প্রতারণা একটি সামাজিক ব্যাধি। আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আজ একজন অপরজন কর্তৃক প্রতারিত হচ্ছে। এ মাত্রা দিন দিন যেন বেড়েই চলছে। প্রতারণার সুনির্দিষ্ট কোন ক্ষেত্র নেই। বরং নানাভাবে প্রতারণা করা হয়ে থাকে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ক্ষেত্র হলো কথা দিয়ে কথা না রাখা, মিথ্যা বলা, আমানতে খিয়ানত করা, দ্রব্যে ভেজাল মেশানো, পণ্য দ্রব্যের দোষ গোপন করা, নকল মুদ্রা চালিয়ে দেয়া, ওজনে কম-বেশি করা, বেশি দামের জিনিসের সাথে কম দামের জিনিস মিলিয়ে দেয়া, মিথ্যা হলফ করে অন্যের হক নষ্ট করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, লেখাপড়ায় ফাঁকি দেয়া, পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করা প্রভৃতি। এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আমাদের সমাজে এতটাই প্রকট যে এ থেকে বেরিয়ে আসা যাবে কিনা তা বল যাচ্ছে না। তবে একমাত্র ধর্মীয় অনুভূতিই পারে মানুষকে নানা ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকান্ড থেকে বিরত রাখতে। পৃথিবীর কোন ধর্মই এই ধরনের কাজকে সমর্থন করে না। প্রতারণা সম্পর্কে ইসলামের দিকনির্দেশনা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ইসলাম প্রতারণা ও প্রবঞ্চনাকে কখনো আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়নি। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতারণা মস্তবড় গুনাহ ও অপরাধের কাজ। প্রতারণাকারীর জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রকমফের শাস্তির বর্ণনা রয়েছে ইসলামে। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে প্রতারণা সম্পর্কে হাদীসে উল্লেখ আছে যে, একদা রাসূল (সাঃ) এক স্তূপ খাদ্যের পাশ দিয়ে পথ অতিক্রম করছিলেন, হঠাৎ তিনি তার হাত সম্প্রসারণ করে খাদ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে আর্দ্রতা অনুভব করলেন। অতঃপর বললেন, হে খাদ্যের মালিক এমনটি কেন? মালিক বলল, বৃষ্টির পানিতে এমন হয়েছে (আসলে ব্যাপারটি এমন নয়)। অতঃপর রাসূল (সাঃ) বললেন, যে প্রতারণা করে সে আমার উম্মত নয়। ” (মুসলিম) ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ব‘র ত্রুটি গোপন করার অপরাধ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরো বলেন, যখন দু’ব্যক্তি স্বচ্ছতা ও সত্যবাদিতার মধ্যে ক্রয়-বিক্রয় করল, তখন তাদের এ কাজের মধ্যে কল্যাণদান করা হয়। আর যদি বিক্রিত ব‘র দোষ-ত্রম্নটি গোপন করে তবে তাদের সে বেচা-কেনার বরকত উঠিয়ে নেয়া হয়।” (মুসলিম) অন্যত্র বলা হয়েছে -যে ব্যক্তি ক্রেতাকে অবহিত না করে দোষযুক্ত পণ্য বিক্রি করে, সে অবিরাম আল্লাহর ক্রোধ ও ফেরেশতাদের অভিশাপে পতিত থাকবে। এমনিভাবে প্রতারণার উদ্দেশ্যে ওজনে কারচুপি করলে ও তার জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে ইসলামে। ওজনে কম-বেশি করা তথা প্রতারণা করা ইসলামে একটি হারাম ও গর্হিত কাজ এবং এর পরিণতি নিশ্চিত ধ্বংস। প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড ঈমানের পরিপন্থী কাজ। প্রতারণাকারীরা যখন প্রতারণা করে তখন মুমিনের দফতর থেকে তাদের নাম কাটা যায়। অর্থাৎ তারা আর মুমিন থাকে না। এ প্রসঙ্গে কুরআনের ভাষ্য হলো “মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা বলে আমরা আল্লাহ ও পরকালে ঈমান এনেছি, অথচ তারা আদৌ ঈমানদার নয়। তারা আল্লাহ ও মুমিনদের সঙ্গে প্রতারণা করে, প্রকৃত পক্ষে তারা নিজেদের সাথেই প্রতারণা করে, অথচ তারা তা উপলব্ধি করতে পারে না। (বাকারাঃ৮)। মূলতঃ প্রতারণার মাধ্যমে সত্যকে গোপন করা হয়। অথচ আল্লাহতায়ালা সত্যকে গোপন করতে এবং সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ করতে নিষেধ করেছেন।
তিনি বলেছেন, তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে গুলিয়ে দিও না এবং জেনে শুনে সত্যকে গোপন করো না। (বাকারাঃ৪২) তারপরও যারা প্রতারণার আশ্রয় নেয় তাদেরকে মুনাফিকদের মত জাহান্নামের সর্বনিন্ম স্তরে নিক্ষেপ করা হবে। তারা সেখানের ভয়াবহ শাস্তি ভোগ করবে। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সাঃ) এর একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ধোকা ও প্রতারণাকারী জাহান্নামী (বুখারী)।
আমাদের মধ্যে অনেকে এমন রয়েছে যারা প্রতারণা করাকে খুব ছোট খাট অপরাধ বলে মনে করে থাকেন। তারা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক নিজেদেরকে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলতে মোটেই কুণ্ঠাবোধ করেন না। অথচ এ ক্ষুদ্র জিনিসটাকেই ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। এ ধরনের অপরাধের জন্য জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি ভোগের সাবধানতা ইসলাম বার বার উচ্চারণ করেছে। শুধু তাই নয়। সুনানে আবুদাউদে উল্লেখিত একটি দাহীসে বলা হয়েছে “লাইচা মিন্না মান গাশশানা” “প্রতারণাকারী আমাদের দলভুক্ত নয়।” এখানে ‘লাইচা মিন্না’ শব্দটি ব্যবহার করে ব্যক্তিকে শোধরানোর জন্য ধমক দেয়া হয়েছে।
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদা মোতাবেক ব্যক্তি কাফির বা ইসলাম থেকে অপসারিত একথা বলা হয়নি, যেমনটি অন্যরা বলে থাকেন। বরং এ জাতীয় অপরাধী যখন তাওবা করে ফিরে আসবে ‘আল্লাহ পাক তার গুণাহগুলোকে পুণ্যদ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। যেমন আল্লাহ বলেন, “তারা নয়-যারা তাওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে। আল্লাহ তাদের পাপ পরিবর্তন করে দেবেন পুণ্যের দ্বারা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। “(আল ফোরক্বানঃ ৭০) আর যদি ব্যাক্তি তাওবা করার পূর্বে মারা যায়, তাহলে আল্লাহ তাকে অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি দিবেন, কেন না তিনি বান্দাহর উপর জুলুম করেন না। যেমন, কুরআনের ভাষ্য- “তোমার প্রতিপালক তার বান্দাহদের প্রতি জুলুম করেন না।” (হা-মীম সিজদাঃ ৪৬)। পরিশেষে বলব, কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিতে প্রতারণা একটি মস্তবড় গুণাহের কাজ যা সর্বাস্থায় হারাম। একে অবশ্যই হারাম হিসেবে সর্বক্ষেত্রে চিহ্নিত করে তা থেকে বিরত থাকতে হবে। কোন কারণে এ গহির্ত আচরণ কখনো করলে সাথে সাথে তাওবা করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সকল ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুক। আমীন।
**************************
এম· জ হি রু ল ই স লা ম
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৭ জুন ২০০৮