‘নিঃসন্দেহে এ প্রথম ঘরটি যা মানুষের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যা বাক্কা অর্থাৎ মক্কায় অবস্থিত। এটি সারাবিশ্বের মানুষের জন্য হেদায়াত ও বরকতময়।’ (আল কোরআন)

জিলহজ মাস হিজরি সনের ১২তম ও আরবি বর্ষের সর্বশেষ মাস। এ মাসকে আল্লাহতায়ালা যথেষ্ট গুরুত্ব ও মর্যাদা দান করেছেন। যে চারটি মাসকে আল্লাহতায়ালা শান্তির মাস হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন তার মধ্যে জিলহজ মাস অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফজিলতের মাস। এ মাসের উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হল হজ করা। ঈদুল আজহা উদযাপন করা, আইয়ামে তাশরিক ও কোরবানি করা। এ মাস সম্পর্কে রাসূল (সা·) বলেন, ‘বৎসরের মাসসমূহের নেতা হল রমজান, আর সম্মানিত জিলহজ মাস।’ ফাযায়েলে শহুর কিতাবে বলা হয়েছে, ‘দুনিয়ার দিনসমূহের মধ্যে জিলহাজের প্রথম ১০ দিন সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ দিন।’

এ মাসের প্রথম তারিখে রোজা রাখলে ২ হাজার বছর জিহাদের সমান সওয়াব পাওয়া যায়। তৃতীয় তারিখে রোজা রাখলে ৪শ’ বছরের ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায়। ৫ তারিখে রোজা রাখলে ৫ হাজার বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদানের সওয়াব পাওয়া যায়। ৬ তারিখের রোজায় ২ হাজার শহীদের সওয়াব পাওয়া যায়। ৭ তারিখের রোজায় দোজখের ৭টি দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ৮ তারিখের রোজায় বেহেশতের ৮টি দরজা খোলা হয়ে থাকে। (কিতাবুল আমাল)। ফাযায়েলে শহুরুস সিয়াম কিতাবে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা·) বলেন, ‘হে লোক সকল মহান আল্লাহতায়ালা জিলহজ মাসকে সম্মানিত করেছেন। কাজেই তোমরা এ মাসের প্রতি দৃষ্টি রাখবে। এ মাসকে সম্মান করবে।’ এ মাসে মানুষকে সর্বাবস্থায় নেকি অর্জনে ব্যাপৃত থাকার জন্য হুজুর (সা·) তাগিদ দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা এ মাসকে তোমাদের হজের জন্য নির্ধারণ করেছেন। এ মাসের তিনটি দিন অত্যন্ত সম্মানিত। ১· ইয়াওমে তারবিয়াহ ঃ যে দিন ইব্রাহিম (আ·) আল্লাহর হুকুমে ইসমাইল (আ·)-কে কোরবানি করার আদেশ পেয়েছিলেন। ২· ইয়াওমে আরাফা ঃ যেদিন হজ পালনরত হাজী সাহেবরা আরাফার ময়দানে হাজির হন। ৩· ইয়াওমে নহর ঃ কোরবানির দিন। রাসূল (সা·) বলেন, ‘আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় দিন জিলহজ মাসের ৯, ১০ ও ১১ তারিখ। এ মাসের এ তিনদিনের ইবাদত আল্লাহতায়ালার কাছে অধিক প্রিয়।’

ফাযায়েলে শহুরস সিয়াম কিতাবে বর্ণিত আছে, ‘জিলহজ মাসের ১০ তারিখে আল্লাহতায়ালা আদম (আ·)-এর তওবা কবুল করেছেন। এ দিনে ইব্রাহিম (আ·)-কে নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে নাজাত দিয়েছেন। এই দিনে ইব্রাহিম (আ·) নিজ পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি করেন। এই দিনে ইব্রাহিম (আ·) কাবাঘর সংস্কার করেন। এ মাসের ১০ তারিখ ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ·) কাবাঘরের বুনিয়াদ স্থাপন করেন। এই দিনে দাউদ (আ·) আল্লাহতায়ালার কাছে মাগফিরাত কামনা করেন। রাসূল (সা·) বলেন, ‘সব দিনের মধ্যে ১০ জিলহজ উত্তম দিন।’ গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য ঃ জিলহজ মাস হজের মাস। এ মাস বিশ্ব মুসলিম মিল্লাতের মহামিলনের মাস। এটি মহাবিশ্বের মহাসম্মেলনের মাস। হজ ইসলামী জীবন ব্যবস্থার পঞ্চম বুনিয়াদ। এই হজ পালনের জন্য সারাবিশ্বের মানুষ ছুটে আসেন মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে। এ সময় সব মানুষের মুখে একই শব্দ লাব্বাইকার আওয়াজে পবিত্র মক্কার আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে।

হজরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ·) কাবাঘর নির্মাণ করে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ! তুমি আমাদের এ কাজটুকু কবুল কর। আল্লাহ ইব্রাহিম (আ·)-এর দোয়া কবুল করে নির্দেশ দিলেন, ‘হে ইব্রাহিম! তুমি মানুষদিগকে হজের জন্য আহ্বান কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং উটের পিঠে আরোহণ করে দূরপ্রান্ত থেকে।’ ইব্রাহিম (আ·) বললেন, হে আল্লাহ! সারাবিশ্বের মানুষ কি আমার ঘোষণা শুনবে? আল্লাহ বলেন, ‘হে ইব্রাহিম তুমি ঘোষণা কর আর তা মানুষের কানে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব আমার।’ (তাঃ মাআরেফুল কোনআন)। রাসূল (সা·) বলেন, সেদিন ইব্রাহিম (আ·)-এর ঘোষণা আকাশ ও জমিনের সবাই শুনেছে এবং লাব্বাইক শব্দ বলে জওয়াব দিয়েছে। সেদিন যে যতবার লাব্বাইক বলে জওয়াব দিয়েছে, সে ততবার হজ করার সৌভাগ্য লাভ করবে। (দুররে মানসুর) আদি পিতা হজরত আদম (আ·)-এর ইবাদতের জন্য কাবাঘর তৈরি করা হয়েছে। এটি নূহ (আ·)-এর যুগের মহা প্লাবনে ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহর হুকুমে ইব্রাহিম (আ·) ও ইসমাইল (আ·) আবার কাবাঘর তৈরি করেন। আল্লাহ বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এ প্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। যা পবিত্র ভূমি মক্কায় অবস্থিত এবং সারাবিশ্বের মানুষের হেদায়াত ও বরকতময়। এতে রয়েছে মাকামে ইব্রাহিমের প্রকৃষ্ট নিদর্শন। যে ব্যক্তি এর ভেতরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে। আর এ ঘরে হজ করা মানুষের ওপর আল্লাহ ফরজ করেছেন যার সামর্থø আছে এ পর্যন্ত পৌঁছার।’ (আল কোরআন)

রাসূল (সা·) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হজ করে, আর কোন প্রকার কুকর্ম না করে, সে ব্যক্তি যে দিবসে তার মাতা তাকে প্রসব করেছিল সে দিবসের ন্যায় বে-গুনাহ অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করবে।’ (বোখারি, মুসলিম)। রাসূল (সা·) বলেন, ‘মকবুল হজের বিনিময় একমাত্র জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নহে।’ (বোখারি, মুসলিম)। রাসূল (সা·) বলেন, ‘আরাফার দিন আল্লাহতায়ালা এত অধিক পরিমাণ জাহান্নামিকে অগ্নি থেকে মুক্তি দেন, যা অন্য কোন দিবসে দেন না।’ (মুসলিম শরিফ)। রাসূল (সা·) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহপাকের রহমত হজ পালনকারীদের নিকটবর্তী। অতঃপর হজ পালনকারী বান্দাদের সম্পর্কে ফেরেশতাদের কাছে গৌরব করে বলতে থাকেন, এরা কিসের সংকল্প করেছে? উত্তরে ফেরেশতারা বলেন, হে আল্লাহ এরা হজের সংকল্প করেছে। আল্লাহ বলেন, আমি এদের হজ কবুল করলাম, আর হজের বিনিময়ে একমাত্র জান্নাত দান করব।’

***************************
লেখকঃ  মাওলানা মোঃ আবুল হোসেন পাটওয়ারী
উৎসঃ দৈনিক যুগান্তর, ৭ই ডিসেম্বর ২০০৭