ইহসান আরবি শব্দ। ‘হুসন’ শব্দ থেকে এসেছে। যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সুন্দর ব্যবহার। ভালোভাবে কোনো কাজ সম্পাদন করা, কারো কষ্ট লাঘব করা ইত্যাদি। ইসলামের পরিভাষায় ‘ইহসান হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য উত্তমরূপে ইবাদত করা এবং তাঁর সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা। এ পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি এবং তাঁর সৃষ্টির প্রতি যাবতীয় কর্তব্য সুন্দর ও উত্তমরূপে সম্পাদন করার নামই ইহসান।
একজন ইসলামি বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘ইহসান মানে হচ্ছে, কাজ ভালোভাবে ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করা। কাজ করার বিভিন্ন ধরন আছে। তার একটা ধরন হচ্ছে, যে কাজটি করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে সেটি কেবল নিয়ম মাফিক সম্পন্ন করা। দ্বিতীয় ধরন হচ্ছে, তাকে সুচারুরূপে সম্পন্ন করা এবং নিজের সব যোগ্যতা ও উপায়-উপকরণ তার পেছনে নিয়োজিত করে সব মনপ্রাণ দিয়ে তাকে সুসম্পন্ন করার চেষ্টা করা। প্রথম ধরনটি নিছক আনুগত্যের পর্যায়ভুক্ত। এ জন্য তাকওয়া ও ভীতি যথেষ্ট। আর দ্বিতীয় ধরনটি হচ্ছে ইহসান। এ জন্য ভালোবাসা, প্রেম ও গভীর মনসংযোগ প্রয়োজন হয়।’
পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, অতিথি, দুস্থ এতিমের প্রতি ইহসান তথা সদাচরণ করার জন্য কুরআন মজিদে আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এবং পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন... (সূরা নিসাঃ ৩৬)। রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ, আর তুমি আল্লাহকে দেখতে না পেলেও তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (মুসলিম)
ইহসান মানব চরিত্রের অমূল্য সম্পদ। ইহসানই মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাতের মর্যাদা দান করেছে। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে ইহসানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। ইহসানের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। যিনি ইহসান নামক অমূল্য সম্পদ দ্বারা নিজের চরিত্রকে রাঙান তাকে মুহসিন বলা হয়। মুহসিন ব্যক্তির চারিত্র্যিক জীবন সুন্দর ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে ওঠে। তার চারিত্র্যিক সৌন্দর্য তার চারপাশকে মোহিত করে তোলে। আল্লাহতায়ালা তাকে ভালোবাসেন, সব মানুষ তাকে পছন্দ করে। কুরআনে কারিমে বলা হয়েছে, ‘তোমরা ইহসান করো। কেননা আল্লাহতায়ালা ইহসানকারীদের ভালোবাসেন।’ (সূরা বাকারাঃ ১৯৫) আল্লাহতায়ালা আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ইহসানকারীদের সাথে আছেন।’ (আনকাবুতঃ ৬৯)
ইহসানের মতো মহৎগুণ ব্যতীত প্রকৃত মুমিন হওয়া যায় না। কারণ ঈমানের বিভিন্ন আহকাম ও আমল সুন্দররূপে সম্পন্ন করার জন্য ইহসান অপরিহার্য। আল্লাহর প্রতি পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করে তাঁর ইবাদত করার জন্য ইহসান দরকার। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ইহসানকারীরূপে যে ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে সে ব্যক্তি দৃঢ়ভাবে মজবুত হাতল ধারণ করেছে।’ (লুকমানঃ ২২)। ইহসানের মাধ্যমে মানুষের মানসিক ও নৈতিক চরিত্রের উন্নতি হয়। ইহসানই মানুষকে সৃষ্টি জগতের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে। ইহসানের বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করেন। এ সম্পর্কে আল্লাহর বাণীঃ ‘উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কী হতে পারে।’ (রাহমানঃ ৫৫)। মূল কথা ইবাদাতের চূড়ান্ত পর্যায় হলো ইহসান। বস্তুত তাসাউফের আসল লক্ষ্যই হলো ইহসানের স্তরে উন্নীত হওয়া। যারা এ সাধনায় রত থাকেন তারা এক দিকে যেমন আল্লাহর ইবাদতের স্বাদ লাভ করতে সক্ষম হন, অপর দিকে আল্লাহর বান্দাদের প্রতিও তারা থাকেন সহানুভূতিশীল।
ইহসানকারী সাধারণত উন্নত চরিত্র, চরিত্র মাধুর্য, মহানুভবতা, সহনশীলতা, পরশ্রীমুখর, ব্যক্তিস্বার্থ বা আত্মত্যাগের মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি হয়ে থাকেন। ফলে তার চিন্তাধারায় পরিচ্ছন্নতা, স্বভাবে প্রশান্তি, মেজাজে ভারসাম্য, চরিত্রে পবিত্রতা, আচরণে মাধুর্যতা, ব্যবহারে নম্রতা, লেনদেনে সততা, কথাবার্তায় সত্যবাদিতা, ওয়াদা ও অঙ্গীকারের দৃঢ়তা, সামাজিক জীবনযাপনে সদাচার, কথাবার্তায় চিন্তার ছাপ, চেহেরায় পবিত্রতার ভাব ফুটে ওঠে। মোট কথা, তার সামগ্রিক জীবনব্যবস্থায় বৈপ্লবিক একটা পরিবর্তন সূচিত হয়। যে জীবনধারার কোথাও কোনো অন্ধকার ও অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয় না। এরা কখনো আত্মপূজারী, স্বার্থবাদী, স্বার্থান্ধ ও পরশ্রীকাতরতাকে প্রশ্রয় দেন না। ইহসানকারী ব্যক্তির উন্নত চরিত্রের একটি উদাহরণ এভাবে দেয়া যায়, মনে করুন একজন মৃত্যুকালে দু’জন মাত্র ছেলে উত্তরাধিকারী রেখে গেছেন। মিরাস হিসাবে সামান্য কিছু কৃষি জমি ও একটি বসতভিটা রয়েছে। এদের দু’জনের একজন লেখাপড়া করে বড় ধরনের চাকরি করে সচ্ছলভাবে জীবনযাপন করেন। আর অন্যজন কৃষিকাজ করে খুব টানাপড়েনে জীবনযাপন করেন। এ উভয় ব্যক্তি মিরাসী আইনানুসারে পিতার মিরাসে সমান অংশীদার। এমতাবস্থায় সচ্ছল ব্যক্তিটি মনে মনে ভাবল আমাকে তো আল্লাহ ভালোই রেখেছেন। সে তার অংশটুকু স্বেচ্ছায় অসচ্ছল অভাবী ছোট ভাইয়ের জন্য ছেড়ে দিলো। এ ধরনের কাজকে ‘ইহসান’ বলা হয়। যিনি এ মহৎ গুণের অধিকারী হয়েছেন তাকে ‘মুহসিন’ বলা হয়।
মুহসিন ব্যক্তির পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি কাজ ও কথায় বিশেষত্ব পরিলক্ষিত হয়। একজন পূর্ণাঙ্গ মুমিন বা মুসলিম এবং একজন মুহসিনের পার্থক্য হলো এই যে, একজন মুমিন ও মুসলিম জীবনের প্রতিটি কাজ আল্লাহর মর্জি মোতাবেক পালন করেন, কোথাও দুর্বলতা নেই এবং খুলুছিয়াত বা আন্তরিকতারও অভাব নেই। কিন্তু প্রতিটি কাজের সৌন্দর্য ও সুচারুতা বলতে একটি কথা আছে। মুহসিন ব্যক্তি মুমিন ও মুসলিমের মতো জীবনের প্রতিটি কাজ আল্লাহর মর্জি মোতাবেক পালন তো করবেনই সেই সাথে তার প্রতিটি কাজের সৌন্দর্য ও সুচারুতা থাকবে। অর্থাৎ প্রতিটি মুহসিন মুমিন কিন্তু প্রতিটি মুমিন মুহসিন নয়।
মুহসিন তিরস্কার, ব্যঙ্গোক্তি, অবজ্ঞা, দাম্ভিকতা, গর্ব-অহঙ্কার, কটূক্তি, দম্ভোক্তি, কুৎসা রটনা, হিংসা বিদ্বেষ, ঘৃণা, তুচ্ছজ্ঞান করতে পারে না। সে কখনো দুরাচার, দুর্বৃত্ত, পাপিষ্ঠ, কদাচার, দুর্বচন, দুর্বাক, দুরুক্তি, দুমুর্খ, দুরভিসন্ধি, দৃবৃêত্তায়ন, দুর্বিনীত, দুর্বুদ্ধি, দুর্ব্যব্হার, দুশ্চরিত্র ও দুষ্কর্ম ইত্যাদির সাথে সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে না।
যারা আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী তাদেরকে এ মানে পৌঁছা একান্ত জরুরি। যুগে যুগে আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং তাদের সাথীরা এ মানে পৌঁছতে পেরেছিলেন। যার ফলে তাদের জানের শত্রুরাও তাদের চরিত্র মাধুর্যে মোহিত হতে বাধ্য হয়েছে। আল্লাহর দিকে ডাকা সর্বোত্তম কাজ হওয়ার কারণ কী? কারণ যিনি খালেছভাবে আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকার ইচ্ছা পোষণ করেন, তিনি সর্বপ্রথম নিজ চরিত্রে কিছু অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তন নিয়ে আসেন। দাওয়াতি কাজই তাগিদ প্রদান করবে যেন দায়ী নিজের চরিত্রকে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য দ্বারা সুসজ্জিত করেন। আল কুরআনেরই শিক্ষা অনুযায়ী আহ্বানকারীর প্রথম বৈশিষ্ট্য হবে, তিনি শিরকমুক্ত জীবনযাপন করবেন। কারণ আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর প্রথম দাওয়াতই হলোঃ হে মানবমণ্ডলী, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দাসত্ব, আনুগত্য ও উপাসনা করবে না। ভয় একমাত্র তাঁকেই করতে হবে। তিনি একক ও অদ্বিতীয়। তাঁর আর শরিক নেই। চাওয়া-পাওয়া, কামনা-বাসনা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো কাছে করা যাবে না।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য আমলে সালেহ দ্বারা নিজকে সুশোভিত করবেন। কারণ দায়ীর নিজ চরিত্রই যদি পরিশুদ্ধ না হয়, তবে তার দাওয়াতের মাধ্যমে সমাজ কখনো প্রভাবিত হবে না। তাই দায়ী ইল্লাল্লাহ নিজেকেই সর্বপ্রথম পরিচ্ছন্ন চরিত্র দ্বারা রাঙাবেন।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দায়ী একজন আপসহীন ও সৎসাহী ব্যক্তিত্ব হবেন। আল্লাহর কাজে লজ্জা, সঙ্কোচ, ভয়ভীতি কোনো কিছু তাঁকে স্পর্শ করবে না। চরম বিরোধিতার মুখেও নিকৃষ্টতম শত্রুদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে অকুতোভয়ে বলবে ‘আমি মুসলমান’। এভাবে দাওয়াতে দুই দিকেই প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এক দিকে যেমন আহ্বানকারীর চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে, অপর দিকে গণমানুষকে এসব কর্মপন্থায় নিয়ে এসে সোনার মানুষে রূপান্তর ঘটায়। আর এ সব সোনার মানুষকে নিয়ে সোনালি সমাজ গড়ে ওঠে। এ জন্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এটিকে সর্বোচ্চতম কথা বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এ সর্বোত্তম কাজের যারা ধারক হবেন তাদের ইহসানের পর্যায়ে পৌঁছা একান্ত জরুরি। মনে রাখা প্রয়োজন এটি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব আম্বিয়ায়ে কেরামদের কাজ। তাঁরা ইহসানের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছিলেন।
তারা ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর গোলামি করো এবং আল্লাহদ্রোহীকে বর্জন করো।’ (সূরা নামলঃ ৩৬)। দুনিয়ার শান্তি ও কল্যাণ এবং আখিরাতের মুক্তির জন্য দাওয়াতি কাজের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহতায়ালা বলেনঃ ‘তোমরাই হলে শ্রেষ্ঠ জাতি। তোমাদেরকে সৃষ্টিই করা হয়েছে মানবতার কল্যাণের জন্য। তোমরা সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে।’ (সূরা আল ইমরানঃ ১১০)
**************************
জাফর আহমাদ
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৩ জুন ২০০৮