- Home
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
- ইসলামের শিক্ষায় রয়েছেঃ মানুষের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও অধিকার
- Home
- ইসলাম ও মানবতা
- ইসলামের শিক্ষায় রয়েছেঃ মানুষের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও অধিকার
ইসলামের শিক্ষায় রয়েছেঃ মানুষের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও অধিকার
- By Article Poster
- Published 06/7/2008
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
- Unrated
মানবাধিকার মানে মানুষের অধিকার। মানুষ তার সামগ্রিক জীবন পরিচালনার জন্য যেসব মৌলিক অধিকারের ওপর একান্ত নির্ভরশীল, যা ছাড়া মানুষ পৃথিবীতে চলতে বা বাঁচতে পারে না এবং নিজের প্রতিভা, গুণাবলী ও বৃত্তি প্রকাশের স্বাধীনতাকে ভোগ করতে পারে না, তাই সবই মানবাধিকার। বর্তমানে এটি পৃথিবীর বহুল আলোচিত একটি বিষয়।
পৃথিবী ইসলামী সমাজ ব্যবস্হাকে যতদিন বুকে ধারণ করেছে, মানবাধিকার বিষয়টির সদ্ব্যবহার পৃথিবী ততদিনই তৃপ্তি সহকারে উপভোগ করেছে। এছাড়া এ অপব্যবহারই হয়েছে। পৃথিবীর সুবিধাবাদী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী গণতন্ত্র, মানবাধিকারের জিকির করে ফিরে এবং বিশ্বের দেশে দেশে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের ভিন্ন ভিন্ন গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার আড়ালে মুলত সন্ত্রাস করে যাচ্ছে। জোরপুর্বক নিজেদের স্বৈরতান্ত্রিক ও জুলুমতান্ত্রিক চিন্তাধারা এর অপব্যবহারই হয়েছে। পৃথিবীর সুবিধাবাদী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী গণতন্ত্র, মানবাধিকারের জিকির করে ফিরে এবং বিশ্বের দেশে দেশে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদে ভিন্ন ভিন্ন গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার আড়ালে মুলত সন্ত্রাস করে যাচ্ছে। জোরপুর্বক নিজেদের স্বৈরতান্ত্রিক ও জুলুমতান্ত্রিক চিন্তাধারা অন্যদের ওপর চাপিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে মুসলমানদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে গায়ের জোরে পৃথিবীর মানবতার সঙ্গে পাশবিক আচরণ করছে। মানবাধিকার রক্ষার নামে এ ভাঁওতাবাজী পৃথিবীবাসীর কাছে এখন আর গোপন নেই। তারা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মেকআপ পরিবর্তন করে কতভাবে যে সাজিয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
ইসলাম মানবতার ধর্ম, হযরত মোহাম্মদ (সা.) মানবতার প্রকৃত বন্ধু, আল-কোরআনই মানবতার একমাত্র মুক্তির সনদ। ইসলাম ও সন্ত্রাস শব্দ দুটি ভাবার্থের দিক থেকে পারস্পরিক সাংঘর্ষিক। ইসলামে সন্ত্রাসের কোনো স্থান তো নেই বরং ইসলামের আবির্ভাবই ঘটেছে সব ধরনের সন্ত্রাস, রাহাজানি, মারামারি, কাটাকাটি, জুলুম-নির্যাতন। এক কথায় যাকে আরবিতে ফিতনা বলা হয় তা সমাজ থেকে সমুলে উচ্ছেদ করার জন্য। ইসলাম সমাজ ও সভ্যতার স্হিতিশীলতা এনে মানুষের অধিকারকে সুনিশ্চিত করতে চায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘আর তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাও যতক্ষণ পর্যন্ত না ফিৎনা সম্পুর্ণভাবে মিটে যায় এবং একমাত্র আল্লাহর দেয়া জীবন ব্যবস্হা অবশিষ্ট থাকে।’ (সুরা-বাকারাহঃ ১৯৩)
পৃথিবীর সমুদয় সম্পদের একছত্র মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। মানুষ এর ট্রাষ্টি মাত্র। তাই এ সম্পদে সবার অধিকার সমভাবে স্বীকৃত। আল্লাহতায়ালা বিশ্বে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে এটির ঝড়ষব অমবহঃ হিসেবে নিযুক্তি দেননি। এমনকি যারা মহান প্রভুকে বিশ্বাস করে ও মানে তাদেরও না। বরং যারা তাকে বিশ্বাস করে না বা স্বীকৃতি দেয় না তাদেরও অধিকার রয়েছে। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) যখন মানব জাতির নেতৃত্ব সম্পর্কে আল্লাহকে জিজ্ঞাস করলেন তখন জবাবে বলা হয়েছিল, তোমার সন্তানদের মধ্য থেকে একমাত্র মুমেন ও সত্যনিষ্ঠরাই এ পদের অধিকারী হবে। জলেমদের এর অধিকারী করা হবে না। এ ফরমানটি সামনে রেখে তিনি আবার যখন রিযিকের জন্য কেবল নিজের মুমেন সন্তান ও বংশধরদের জন্য দোয়া করলেন তখন আল্লাহ জবাবে সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলেন যে, সত্যনিষ্ঠ নেতৃত্ব আর রিযিক ও আহার্য এক কথা নয়। দুনিয়ার রিযিক ও আহার্য মুমেন ও কাফের নির্বিশেষে সবাইকে দেয়া হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর স্মরণ কর যখন ইবরাহিম (আঃ) দোয়া করলেন হে আমার রব! এই শহরকে শান্তি ও নিরাপত্তার শহর বানিয়ে দাও। আর এর অধিবাসীদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে মানবে তাদের সব রকমের ফলের আহার্য দান কর। জবাবে তার রব বললেন, ‘আর যে মানবে না, দুনিয়ার গুটিকয় দিনের জীবনের সামগ্রী আমি তাকেও দিব। কিন্তু সব শেষে তাকে জাহান্নামের আযাবের মধ্যে নিক্ষেপ করব এবং সেটি নিকৃষ্টতম আবাস।’ (সুরা বাকারাঃ ১২৬)
ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজের স্বার্থকে এক সঙ্গে দেখে, একদিকে ব্যক্তিকে তার সমৃদ্ধির উৎসাহ দেয়, অন্যদিকে ব্যক্তি সমাজের অংশ হিসেবে সমাজের অন্যদের সুখ ও সমৃদ্ধি সাধনের দায়িত্ব অর্পণ করে। আর এটিই ভ্রাতৃত্ববোধ। ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিটি মানুষের মধ্যে দায়িত্ব-কর্তব্যকে জাগিয়ে তোলে।
রাসুল (সা.) বহুবার প্রতিবেশীদের সঙ্গে সৌজন্য প্রদর্শনের ওপর গুরুত্ব প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা প্রতিবেশীদের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে এতবেশি গুরুত্ব দিয়েছেন যে, মাঝে-মধ্যে আমার মনে হয়েছে প্রতিবেশীদের হয়তো উত্তরাধিকারকারীর মর্যাদা দেয়া হতে পারে।’ একটি সুস্হ সমাজের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো ভ্রাতৃত্ববোধ। এটি ছাড়া কখনো একটি সুস্হ-সুশীল সমাজ গঠিত হত পারে না। আর ইসলামই একমাত্র এ ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে যথোপযুক্ত কর্মসুচি দিয়েছে। মুসলমানদের আল্লাহর পথে দান করার সাধারণ নির্দেশ দিয়ে তাদের অর্থসম্পদের সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের অধিকার কায়েম করেছে। এর অর্থ হচ্ছে মুসলমানকে দানশীল, উদার হৃদয়, সহানুভুতিশীল ও মানব-দরদি হতে হবে। স্বার্থসিদ্ধির প্রবণতা পরিহার করে নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে প্রতিটি সৎ কাজে এবং ইসলাম ও সমাজের বিভিন্ন প্রয়োজন পুর্ণ করার জন্য ব্যয় করতে হবে। ইসলামী সমাজে মানবাধিকার সুসংহত রাখা প্রত্যেকের অপরিহার্য কর্তব্য রুপে চিহ্নিত হবে। এ ধরনের কর্তব্যবোধ একটি সমাজের সুস্হতার পরিচায়ক। যদি কোনো সমাজের এর অনুপস্হিতি পরিলক্ষিত হয় তবে বুঝতে হবে সেখানকার পরিবেশ বিকৃত হয়ে গেছে এবং সেখানকার অধিবাসীদের বিশ্বাস ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ইবাদতগুলোর মধ্যে শিথিলতা দেখা দিয়েছে। মুসলমানকে দানশীল, উদার হৃদয়, সহানুভুতিশীল, মানব-দরদী ও পারস্পরিক কল্যাণকামী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তাওহিদসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ইবাদতগুলো সামষ্টিকভাবে কাজ করে থাকে।
যাকাত সমাজে বিরাজমান ব্যাপক পার্থক্য হ্রাসের একটি কার্যকরী প্রতিষ্ঠান। যাকাত মানুষকে দায়িত্বশীল ও কর্তব্যপরায়ণের মতো অতুলনীয় চরিত্রের অধিকারী হিসেবে গড়ে তুলে।
রোজাদার নিজে ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত হওয়ার দরুন খুব ভালো করেই অনুভব করতে পারেন যে, আল্লাহর গভীর বান্দাগণ দুঃখ ও দারিদ্র্যের মধ্যে কীভাবে দিনাতিপাত করে। তাছাড়া রোজা তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ গঠন করে সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে।
বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টির এক বিশেষ ট্রেনিং এ হজ। কালো-ধলা, বর্ণ-বৈষম্যহীন এক বিশ্ব গঠনের লক্ষ্যে সবাই একই পোশাকে মাত্র দু-টুকরো কপড় পরিধান করে দীন-ভিক্ষুকের ন্যায় আল্লাহর দরবারে হাজির হতে হয়। এখানেও কোনো ব্যক্তি বা দেশের বিশেষ মর্যাদা ও উঁচু-নিচুর শ্রেণী বিন্যাস করা হয় না। ইসলামের আগমনের পুর্বে আরব অধিবাসীরা যে সব ভয়াবহ অবস্হার সম্মুখীন হয়েছিল, সেদিকে দৃষ্টিপাত করলে একটি বিশৃঙ্খল পরিবেশের চিত্র আমাদের সামনে ভেসে ওঠে।
তারা ছিল পরস্পরে রক্তপিপাসু। ইসলামের বদৌলতে তারা পরস্পর মিলে একাকার হয়ে গিয়েছিল। এদের সম্পর্কে আল্লাহ স্বয়ং বলেছেন, ‘মোহাম্মদ আল্লাহর রাসুল। আর যারা তার সঙ্গে আছে তারা কাফেরদের ব্যাপারে বজ্র কঠোর, নিজেরা পরস্পর দয়াপরাবশ।’ (সুরা আল-ফাতাহঃ ১৯) হিজরত পরবর্তী আনসার মোহাজিদের পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা ও সহমর্মিতা পৃথিবীর ইতিহাসে উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে আছে। সে সমাজের অধিবাসীরা অন্যের অধিকার পালন করে পরম তৃপ্তি লাভ করত। আল্লাহর রাসুল (সা.) মদিনা নামক ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে ঘোষণা করলেন, আজ থেকে অমুসলিমদের জান-মাল আমাদের পবিত্র আমানত। মানবাধিকার বলতে যা বোঝায় এবং এটিকে যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করা হোক না কেন। ইসলাম ও মানবাধিকার শব্দ দুটি পরস্পরের সহোদর বলতে পারি। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো মত বা পথে এর নিশ্চিত ব্যবহার হতেই পারে না।
**************************
জাফর আহমদ
আমার দেশ, ৬ জুন ২০০০৮