উপমহাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচার, প্রসার ও সমাজ সংস্কার আন্দোলনের পথিকৃৎ ওলিয়ে কামেল শাহ্ সুফি মরহুম হজরত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (রহ.) ১২১৫ হিজরী ১৮ মহরম ভারতের উত্তর প্রদেশের অন্তর্গত জৌনপুর শহরের মোল্লাটোলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার কনিষ্ঠ পুত্র মরহুম হজরত মাওলানা আব্দুল আউয়াল জৌনপুরী (রহ.)-এর কর্মজীবন, শিক্ষা, সাধনা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গতিধারাকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে। উল্লেখ্য, হজরত আব্দুল আউয়াল (রহ.) এর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হজরত মাওলানা হাফেজ আহমদ জৌনপুরী (রহ.)-এর মাজার ঢাকা শহরের চকবাজার শাহী জামে মসজিদের দক্ষিণ পশ্চিম পাশে অবস্হিত। হজরত আব্দুল আউয়াল (রহ.) বংশানুক্রমে আটত্রিশ পুরুষে গিয়ে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। হজরত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (রহ.) শেষবারের মতো পুর্ববঙ্গে হেদায়েতের জন্য আগমনকালে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপে বোটে অবস্হানের সময় ১২৮৩ হিজরি/ইংরেজি ১৮৬৬ সালে পুত্র আব্দুল আউয়ালের জন্ম হয়।

পিতার অবর্তমানে আব্দুল আউয়াল, ভগ্নিপতি মাওলানা মুসলিহ উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে জৌনপুরেই লালিতপালিত ও শিক্ষাপ্রাপ্ত হন।

অধ্যায়ন শেষে জৌনপুর মোল্লাটোলায় ফিরে এসে তার শিক্ষক হাফেজ মোহাম্মদ আহসান সাহেবের কন্যা মোসাম্মৎ ফাখরা বেগমকে বিয়ে করেন।

তিনি ছিলেন উপমহাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ আলেম, ইসলামের আদি ইতিহাসের বিশিষ্ট গবেষক এবং খ্যাতনামা আরবি কবি ও সাহিত্যিক । তিনি হাদিস, ফিকাহ, শরিয়াহ এবং মাসলা মাসায়েলের ওপর ১২১টি বই রচনা করেন ।

জীবনের অধিকাংশ সময়ে তিনি বাংলা ও আসামে হেদায়েত করেন। বৃহত্তর ঢাকা, ফরিদপুর, কুমিল্লা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, রংপুর ও নোয়াখালী জেলায় তিনি বেশির ভাগ সময় সফর করতেন। সন্দ্বীপ ছিল তার জন্মভুমি। সন্দীপের লোকদের তিনি এত ভালোবাসতেন যে, একবার তিনি প্রায় এক বছর সন্দ্বীপে অবস্হান করেছিলেন। তিনি পুর্ববঙ্গে বিভিন্ন স্হানে বহু মাদ্রাসা স্হাপন করেন। তন্মধ্যে অধুনালুপ্ত ঢাকা হাম্মাদিয়া মাদ্রাসা এবং নোয়াখালী ভবানীগঞ্জের কারামতিয়া মাদ্রাসা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ছারছীনার পীর সাহেব মরহুম মাওলানা নিসার উদ্দিন আহমদ (রহ.) হাম্মাদিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষাপ্রাপ্ত হন। মাওলানা আব্দুল আউয়াল (রহ.) ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। তার ওয়াজের বরকতে সুদখোররা তওবা করে সুদ খাওয়া ছেড়ে দিত।

তবে তিনি শান্তিপুর্ণভাবে তার হেদায়েতের কাজ চালিয়ে যেতেন। তার ভদ্র ও নম্র স্বভাব এবং সদাচারের জন্য অন্যান্য সব মতাবলম্বীদের কাছ থেকে তিনি সম্মান ও শ্রদ্ধা লাভ করতেন। মাওলানা আব্দুল আউয়াল জৌনপুরী (রহ.) প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থাকলেও তিনি নওয়াব সলিমুল্লাহর শিক্ষা-আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি ইংরেজি শিক্ষায় পক্ষপাতী ছিলেন। ১৯১০ সালের ২৬ মার্চ বগুড়ায় অনুষ্ঠিত পুর্ববঙ্গ ও আসাম মুসলমান শিক্ষা সমিতির তৃতীয় অধিবেশনে তিনি নিম্নোক্ত বক্তব্য রাখেনঃ

‘মুসলমানরা তাদের অবস্হার উন্নতি করার জন্য চেষ্টা করছে-এটা বড়ই সুখের বিষয়। বর্তমান সময় মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষা করা আবশ্যক, কারণ বিভিন্ন ভাষায় পারদর্শী হলে ওইসব ভাষায় ধর্ম প্রচারে সুবিধা হয়; তাই ইসলাম ধর্মে দৃঢ়বিশ্বাসী হয়ে অন্যান্য ভাষায় অধ্যয়ন করা উচিত। ইংরেজি ভাষা শিক্ষা করা ঠিক হবে না-এটা প্রাচীন লোকদের ভুল ধারণা ।’

মাওলানা আব্দুল আউয়াল জৌনপুরী (রহ.) জীবনের পঞ্চান্ন বছরের মধ্যে তেত্রিশ বছর বাংলা ও আসামে ইসলাম প্রচার করে ১৩৩৯ সালের ১২ শাওয়াল মোতাবেক ১৯২১ সালের ১৮ জুন শনিবার রাতে তিনি কলকাতায় ইন্তেকাল করেন।

এ বছর জানুয়ারি মাসে কলকাতায় গিয়ে তার মাজার জিয়ারতের জন্য মানিক তলায় গিয়েও প্রথম দিন মাজার খুঁজে পেলাম না। পরের দিন কলকাতা নাখোদা মসজিদের এক লোকের কাছ থেকে পুরা ঠিকানা নিয়ে অবশেষে মাজারের সন্ধান পেলাম। উপমহাদেশের এই প্রখ্যাত মহাপুরুষের মাজারের এই দুরবস্হা দেখে আমি নীরবে অশ্রু বিসর্জন করলাম। মাজারে কোনো নামফলকও নেই। খোলা মাঠের পাশে ভাঙা দেয়ালের মধ্যে কবরের ওপরে আছে একটি বড় বট গাছ। কবরের কাছেই লোকজন মলমুত্র ত্যাগ করছে। ছেলেরা কবরের পাশে খেলাধুলা করছে। গরুর গোবরের টিকা কবরের দেয়ালে লাগানো। উল্লেখ্য, মাজারের পাশেই হজরত সুফী ফতহে আলী (রহ.)-এর মাজার অবস্হিত। ওই মাজারের সীমানার মধ্যে একটি মসজিদ ও কুতুবখানা আছে। সেখানে নিয়মিত আজান দিয়ে নামাজ আদায় করা হয়। অথচ মাওলানা আব্দুল আউয়াল (রহ.)-এর মাজারের কোনো পরিচর্যা নেই। অত্যন্ত অবহেলিত ও অযত্ম অবস্হায় মাজারটির অবস্হা দেখে মনে হলো কয়েক বছরের মধ্যে মাওলানা আব্দুল আউয়াল (রহ.)-এর মাজারের কোনো চিহ্নই থাকবে না। শুধু আমিই নই, বাংলাদেশে তার অনেক ভক্ত কলকাতায় গিয়ে বহু কষ্ট করে মাজারের খোঁজ পায় ও মাজার জিয়ারত করে চলে আসেন। আমি হজরত সুফি ফতহে আলী (রহ.)-এর মাজার সংলগ্ন মসজিদের ইমাম সাহেবকে হজরত আব্দুল আউয়াল (রহ.)-এর মাজার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অনুরোধ করলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, ওই মাজারটি ভারত সরকারের জায়গার মধ্যে অবস্হিত বিধায় তাদের পক্ষে মাজার সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। নিজেকে খুব অসহায় বোধ করলাম। বিষণ্ন মনে আমি ফিরে এলাম। বাংলাদেশে ভারতীয় দুতাবাসের মান্যবর হাইকমিশনারকে পত্রের মাধ্যমে ওই মাজার সংস্কারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সবিনয় অনুরোধ করেছি। যাদের আত্মত্যাগে এদেশের লাখ লাখ মানুষ হেদায়েত হয়েছেন, আল্লাহর পথে এসেছেন, সত্যের সন্ধান পেয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মরহুম আব্দুল আউয়াল জৌনপুরী (রহ.)। তার মাজার সংস্কার হোক এটা তার সব ভক্তের কাম্য। আমার ক্ষুদ্রপ্রচেষ্টায় মরহুম আব্দুল আউয়াল জৌনপুরী (রহ.)-এর মাজারের সংস্কার হলে এটা হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্যতা।

**************************
এমইউএ কাদের
লেখকঃ সাবেক অতিরিক্ত সচিব
আমার দেশ, ৬ জুন ২০০০৮