আসছে ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে ব্যয় বরাদ্দ ধরা হবে। এ ব্যয় বরাদ্দের বিষয়টি নানা দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরপর দুই বার ব্যয় বরাদ্দের বিষয়টি দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করছে। এর আগে কখনো এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। এবারই কোনো ব্যয় বরাদ্দ প্রথাগত নিয়ম অনুযায়ী বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা হবে না। এ-ই প্রথম কোনো ব্যয় বরাদ্দের আকার লাখ থেকে কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। যে অর্থের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। এ বছরই বাজেট যখন ঘোষিত হচ্ছে, তখন দেশে বিরাজ করছে স্মরণকালের মধ্যে সর্বাধিক দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও রেকর্ড পরিমাণ ডাবল ডিজিট মুদ্রাস্ফীতি।

কোনো একটি আর্থিক বছরের সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাবকে বাজেট বলে। প্রত্যেক আর্থিক বছরের শুরুতে ওই বছরের বিভিন্ন উৎস থেকে কী পরিমাণ অর্থ আয় ও ব্যয় হবে তার একটি বিস্তারিত বিবরণ তৈরি করা হয়। বিবরণটির এক দিকে দেখানো হয় আয়ের হিসাব অন্য দিকে দেখানো হয় ব্যয়ের হিসাব। বাজেটে একটি জাতীয় দর্শনের চিত্র ফুটে ওঠে। বাজেট হচ্ছে দেশ ও জাতির আর্থসামাজিক অগ্রগতির দিকনির্দেশনা এবং প্রত্যাশা প্রাপ্তির মধ্যে সমন্বয় সাধনের প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতি। একটি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বাজেট দেশকে নিয়ে যেতে পারে উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে। দুর্বল বাজেট একটি জাতিকে শত-সহস্র বছরের জন্য পেছনে ফেলে দিতে পারে।

জাতীয় ব্যয় বরাদ্দে শিক্ষানীতি, স্বাস্থ্যনীতি, খাদ্যনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির সব দিক অন্তর্ভুক্ত করা হয়। স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত যত বাজেট হয়েছে প্রায় সব বাজেটেই সরকার শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে এখানে সর্বাধিক বরাদ্দ দিয়েছে। এটি সরকারের তথা জাতির জন্য একটি ভালো দিক। কিন্তু একটি বিষয় লক্ষণীয়, সব বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হলেও ধর্মীয় শিক্ষা খাতে তেমন বরাদ্দ দেয়া হয়নি। ইতিহাস সাক্ষী পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিশৃঙ্খলা তথা ইসলামের সোনালি যুগ ছিল রাসূল সাঃ ও খেলাফায়ে রাশেদার যুগ। সে যুগেও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ সাঃ শিক্ষাকে ফরজ ঘোষণা করেই থেমে থাকেননি। আল্লাহতায়ালার দিকনির্দেশনা মোতাবেক সাহাবাগণকে শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি তিনি এর কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দও করেছেন।

বিশেষত হজরত ওমর ফারুক রাঃ-এর আমলে শিক্ষা খাত বিশেষ গুরুত্ব ও আলাদা বরাদ্দ লাভ করেছিল। ওমরের আমলে ধর্মীয় শিক্ষা ও কল্যাণকর পার্থিব বিদ্যা শিক্ষা করা প্রত্যেক মানুষের ওপর বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছিল। এরি পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মীয় খাতে ব্যয় বরাদ্দের ওপরও অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সমগ্র মানব জাতির জন্য এমন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল যে শিক্ষা জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, কলা ও সাহিত্যে ইতিবাচক ফল বয়ে আনে। শিক্ষা সত্যিকার মনুষ্যত্ব বিকাশে সহায়ক হয়। যে শিক্ষা সবার প্রতি কর্তব্যবোধ উজ্জীবিত করে এবং প্রভুর প্রতি করে বিনীত।

বাজেট নাগরিক জীবনে আয়-ব্যয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। মানুষের সব কাজ মূলত আয়-ব্যয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। আয়-উপার্জনের দু’টি নীতি অনুসরণের জন্য ইসলাম জোর তাগিদ দিয়েছে। একটি হলো হালাল জীবিকা অর্জন করতে হবে এবং হারাম আয় বা মাল অর্জন থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন, ‘হে রাসূল! পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎ কাজ করুন। আপনারা যা করেন সে বিষয়ে আমি পরিজ্ঞাত’। (২৩:৫১)। একইভাবে কুরআনে বলা হয়েছে­ ‘তোমাদের জন্য সব পবিত্র বস্তু হালাল করা হয়েছে এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করা হয়েছে’। (৭:১৫৭)। অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে মানবজাতি, পৃথিবীতে হালাল ও পাক পবিত্র যা রয়েছে তোমরা তা-ই খাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (৮৮) প্রিয় নবী সঃ হাদিসেও হালাল রিজিককে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত এবং হারাম রিজিককে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। যেমন, ‘রাসূল সাঃ বলেছেন, ‘যে দেহ হারাম দ্বারা প্রতিপালিত তা বেহেস্তে প্রবেশ করবে না।’ (বায়হাকি)। অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘কোনো বান্দা হারাম উপায়ে উপার্জিত অর্থ দান-খয়রাত করলে তা কবুল হবে না, তা নিজ কাজে ব্যয় করলে তাতে বরকত হবে না এবং ওই মাল তার উত্তরাধিকারীদের জন্য রেখে গেলে তা তার জন্য দোজখের পুঁজি হবে। (আহমদ)

মানুষ যা আয় করে তা থেকে ব্যয় করে। বিভিন্ন বস্তু ক্রয় ও ভোগের মাধ্যমে তার চাহিদা পূরণ করে। মানবজীবনের চাহিদা অসংখ্য। কিন্তু এসব চাহিদা পূরণে সম্পদ সীমিত। এ কারণেই সুষ্ঠুভাবে এবং সঠিক খাতে ব্যয় করার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ইসলাম মানব জাতিকে সে শিক্ষাই দিয়েছে। কুরআনে এসেছে­ ‘পানাহার করো কিন্তু অপচয় করো না’। (৭:৩১)। ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আয়-ব্যয় সংক্রান্ত নীতিগুলো এতটাই উন্নত যে, এগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্য ও দুর্নীতিমুক্ত জীবনব্যবস্থা অতি সহজেই সম্ভব। আয়-উপার্জনের ক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যক্তি যদি অন্যায় পরিহার করে তাহলে সমাজের সব দুর্নীতি যেমন­ চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, ছিনতাই, প্রতারণা, আমানতের খেয়ানত, সুদ-ঘুষ, জুয়া ইত্যাদির সাভাবিকভাবেই অবসান হবে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যক্তি যদি অপচয়, কৃপণতা ও সামাজিক কর্তব্য সুষ্ঠুভাবে পালন করে তাহলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য সম্পূর্ণরূপে দূর হবে। এ জন্য প্রয়োজন ইসলামী তথা ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা। যার ফলে একদল সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরি হবে। আর ধর্মীয় জ্ঞানার্জন ছাড়া শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

আমরা এ কথাটি দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা ছাড়া সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরি করা সম্ভব নয়। ইসলামী শিক্ষা তথা ইসলামী মূল্যবোধের বিকাশে আলাদা খাত নির্ধারণ করা সময়ের অপরিহার্য দাবি। ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিরা জাতীয় জীবনে বিরাট অবদান রেখে চলেছেন। যারা ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হন এর ফলে তাদের দ্বারা অপরাধ-অপকর্ম সংঘটিত হয় কম। সমাজের চিত্র আমরা যদি দেখি, সেখানে দেখা যায় ইসলামী তথা নৈতিক মূল্যবোধে শিক্ষিতদের দ্বারা মানুষ হয়রানির শিকার হন না বললেই চলে। তাদের নামে থানায়-আদালতে বিভিন্ন অপরাধের দায়ে মামলারও হিড়িক থাকে না। আধুনিক শিক্ষিত একজন লোক অপরাধ ও অপসংস্কৃতির সাথে যত দ্রুত মিশে যেতে পারে ইসলামী শিক্ষিতরা তা তত দ্রুত করতে পারে না। অতএব সরকারকে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য তথা জাতীয় জীবনে উন্নয়নের জন্য ইসলামী শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেয়া একান্ত অপরিহার্য।

**************************
এম এম হাবিবুর রহমান
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ০৬ জুন ২০০৮