গাছ মানুষের বন্ধু এবং বিশ্ব প্রভুর অনন্য নিয়ামত। সবুজ শ্যামল নৈসর্গিক পৃথিবী বিনির্মাণে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পরিবেশ সংরক্ষণে, অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় ঝুঁকিহীন নিরাপদ বিনিয়োগে ও প্রাকৃতিক শোভাবর্ধনপূর্বক পর্যটন শিল্পের বিকাশে গাছ আজ আমাদের জীবনসঙ্গী। মানুষের জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে, মানুষের নান্দনিক চেতনাকে শানিত করতে এবং আরণ্যকে প্রকৃতির মধ্যে মহান আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠত্ব অনুধাবনের নিমিত্তে পৃথিবীতে গাছের জন্ম। গাছের মধ্যে স্রষ্টার সৃষ্টির অনন্য সৌন্দর্য লুকায়িত আছে। স্রষ্টার স্বরূপ সন্ধানের জন্য গাছের অস্তিত্বের গবেষণা ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যায়। আল্লাহ তায়ালা গাছ সর্ম্পকে বলেনঃ ‘তিনিই লতা ও বৃক্ষ উদ্যানসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং খেজুর বৃক্ষ, বিভিন্ন স্বাদ বিশিষ্ট খাদ্যশস্য, জলপাই ও দাড়িম্ব বাগিচা সৃষ্টি করেছেন। এরা একে অন্যের সদৃশ ও বৈসদৃশও বটে। যখন তা ফলবান হয় তখন তার ফল খাবে। আর ফসল তোলার দিনও তার হক প্রদান করবে এবং অপচয় করবে না’। (সূরা আনআমঃ ১৪১)

একটি দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য সে দেশের মোট আয়তনের ২৫% ভাগের মত বণাঞ্চল থাকা জরুরি। তা না হলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ভারসাম্যহীন হতে বাধ্য। সেখানে আমাদের দেশে ১২% ভাগের বেশি বনাঞ্চল নেই। তাও আবার দিনে দিনে নির্বীচারে কেটে উজাড় করা হচ্ছে। যা কিনা শুধু পরিবেশ নয় অর্থনীতির ভিতকেও নড়বড়ে করবে। আমাদের অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে শক্তিশালী করতে এবং আর্থিক সাশ্রয়পূর্বক আমাদের সম্পদ বাঁচাতে গাছের রয়েছে সুদূর প্রসারী অবিকল্প ভূমিকা। কেননা গাচ পরিবেশ, খাদ্য, ঔষধ, কাঁচামাল ও কাঠের যোগানসহ অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সাপোর্ট দেয়। এসব কারণে ইসলাম বৃক্ষরোপণকে উৎসাহিত করে। রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ

‘যে কোন মুসলমান একটি বৃক্ষরোপণ করবে অথবা শস্য বপন করবে উহা মানুষ অথবা পানি অথবা পশু খাবে নিশ্চয়ই উহা তার জন্য দান হিসেবে গণ্য হবে’ । (বুখারী ও মুসলিম)

বৃক্ষরোপণ একটি ইবাদত। সবিশেষ সওয়াবের কাজ সদকায়ে জারিয়াহ স্বরূপ। বৃক্ষরোপণ করে কেউ দান-সদকার সাওয়াব লাভ করতে পারে। এমনকি রোপণকৃত গাছ বা তার ফসল ও যদি কেউ চুরি করে তাও যে গাছ রোপণ করেছে তার আমলনামায় সাদকা-দান হিসেবে লেখা হবে। হাদীসে এসেছেঃ

‘যা চুরি যায় তাও তার জন্য দান হিসেবে গণ্য হয়’ (মুসলিম)

এভাবে কোন পতিত জমিকে আবাদী করা, এতে শস্য বপন করাও সাদকা বা দানতূল্য। রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ

‘যে ব্যক্তি কোন পতিত জমি কৃষি উপযোগী করবে তার জন্য এতে সাওয়াব রয়েছে। উহা হতে কোন খাদ্য অণ্বেষণকারী যা কিছু খাবে উহা তার জন্য সাদকা স্বারূপ গণ্য হবে’। (নাসাঈ ও দারেমী)

পক্ষান্তরে, অনর্থক গাছকাটা ও বন উজাড় করাকে ইসলামে গর্হিত কাজ হিসাবে দেখা হয়। রাস্তায় বা মাঠে যে গাছ ছায়া দেয়, যেখানে মানুষ বা পশু বিশ্রাম নেয় এমন গাছকে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কেটে ফেলা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। মহানবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘যে বরই গাছ কেটেছে তাকে আল্লাহ মাথা নিচু করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন’। (আবু দাউদ) ইমাম আবু দাউদ এ হাদীসের সংক্ষিপ্ত তাৎপর্যে বলেনঃ ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে তার কোন ফায়দা ছাড়া মাঠের বরই গাছ কেটেছে যার নিচে পথিক ও পশু আশ্রয় নেয় আল্লাহ তার মাথাকে নিচু করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন’ (বিঃদ্রঃ মিশকাত শরীফ, শোফা অধ্যায়)

হাদীসে বরই গাছের কথা উদাহরণ স্বরূপ বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে উপকারী যে কোন গাছের ক্ষেত্রেই রাসূল (সাঃ)-এর সতর্কবাণী প্রযোজ্য।

গাছ শান্তি ও কল্যাণের প্রতীক। রাসূল (সাঃ) যেমন বৃক্ষরোপণে মানুষকে উৎসাহ উদ্দীপনা দিতেন তেমনি সাহাবিগণও বৃক্ষরোপণে, বৃক্ষের যথার্থ পরিচর্যায় সকলকে উদ্ধুদ্ধ করতেন। গাছের গুণাগুণ ও উপকারিতা বর্ণনা করে গাছের প্রতি যত্নশীল হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। আল কুরআনের বাণী ধ্বণিত হয়েছে এভাবেঃ ‘আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা এবং তাতে উদগত করেছি নয়নাভিরাম সকল প্রকার উদ্ভিদ। এটি আল্লাহতে বিশ্বাসী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য জ্ঞান ও উপদেশস্বরূপ। আসমান থেকে আমি বর্ষণ করি উপকারী বৃষ্টি এবং তদ্বারা আমি সৃষ্টি করি উদ্যান, শস্যরাজি ও সমুন্নত খর্জ্জুর। আমার বান্দাদের জীবিকাস্বরূপ আমি বৃষ্টি দ্বারা সঞ্জীবিত করি মৃত ভূমিকে’। (সূরা কাফঃ ৭-১১)

গাছ পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ও আর্থিক সাশ্রয়ে দূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ও পরিবেশগত বিরূপতা রক্ষায় গাছ উপকারী বন্ধুর ন্যায় সাহায্য করে। পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা বন্যা, খরা, সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, সিডর ও ভূমিকম্পসহ নানা ধরনের ভয়াবহতাও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। বাড়ছে বিষাক্ত ধোঁয়া ও বাতাসে সীসার পরিমাণও। পক্ষান্তরে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পুষ্টি চাহিদা ও চিকিৎসার জন্য ঔষধ তৈরিতে গাছের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি ও উপকূলীয় সবুজবেষ্টনী প্রকল্পকে ত্বরাম্বিত করতে বাস্তবভিত্তিক প্রচেষ্টা কার্যকর করতে হবে। বৃক্ষ রোপণ একটি মহৎ উদ্যোগ, মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের গ্যারান্টি নাগরিকদের মাঝে এ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। রাসূল (সাঃ) কবরের পাশে বৃক্ষ রোপণের জন্য যে উপদেশ, উৎসাহ দিতেন তা আজ মূল্যায়ন করে বাস্তবানুগ উদ্যোগ নিতে হবে। কেননা গাছ ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকার বিকল্প নেই। গাছ থেকে পাওয়া অক্সিজেন আমাদের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য।

অতএব, ইসলামে গাছের ভূমিকা রহমত হিসেবে বিবেচ্য এবং গাছের রোপণ, পরিচর্যায় জাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণ নিহিত আছে। ০

**************************
ড· ন জ রু ল ই স লা ম খা ন আ ল মা রূ ফ
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৭ জুন ২০০৮