নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই ছতর ঢাকা ফরজ। অর্থাৎ পুরুষের জন্য নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রাখা এবং নারীদের জন্য মাথার তালু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ঢেকে রাখা ফরজ।

এমন কোন পাতলা কাপড় পরা উচিত নয় যা দিয়ে ছতর ঢাকা হয় না। অর্থাৎ কাপড়ের নিচের শরীর ঝলকে দেখা যায়; যেমন- মলমল, জালিদার ইত্যাদি কাপড় পরা আর উলঙ্গ থাকা সমান। হাদিস শরিফে আছে, ‘অনেক কাপড় পরিধানকারিণী আছে, যারা বস্তুত উলঙ্গ।’ তা এরূপ পাতলা কাপড় পরিধানকারিণীদের সম্পর্কেই বলা হয়েছে- আর কোর্তা এবং ওড়না উভয়ই যদি পাতলা কাপড়ের হয় তবে তা আরও অধিক মারাত্মক। (অর্থাৎ মেয়েদের পাতলা কাপড়ের জামা ও ওড়না পরা জায়েজ নয়।)

মহিলাদের পুরুষের বেশ ধারণ করা, পুরুষের মতো কাপড়-জুতা পরা জায়েজ নয়। যেসব মহিলা পুরুষের বেশ ধারণ করে নবী করিম (সা·) তাদের ওপর লা’নত করেছেন।

মহিলাদের জন্য হরেক রকমের অলংকার পরা জায়েজ। কিন্তু বেশি অলংকার না পরাই ভালো। কেননা যারা দুনিয়াতে অলংকার পরবে না তারা বেহেশতে অনেক বেশি অলংকার পাবে। যে জেওর পরিধান করলে শব্দ হয় তা পরিধান করা জায়েজ নয়। যেমন- ঝুনঝুনি, বাজনাদার খাড়- ইত্যাদি। এসব অলংকার ছোট মেয়েদের পরানোও জায়েজ নয়। সোনা-রুপা ছাড়াও অন্য যে কোন প্রকারের অলংকার পরাও জায়েজ। যেমন পিতল, তামা, দস্তা ইত্যাদি। কিন্তু আঙুলে পরার আংটি সোনা-রুপা ছাড়া অন্য কোন বস্তুর জায়েজ নয়।

যুবতী মহিলার জন্য গায়ের মাহরাম পুরুষের (যে পুরুষের সঙ্গে বিবাহ জায়েজ ওই পুরুষকে গায়ের মাহরাম বলা হয়) সামনে হাতের পাতা, পায়ের পাতা, মুখও খোলা রাখা জায়েজ নয়। এমনকি সব শরীর ঢেকেও সুন্দর কাপড় পরিধান করে গায়ের মাহরাম পুরুষের সামনে আসা জায়েজ নয়। অবশ্য পুরনো মলিন কাপড় পরে আপাদমস্তক ঢেকে কোন কারণবশত গায়ের মাহরাম পুরুষের সামনে এলে তবে তা জায়েজ। বেহেশতি জেওর থেকে

 

কোরবানির ছোঁয়ায় বিশ্বময় আনন্দ


মা ও লা না আঃ আ জী জ
বর্ষপরিক্রমায় আবারও আমাদের মাঝে আত্মত্যাগ ও আল্লাহর প্রেমে উজ্জীবিত হওয়ার মহা সওগাত নিয়ে আসে কোরবানি। কোরবানি হল আল্লাহর জন্য সর্বস্ব ত্যাগের মহোৎসব। ঈদুল আজহা সারাবিশ্বের মুসলমানদের জন্য বয়ে নিয়ে আসছে অফুরন্ত আনন্দ ও ত্যাগের প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হওয়ার মহা পয়গাম। বাংলার এক বিরাট অংশ যারা নিত্যদিনের অভাব-অনাটন, দুঃখ-দুর্দশা ও চরম দারিদ্রেøর কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে দু’মুঠো অন্নের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে বিত্তশালী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের দুয়ারে দুয়ারে, তাদের কংকালসার দেহগুলো দেখামাত্রই মনের গহনে শত বৃশ্চিক দংশনের মতো কি যেন এক তীব্র জ্বালা অনুভব হয়। শত প্রশ্ন ভিড় জমায় বিবেকের কাছে, ভাবি এদের জীবনে আসবে কি কোনদিন ঈদ সওগাত, ঈদ কি দিতে পারবে এদের জীবনে কোন আনন্দের সামান্যতম পরশ? যে রুগ্ন কংকালসার শিশু শুষ্ক মাতৃবক্ষে বারদুয়েক মুখ চুষে দুধ না পেয়ে অনাহারের কষাঘাতে ঘুমিয়ে পড়ে চিরদিনের জন্য, তাদের কাছে ঈদের আনন্দের কি-ইবা অর্থ হতে পারে?
তাই আজ বলতে ইচ্ছা করে যারা বল্‌গাহীন আনন্দ জোয়ারে গা ভাসিয়ে কোরবানির ঈদের মূল শিক্ষা আত্মত্যাগ ও আল্লাহর রাহে উৎসর্গীত হওয়ার প্রেরণা বেমালুম ভুলে গিয়ে শুধু কোরবানির হাটে উচ্চমূল্যে কোরবানি পশু খরিদের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে যান তাদের ঈদ অন্তঃসার অনুষ্ঠান পর্ব বৈ কিছুই নয়। যে দেশে দুটো অন্নের জন্য রাসূলের প্রাণপ্রিয় উম্মতের কোন কোন সদস্য ইমানহারা হচ্ছে সেখানে কোরবানির হাটে উচ্চমূল্যে কোরবানির পশু খরিদের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ার কি-ইবা মানে হতে পারে তা আজ ভেবে দেখা প্রয়োজন। বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা·)-এর প্রতি কোরবানি করার নির্দেশ পৌঁছার পর থেকে অদ্যাবধি প্রতি বছর হিজরি সালের জিলহজ মাসের দশ তারিখে কোরবানি অনুষ্ঠান পালিত হয়ে আসছে। কেয়ামত পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকবে। আল্লাহর খলিল হযরত ইব্রাহিম (আ·) ও হযরত ইসমাইল (আ·)-এর ত্যাগের অবিস্মরণীয় বার্তা নিয়ে প্রতি বছর আমাদের মাঝে হাজির হয় ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। বিশ্ব মুসলমানদের জীবনে দুটি ঈদের মধ্যে কোরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহার গুরুত্ব অপরিসীম। খলিলুল্লাহ হযরত ইব্রাহিম (আ·) স্বপ্নের মাধ্যমে কোরবানির নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে নিজ প্রাণপ্রিয় পুত্র নবী ইসমাইলকে (আ·) আল্লাহর রাহে কোরবানি করার আল্লাহর নির্দেশ পালনের এক অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। আল্লাহর প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে তারই সমীপে নিজেকে অর্পণ করার যে ছবক তিনি বিশ্ববাসীকে শিখিয়ে গেছেন, তামাম জাহানের উম্মতে মুহাম্মদি পশু কোরবানির মাধ্যমে তার অনুকরণে আত্মত্যাগের শপথ ব্যক্ত করেন। পৃথিবীর শুরু থেকেই কোরবানির প্রচলন রয়েছে। জাহেলি যুগে লোকেরা বিভিন্ন মূর্তির নামে কোরবানি দিত। তখনকার রাজা-বাদশাহরা তাদের দেবতার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে পালাক্রমে নরবলি দিত। আধুনিক যুগেও অমুসলিমরা বিভিন্ন দেব-দেবীর নামে পাঁঠা, মুরগি ইত্যাদি জবাই করে থাকে। খ্রিস্টানরা হযরত ঈসা (আ·)-এর নামে কোরবানি দেয়। বিশ্ব মুমিন মুসলমানরা একমাত্র মহান স্রষ্টা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তারই নিমিত্তে কোরবানি দিয়ে থাকেন। আর শরিয়তের নির্দেশও তাই। কোরবানি আল্লাহর নামেই হতে হবে। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যেই হযরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ·) কোরবানির জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। আল্লাহতায়ালা কতৃêক মহানবীকেও কোরবানির হুকুম করা হয়েছে। হে নবী আপনি আপনার প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের নিমিত্তে নামাজ পড়-ন এবং কোরবানি করুন। (সূরা কাওসার)
হযরত সাহাবায়ে কেরামদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হল কোরবানি কি? জবাবে নবী (সা·) বললেন, এটা তোমাদের রূহানি পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ·)-এর ধর্মাদর্শ তরিকা। তদুত্তরে সাহাবায়ে কেরাম (রা·) আরজ করলেন, এতে আমাদের উপকার কি? মহানবী (সা·) বললেন, কোরবানির পশুর প্রত্যেকটি লোম বা পশমের পরিবর্তে দয়ালু প্রভুর পক্ষ থেকে একটি করে পুণ্য প্রদান করা হবে। (বায়হাকি শরিফ)
মহানবী (সা·) বলেছেন, কোরবানি পশু জবেহ করার সময় তোমরা একান্ত আগ্রহের সঙ্গে এর কাছে উপস্থিত থাক, কেননা এর পহেলা রক্তবিন্দু জমিনে পতিত হওয়ার আগেই তোমাদের পাপরাশি মাফ হয়ে যায়। (আত তারগিব)। মহানবী (সা·) আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের নিমিত্তে ও পূণ্যের আশায় কোরবানি করে, কিয়ামত দিবসে ওই কোরবানির পশুর মাংস ও রক্তবিন্দু দ্বারা কোরবানিদাতার ‘আমল’ মিযানের পাল্লায় সত্তরগুণ বৃদ্ধি করে দেয়া হবে। (তিবরানি)
কোরবানি শুধু জাঁকজমকময় অনুষ্ঠানের এবং মাংস ভক্ষণের জন্য নয় বরং কোরবানির শিক্ষা হল ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে সর্বাবস্থায় নিজেকে মহান স্রষ্টা আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে দেয়া এই বলে যে, আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মৃত্যু একমাত্র মহান প্রভুর জন্য উৎসর্গীত যিনি বিশ্ব আলমের একচ্ছত্র মালিক।

***************************
গ্রন্থনাঃ হাবিবুর রহমান সরকার
উৎসঃ দৈনিক যুগান্তর, ৭ই ডিসেম্বর ২০০৭