জীবনযাপনে মধ্যপন্থা অবলম্বনই প্রশংসনীয়। মধ্যপন্থা বলতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থাকে বুঝায় যা চরমপন্থার বিপরীত। নিক্তির এক পাত্রে বাটখারা এবং অপর পাত্রে পণ্য বোঝাই করার পর নিক্তির কাঁটা ঠিক সোজা অবস্থানে এলে এই অবস্থাকেই ভারসাম্য বলা হয়। এক দিক থেকে অপর দিকে কমবেশি হলে ভারসাম্যহীনতা। মানবজীবনের নিক্তির কাঁটাও তদ্রূপ। যেকোনো এক দিকের প্রতি বেশি বা কম গুরুত্ব প্রদান করলে মধ্যম বা কেন্দ্রীয় অবস্থান নষ্ট হয়। কুরআন মজিদে মধ্যপন্থা অবলম্বনের ওপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে।

আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহকে মধ্যপন্থী জাতি বলে আখ্যায়িত করেছেন।

‘এভাবে আমি তোমাদের এক মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি’ (সূরা বাকারা, ১৪৩ নম্বর আয়াত)।

অতএব আমাদের যেকোনো কাজ, আচার-আচরণ হবে মধ্যপন্থী বা ভারসাম্যপূর্ণ, উগ্রপন্থী বা ভারসাম্যহীন নয়।

ইবাদত-বন্দেগিঃ তিন ব্যক্তি মহানবী সাঃ-এর স্ত্রীদের কাছে এসে তাঁর ইবাদত-বন্দেগি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। স্ত্রীগণ তাঁর ইবাদত-বন্দেগির বর্ণনা দিলে তা যেন তাদের কাছে খুবই কম মনে হলো। তারা বললেন, তাঁর সাথে আমাদের তুলনা হয় না। তাঁর পূর্বাপর সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে। অতএব তাদের একজন বললেন, ‘আমি রাতভর নামাজ পড়ব, ঘুমাব না।’ অপরজন বললেন, ‘আমি দিনভর রোজা রাখব, কখনো তা ত্যাগ করব না।’ তৃতীয়জন বললেন, ‘আমি পরিবার-পরিজন ত্যাগ করব, আর কখনো বিবাহ-শাদি করব না।’ তাদের কথাবার্তা শুনে রাসূলুল্লাহ সাঃ ভেতর থেকে বের হয়ে এসে বললেন­ ‘তোমরা কি এই এই কথা বলেছ? আমি নামাজও পড়ি এবং ঘুমাইও। রোজাও রাখি এবং রোজাহীনও থাকি। আমি বিবাহ-শাদি করি এবং সংসারধর্মও পালন করি। এটাই আমার নীতি। যে ব্যক্তি আমার এই নীতি থেকে বিমুখ হবে তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই’ (সিহাহ সিত্তা)। ‘আমাকে বৈরাগ্য অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়নি’ (সুনান আদ-দারিমি, মুসনাদ আহমাদ)।

রাসূলুল্লাহ সাঃ এক সাহাবি সম্পর্কে জানতে পারলেন যে, তিনি অনবরত রোজা রাখেন এবং রাতভর নামাজ পড়েন। রাসূলুল্লাহ সাঃ তাকে এভাবে একটানা ইবাদত করতে নিষেধ করেন এবং বলেন, তোমার ওপর তোমার চোখের, তোমার দেহের, তোমার স্ত্রীর এবং তোমার মেহমানের হক রয়েছে। (বুখারি)।

অর্থনৈতিক জীবনঃ অর্থসম্পদের ব্যাপারে ইসলাম একটি মধ্যপন্থা বা ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা অনুমোদন করেছে। অতিরিক্ত দানবীর হতেও নির্দেশ দেয়নি এবং কৃপণ হওয়াও অনুমোদন করেনি। এ প্রসঙ্গে কুরআন মজিদে বলা হয়েছে­

‘তুমি তোমার হাত তোমার ঘাড়েও আবদ্ধ করে রেখো না এবং তা সম্পূর্ণ প্রসারিতও কোরো না। এর বিপরীত করলে তুমি অপমানিত ও নিঃস্ব হয়ে পড়বে’ (সূরা বনি ইসরাইল, ২৯)।

পানাহারঃ অনুরূপভাবে পানাহার ও পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদির বেলায়ও মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন­ ‘তোমরা আহার করো, পান করো, কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না’ (সূরা আ’রাফ, ৩১)।

এক ধনবান সাহাবি জীর্ণশীর্ণ পোশাক পরিধান করে রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর কাছে এলে তিনি তাকে বলেন­ ‘তোমার পোশাকে আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ ঘটাও, প্রদর্শনী কোরো’ (হাদিস)। আল্লাহতায়ালা বলেন­

‘বলুন, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব সৌন্দর্যের বস্তু ও বিশুদ্ধ জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন তা কে নিষিদ্ধ করেছে? বলুন, পার্থিব জীবনে, বিশেষ করে কিয়ামতের দিন এসব তাদের জন্য, যারা ঈমান এনেছে’ (সূরা আ’রাফ, ৩২)।

দাম্পত্য জীবনঃ কুরআন মজিদে স্বামী-স্ত্রীর জীবনকে আখ্যায়িত করা হয়েছে পারস্পরিক গভীর ভালোবাসা ও মায়ামমতার জীবন হিসেবে (সূরা রূম, ৩০)। তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সৎভাবে জীবনযাপন করার এবং তাদের ত্রুটিবিচ্যুতি উপেক্ষা করার উপদেশ দেয়া হয়েছে (সূরা নিসা, ১৯)। মহানবী সাঃ বলেন­ ‘তোমার স্ত্রীর কোনো আচরণ অপছন্দ হলেও তার মধ্যে এমন সব গুণও রয়েছে যা তোমাকে মুগ্ধ করবে।’

বন্ধুত্ব ও শত্রুতাঃ মানুষের যেমন বন্ধুবান্ধব থাকে তদ্রূপ তার শত্রু থাকাও বিচিত্র নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও ব্যবহারে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন­ ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন ন্যায়বিচার বর্জনে তোমাদের প্ররোচিত না করে, তোমরা ন্যায়বিচার করবে’ (সূরা মাইদা, ৮)। মহানবী সঃ বলেন­ ‘বন্ধুর সাথে বন্ধুত্বের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন কোরো না। হয়তো এক দিন সে তোমার প্রাণের শত্রু হতে পারে। আবার শত্রুর সাথেও শত্রুতার মাত্রা অতিক্রম কোরো না। হয়তো এক দিন সে তোমার পরম বন্ধু হয়ে যেতে পারে’ (আদাবুল মুফরাদ)।

আচার-ব্যবহার ও চালচলনে ভারসাম্য বজায় রাখা নম্র, বিনয়ী ও ভদ্র হওয়া এবং চালচলন, কথাবার্তা অহঙ্কারমুক্ত ও শালীন হওয়া একান্ত প্রয়োজন। কুরআন মজিদে বলা হয়েছে­

‘অহঙ্কারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা কোরো না এবং পৃথিবীতে ঔদ্ধত্যভাবে বিচরণ কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো ঔদ্ধত্য, অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না। তুমি পদক্ষেপ করো ভারসাম্যপূর্ণ বা সংযতভাবে এবং তোমার কণ্ঠস্বর নীচু করো’ (সূরা লোকমান, ১৮-১৯)।

কেউ অসৌজন্যমূলক বা অভদ্রোচিত ব্যবহার করলে নীরবে সেখান থেকে প্রস্থান করতে হবে। কুরআন মজিদে বলা হয়েছে­

‘পরম দয়াময়ের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদের (অজ্ঞের মতো) সম্বোধন করলে তারা বলে­ সালাম’ (সূরা ফোরকান, ৬৩)।

আল্লাহতায়ালা মানুষের ওপর দায়িত্ব ও কর্তব্য অর্পণ করার ক্ষেত্রেও ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। আল্লাহর বাণী­ ‘আল্লাহ তাঁর কোনো বান্দার ওপর তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব অর্পণ করেন না’ (সূরা বাকারা, ২৮৬)। মহানবী সঃ তাঁর সাহাবিদের কাছ থেকে কোনো কিছু করার প্রতিশ্রুতি নিলে বলতেন, ‘মাসতাতা তুম’­ তোমাদের সামর্থø অনুসারে (বুখারি, মুসলিম, নাসাঈ, ইবন মাজা)।
 
**************************
মুহাম্মদ মূসা
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ০৬ জুন ২০০৮