিক খুতবা পেশ করতেন মুসল্লিদের উদ্দেশে, যাতে মুসল্লিরা জ্ঞান লাভ করতে পারে, প্রদত্ত খুতবা বুঝতে পারে এবং তদানুযায়ী আমল করতে পারে। রাসূল (সা·)-এর রীতি ও পদ্ধতি অনুসরণে এবং খুতবা দানের অভীষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সমুন্নত রাখার প্রতি দৃষ্টি রেখে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মসজিদগুলোতে, বাংলাদেশের বহু মসজিদেও, সাপ্তাহিক জুমার নামাজে কোরআনের কিয়দংশ পাঠ দ্বারা খুতবা আরম্ভ করার পর খুতবার মধ্যেই কোরআন-হাদিসের প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি দিয়ে মুসল্লিদের বোধগম্য (মাতৃভাষায়) ভাষায় বক্তৃতা দেয়া হয়, যাতে মুসল্লিরা তা বুঝতে পারে এবং তদানুযায়ী আমল করতে পারে এবং পরিশেষে আরবিতে দোয়া সংবলিত কোরআনের কিছু আয়াত পাঠ দ্বারা খুতবা শেষ করা হয়। এরূপ খুতবা দ্বারা খুতবা দানের প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জিত হয়। এই খুতবা অর্থবহ, ফলপ্রদ। এরূপ খুতবা সুন্নতসম্মত। তোতা পাখির মুখস্থ বুলির খুতবা নিরর্থক-নিষ্ফল। খুতবার আগে একটি পৃথক বক্তৃতার ব্যবস্থাও একটি নিষ্প্রয়োজন নতুন সংযোজন। সময়ের অপচয় বটে। খুতবা দান এবং জামাতের নামাজ ছোট করার জন্য রাসূল (সা·)-এর পরামর্শ রয়েছে। কারণ জামাতে উপস্থিত মুসল্লিদের মধ্যে কেউ অসুস্থ, বয়োবৃদ্ধ এবং নামাজের পরে কারও জরুরি কাজ থাকতে পারে। এমতাবস্থায়, জুমার নামাজের খুতবা পাঠের মধ্যেই মুসল্লিদের বোধগম্য ভাষায় বক্তৃতাসহ খুতবা দানের ব্যবস্থা করার জন্য সম্মানিত খতিবদের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সশ্রদ্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি।
**************************
এম কে দে ও য়া ন
দৈনিক যুগান্তর, ১৬ মে ২০০৮