সবাই অধিকার আদায় করতে চায়। আর এ আদায়ের জন্যই করতে হয় কত মিটিং-মিছিল! কিন্তু এত কিছুর পরও সবাই কি বুঝে পায় আপন অধিকার? আমার আদরের বোন আলেয়া কি তার স্বামীর কাছ থেকে বুঝে পেয়েছে মোহরানা, অন্ন-বস্ত্র, বাসস্হানসহ এক টুকরো শান্তিময় জীবনের নিশ্চয়তা? শিশু শ্রমিক নাহিদ, রাজীব, জুলমত আর গার্মেন্ট শ্রমিক ফারজানা আনোয়ারা কী বুঝে পেয়েছে তাদের ন্যায্য পাওনা? না। কিন্তু কেন?

এই কেনর ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ। এই অধিকার বঞ্চিতদের মিছিল অনেক লম্বা। এতে শ্রমিক যেমন শামিল তেমন মালিকও। যেমন শাসক তেমন শাসিতও। তবে শাসিত আর অধীনস্হরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়ে থাকে।

আমরা অধিকার আদায়ের জন্য প্রণয়ন করি দীর্ঘ কর্মনীতি। এতে হইচই কিছু হয় বটে; কিন্তু উত্তরণের মুলপথ থেকে আমরা বারবার বিচ্ছিন্ন হই।

বস্তুত কি রাজা, কি প্রজা, কি মালিক আর কি শ্রমিক, সবাই আমরা নিজেকে বুঝি। অন্যকে বুঝি না। বুঝতে চাই না। কেবল নিজেকেই জানি। অন্যকে জানার চেষ্টাও করি না। এই না জানা আর না চেনার অনিবার্য পরিণতিতেই তৈরি হয়েছে ‘পরের পেটে লাথি মার নিজের উদরপুর্তি করার মতো অমানুষিক মনোভাব। যার ফলে এত কিছুর পরও পাওনা আদায় ও প্রাপ্তির ফলাফল শুন্য এবং এ মনোভাবের প্রেক্ষিতেই সমাজের যত ওলট-পালট আর দাঙ্গা-হাঙ্গামা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমাদের কৃতকর্মের কারণেই জলে-স্হলে সব রকমের দাঙ্গা-হাঙ্গামা (ফ্যাসাদ) দেখা দিয়েছে। (সুরা রুম)

অন্যের সঙ্গে আমার আচরণ সঙ্গত না হলে সে কেন আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে? বাংলাতে একটি প্রবাদ আছে- ‘যেমন কর্ম তেমন ফল’। এ প্রবাদেও বলে অন্যের অধিকার হরণ করে নিজের অধিকার বুঝে পাওয়া যায় না। এবার বলুন শ্রমিক যদি মালিকের স্বার্থ না বুঝে মালিক কেন বুঝবে শ্রমিকের স্বার্থ? স্বামী-স্ত্রী যদি একে অপরকে না বুঝে একে অপরের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট না হয় তবে কিসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে একটি সোনালি সুখের সংসার?

ঠিক তেমনি যে দেশের প্রজাপতির মাঝে অন্যের ‘হক’ মেরে দেয়ার প্রবণতা থাকে তবে সেই দেশে সেই জনপদে সুখ-সমৃদ্ধির আশা করা বাঁশ লাগিয়ে ইক্ষুর আশা করার নামান্তর নয় কী?

আজকাল শুধু বাংলাদেশেই নয় গোটা পৃথিবীতেই অধিকার বঞ্চিতদের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এটা একটা বড় অভিশাপ। এ অভিশাপ আমার-আপনার সবার ওপর। এর প্রতিকার হওয়া দরকার।

অবশ্য এর জন্য আমাদের দীর্ঘ কোনো পথ-পরিক্রমা অতিক্রম করতে হবে না। প্রয়োজন একটি মাত্র পদক্ষেপের। তার তা হলো, সবার অধিকারকে সমানভাবে বিবেচনা করা এবং নিজের মধ্যে এই উপলব্ধিটুকু জাগ্রত করা যে, আমি আমার মালিক এবং শ্রমিকও। শুধু এ অনুভুতি আর দরদটুকু যদি একটি সংঘ, একটি সমাজ, একটি দেশের সবার মধ্যে জাগ্রত হয় তবে সংগঠনে সমাজে দেশের কোথাও দুর্নীতি, অনিয়ম, গঞ্জনা-বঞ্চনার কিছু থাকবে না। মালিক-শ্রমিক, প্রজাপতিরা যত তাড়াতাড়ি এ বিষয়টুকু বুঝবে তত দ্রুত মিটিং-মিছিল এবং রক্তপাত ছাড়াই গড়ে উঠবে সুখে সমৃদ্ধিতে ভরা একটি স্বপ্নিল দেশ। শুধু তাই নয়, যদি স্রষ্টার মতো সৃষ্টি ও স্রষ্টার পাওনাগুলো আদায় করে দেয় তবে পৃথিবীর পরেও তার জন্য রয়েছে এমন এক সুখময় জীবনের হাতছানি যা কোনো চক্ষু দেখেনি কোনো কর্ণ শোনেনি এমনকি কল্পনার ত্যাজী ঘোড়া হাঁকিয়েও কোনো মানুষ সে পর্যন্ত পৌঁছুতে পারেনি।
আল্লাহ তায়ালা যথার্থই বলেছেন, ‘এহসানের বিনিময় এহসান ছাড়া আর কী হতে পারে?’ (আর রাহমান)

একথা স্রষ্টার বেলায় যেমন নিঃসন্দেহ, তেমনি দু’একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে সৃষ্টির বেলারও তার সত্যতাই প্রমাণিত হবে। অতএব নিজের পাওনা বুঝে নেয়ার আগে অন্যের হক বুঝিয়ে দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। পক্ষান্তরে অন্যের হক না দিয়ে যদি আমরা নিজেদের হক বুঝে পেতে চাই তবে আল্লাহর বাণীই আমাদের বেলায় যথার্থ প্রমাণিত হবে।

**************************
হা সা ন মু হা ম্ম দ সা না উ ল্লা হ 
আমার দেশ, ২৪ মে ২০০৮